ভদ্রলোক বিনয়ে গলে গিয়ে বললেন, আর বলবেন না। আজ যে ড্রাই-ডে আমার খেয়ালই ছিল না। আপিসে একমনে কাজ করে গিয়েছি। তারপর ওখান থেকে সোজা এখানে চলে এসেছি। এসে বার-এর দরজা বন্ধ দেখে খেয়াল হল, হিসেবে গণ্ডগোল হয়ে গিয়েছে। গবরমেন্টের এই সিলি নিয়মের কোনো মানে হয়? শুধু শুধু কতকগুলো শুচিবাইগ্রস্ত লোকের পাল্লায় পড়ে গবরমেন্ট নিজেদের আয় কমাচ্ছে। অথচ ন্যাশনাল ডেভলপমেন্টের জন্যে এখন টাকা চাই। এক্সাইজ রেভিনিউ বাড়ানো চাই। বাড়িতে যে একটু ব্যবস্থা করব, তারও উপায় নেই। গৃহিণী বলেন, ছেলে-মেয়েরা বড় হয়ে উঠছে।
ভাবা গিয়েছিল ভদ্রলোক এবার নিজের কথাতেই মেতে থাকবেন। মিসেস পাকড়াশীকে আর প্রশ্ন করতে পারবেন না। কিন্তু ভদ্রলোক এবার বললেন, আমাদের কথা ছেড়ে দিন। রাত্রে এখানে আপনি?
মিসেস পাকড়াশী আমতা আমতা করে বললেন, একটা এনকোয়ারি।
বোসদা যেন ইঙ্গিতটা লুফে নিলেন। বললেন, আপনাকে তো বললাম, ব্যাংকোয়েট রুম ওই দিন পাওয়া শক্ত হবে। আপনাদের মহিলা সমিতির মিটিং-এর দিনটা পিছিয়ে দিন।
ভদ্রলোক এগিয়ে এসে আবার মিসেস পাকড়াশীর ব্রিফ গ্রহণ করলেন। বলছেন কী? আপনি কার সঙ্গে কথা কইছেন জানেন? মাধব পাকড়াশীর ওয়াইফ ব্যাংকোয়েট হল পাবেন না?
বোসদা বললেন, দেখছি, স্যরি। আমি চেষ্টা করে দেখছি।
ভদ্রলোক বললেন, চলুন, মিসেস পাকড়াশী, একসঙ্গে ফেরা যেতে পারে।
বোসদা গম্ভীরভাবে বললেন, ম্যাডাম, এতই যখন দেরি করলেন, তখন আর একটু অপেক্ষা করুন। আমাদের ম্যানেজার মিস্টার মার্কোপোলো এখনই এসে পড়বেন।
মিসেস পাকড়াশী বললেন, অসংখ্য ধন্যবাদ, মিস্টার চ্যাটার্জি। আমি আর একটু অপেক্ষা করে যাই। আপনিও তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে যান—একদিন না হয় ড্রিঙ্ক না-ই করলেন।
ওই আপনাদের স্বভাব। সব মেয়ের এক রা—ড্রিঙ্ক করো না, ড্রিঙ্ক করো। ভদ্রলোক শুভরাত্রি জানিয়ে গটগট করে হোটেল থেকে বেরিয়ে গেলেন।
মিসেস পাকড়াশী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে, কৃতজ্ঞ নয়নে বোসদার দিকে তাকিয়ে রইলেন। কিন্তু কোনো কথা বলতে পারলেন না। খাতাপত্তর পরীক্ষা করে বোসদা বললেন, ম্যাডাম, আপনি এক নম্বর সুইটে চলে যান। রবার্টসন নিশ্চয়ই একটু পরেই চলে আসবেন।
মিসেস পাকড়াশী ইতস্তত করতে লাগলেন। খাতায় সই?
বোসদা বললেন, আপনি ও-নিয়ে চিন্তা করবেন না। রবার্টসনকে দিয়ে আমি সই করিয়ে নেব।
মিসেস পাকড়াশী এবারও কথা বলতে পারলেন না। তার কালো চশমার মধ্যে দিয়ে আর একবার বোসদার দিকে কৃতজ্ঞ দৃষ্টিপাত করলেন। বোসদা জিজ্ঞাসা করলেন, আপনাদের সাপার?
হলে মন্দ হত না। মিসেস পাকড়াশী বললেন।
আপনারা কি ডাইনিং রুমে আসবেন?
না, ঘরেই সার্ভ করুক। আমি একটু সলিটিউড় চাই, একস্ট্রা সার্ভিস চার্জ বিলে ঢুকিয়ে দেবেন।
বোসদা বললেন, একটু অপেক্ষা করুন, মেনু কার্ডটা আনিয়ে দিচ্ছি। মিসেস পাকড়াশী বললেন, কিছু নয়, শুধু একটু হট চিকেন সুপ।
সে কি! সামান্য একটু ফিশ প্রিপারেশন?
পাগল! এতেই যেভাবে ওজন বেড়ে যাচ্ছে। বলে মিসেস পাকড়াশী কাউন্টার থেকে এগিয়ে গেলেন।
বোসদা কিছুক্ষণ গম্ভীর থেকে পূর্ববঙ্গীয় কায়দায় বললেন, হায় রে, স্লিম-হওন-প্রয়াসী! আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বোসদা বললেন, হয়তো তোমার বিশ্বাস হবে না। কিন্তু জানো, মিসেস পাকড়াশী অত্যন্ত গোঁড়া ছিলেন। খুব গরিব ঘরের মেয়ে কিনা উনি।
রবার্টসন নামের ইংরেজ ছোকরা পনেরো মিনিট পরেই আসরে অবতীর্ণ হলেন। খাতায় সই করে দিয়ে রবার্টসন যখন উপরে চলে যাচ্ছিলেন, তখন বোসদা জিজ্ঞাসা করলেন, সাপার পাঠিয়ে দিতে হবে নাকি? মিসেস পাকড়াশী হট চিকেন স্যুপের অর্ডার দিয়েছেন।
রবার্টসন বললেন, আমার সাপার চাই না। কোনো অ্যালকহলিক ড্রিঙ্কের ব্যবস্থা সম্ভব কিনা তাই বলুন। যদি সামান্য একটু বেশি খরচ লাগে তা বলতে যেন দ্বিধা করবেন না।
বোসদা দুঃখ প্রকাশ করে বললেন, কোনো উপায় নেই। একসাইজের নিয়মভঙ্গ করা শাজাহানের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন হোটেলের পক্ষে সম্ভব নয়।
ভদ্রলোক হতাশ মনে লিফটে উপরে উঠে গেলেন। আমি বোসদাকে প্রশ্ন করলাম, ড্রাই-ডেতে মিসেস পাকড়াশী এমন অ্যাপয়েন্টমেন্ট না-করলেই পারতেন।
তুমিও যেমন। উনি তো দেখে দেখে ড্রাই-ডে পছন্দ করেন। ড্রাই-ডেতে হোটেলগুলো ঝিমিয়ে পড়ে। লোকজনের যাতায়াত একরকম থাকে না বললেই চলে। ওইদিনই তো ওঁর পক্ষে নিরাপদ। ড্রাই-ডে এখন সপ্তাহে একদিন। শুনছি ওটা ক্রমশ বাচ্চা পাড়তে আরম্ভ করবে। এক দুই হবে; দুই চার হবে। এমনি করে একদিন সপ্তাহের সাতটা দিনই শুকনো হয়ে যাবে। তখন কী যে হবে!
শুকনো দিনের পরেই ভিজে দিন। সেই ভিজে দিনের ভোরেই অর্থাৎ রাত চারটে থেকে আমার স্পেশাল ডিউটি ছিল। কাউন্টারে চুপচাপ একা দাঁড়িয়ে ছিলাম। কাজের মধ্যে কেবল জাপান থেকে আসা কয়েকজন আকাশযাত্রীকে স্বাগত জানানো। তাদের থাকবার ব্যবস্থা কলকাতার এক খ্যাতনামা ট্রাভেল এজেন্সি আগে থেকেই করে রেখেছিল। ট্রাভেল এজেন্সির এক ছোকরাও সঙ্গে ছিল।
ট্রাভেল এজেন্সি আমাদের বহু অতিথি পাঠান। কিন্তু ম্যানেজার মনে মনে তাদের খুব পছন্দ করেন না। কারণ খুবই সহজ। আমাদের হোটেলে যে তারা খদ্দের পাঠালেন, তার পরিবর্তে বিলের শতকরা দশভাগ তাদের পাওনা। তাছাড়া চেকটা প্রায়ই খদ্দেরদের কাছে পাওয়া যায় না। অতিথিরা খাওয়া-দাওয়া, হই হই হট্টগোল আর স্ফুর্তি করে বিদায় নেন। আমরা হিসেব রেখে ট্রাভেল এজেন্টের কাছে বিল পাঠাই। তারা তখন নিজেদের অংশটি কেটে রেখে চেক দেন।
