একটু থেমে বোসদা বললেন, ভেবো না, গল্পের এইটুকু পড়েই আমার হোটেলে ঢোকবার লোভ হল। এরপরেও একটা চ্যাপটার ছিল। সেই চ্যাপটারে ওদের দুজনের বিয়ে হয়ে গেল, বিয়ের দিন রাত্রে লম্বা আলখাল্লা পরে শেখসায়েব নিজে ডিনার পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন এবং তারপর জোর করে তার নিজের রাজ্যে নববিবাহিত দম্পতিকে হনিমুন যাপন করার জন্যে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। হনিমুনের পরও রিসেপশনিস্ট ছোকরা এবং সেই ধনীকন্যা আর হোটেলে ফিরে আসেননি। কারণ শেখ সোজাসুজি জানিয়েছিলেন যে, নবগঠিত তৈল কোম্পানির রেসিডেন্ট ডিরেক্টর হিসেবে এই ছোকরাটি ছাড়া আর কাউকে নিয়োগ করা চলবে না।
বোসদা এবার হেসে ফেলে বললেন, ভাবলাম, সহজে রাজত্ব আর রাজকন্যা পেতে হলে, হোটেলে চাকরি করাই বুদ্ধিমানের কাজ। হয়তো কোনো শেখের নজরে পড়ে যেতে পারি। কতদিন, কতবার তখন কলকাতার বড় বড় হোটেলগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে থেকেছি। পয়সা জমিয়ে এক আধদিন ভিতরেও ঢুকেছি। পোর্টার সোজা রেস্তোরাঁর পথ দেখিয়ে দিয়েছে। কিন্তু রেস্তোরাঁয় খাবার জন্যে তো আর আমি হোটেলে ঢুকিনি। যাঁর সঙ্গে কথা বলবার জন্যে ঢুকেছি, তিনি দেখেছি একমনে কাজ করে যাচ্ছেন। বাইরের কোনো দিকেই যেন তার আগ্রহ নেই। একদিন এক বুড়ো ভদ্রলোককে দেখেছিলাম। রিসেপশনে কাজ করছেন। দেখে মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। যৌবন ও প্রৌঢ়ত্ব পেরিয়ে ভদ্রলোক আজও কাউন্টারে পড়ে রয়েছেন। কোনো তৈলচুম্বকের কন্যার নজর কি তার দিকে এই এতদিনেও পড়েনি? কিন্তু একটু পরেই নিজেকে সামলে নিয়েছি। ভেবেছি, ভদ্রলোকের হয়তো তেমন বুদ্ধি নেই; কিংবা হয়তো ভদ্রলোক বিয়ে করেই চাকরিতে ঢুকেছিলেন-ফলে জলের মধ্যে বাস করেও তৃষ্ণায় শুকিয়ে মরছেন। আমার জানাশোনা এক মামাকে ধরে হোটেলে ঢোকবার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু মামা শুনেই আমাকে মারতে এসেছিলেন। বাবাকে তখনি টেলিগ্রাম করে দেবেন ভয় দেখিয়েছিলেন।
মামাকে বোঝাবার জন্যে বোসদা যথেষ্ট চেষ্টা করেছিলেন। মামা বলেছিলেন, জেনেশুনে কোনো ভালো ছেলে কখনও হোটেল লাইনে আসে? এখানে ছুটি নেই, ভবিষ্যৎ নেই এবং সত্যি কথা বলতে কি আত্মসম্মানও নেই।
মামাকে ভেজাবার জন্যে বোসদা বলেছিলেন, মানুষকে দেখতে চাই আমি; মানুষের সেবা করতে চাই।
তাহলে এই হোঁতকা সুস্থ সবল লোকদের সেবা করে মরতে যাবি কেন? আই-এস-সিটা পাস করে মেডিক্যাল কলেজে ঢুকে পড়। রোগীর সেবা কর, পুণ্য হবে এবং মানুষের উপকার হবে।
বোসদা মামাকে সব বোঝাতে পারেননি। সুযোগ বুঝে একদিন সোজা শাজাহান হোটেলে চলে এসেছিলেন। সঙ্গে ছিল হবস সায়েবের একখানা চিঠি। হবস সায়েবের সঙ্গে একদিন হঠাৎ আলাপ হয়ে গিয়েছিল। বাসের আগ্রহ দেখে চিঠি লিখে দিয়ে তিনি বলেছিলেন, মাই ডিয়ার বয়, তুমি দেখতে সুন্দর, তোমার সুপারিশের দরকার হবে না। অ্যারিস্টটল বলেছেন—a beautiful face is better than all the letters of recommendation in the world–দুনিয়ার সমস্ত সুপারিশপত্রের চেয়ে সুন্দর মুখের কদর অনেক বেশি।
আমাদের কথার মধ্যেই হঠাৎ হ-পোর্টার কাউন্টারের কাছে ছুটে এল। চোখ তুলে দেখলাম, কালো চশমা পরে নিজের ব্যক্তিত্বকে যথাসম্ভব ঢাকা দিয়ে এক মধ্যবয়সী বাঙালি ভদ্রমহিলা আমাদের দিকে এগিয়ে আসছেন। তাঁর হাতেও একটা কালো রংয়ের ভ্যানিটি ব্যাগ। ভদ্রমহিলার বয়স নিশ্চয়ই অর্ধশতাব্দীতে ছুই ছুঁই করছে। কিন্তু মেজেন্টা রংয়ের ঢলঢলে সিল্কের শাড়ি, বগলকাটা ব্লাউজ এবং দেহের চলচপলার-চকিত-চমক যেন এই অর্ধ-শতাব্দীর অস্তিত্ব কিছুতেই স্বীকার করতে রাজি হচ্ছে না। বোসদা ফিসফিস্ করে বললেন, মিসেস পাকড়াশী।
চটুল-জঙ্ঘিনী মিসেস পাকড়াশী কাউন্টারের সামনে দাঁড়ালেন। হাজার জনের আনাগোনার এই কেন্দ্রে আসতে তিনি যে খুব স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন না, তা তার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। এখানে না দাঁড়িয়ে তিনি যদি সোজা কোনো ঘরে চলে যেতে পারতেন, তা হলে বোধহয় খুবই খুশি হতেন। আরও খুশি হতেন যদি সামনের দরজা দিয়ে তাকে যেতে না হত। যদি পিছনে অন্য কোনো স্বল্পালোকিত পথে যাওয়ার ব্যবস্থা থাকত তাহলে তো কথাই ছিল না।
কোনোরকম ভণিতা না করে মিসেস পাকড়াশী ফিসফিস করে বোসদাকে প্রশ্ন করলেন, আজ রাত্রে একটা ঘর পাওয়া যাবে?
বোসদা অভিবাদন জানিয়ে বললেন, দয়া করে একবার ফোন করে দিলেন না কেন? আমি সব ব্যবস্থা করে রেখে দিতাম।
মিসেস পাকড়াশী বললেন, আপনাকে বলতে আপত্তি নেই। ভেবেছিলাম আসাই হবে না। খুকু আর সব্যসাচীর আসবার কথা ছিল। তা মেয়ে আমার এই দেড়ঘণ্টা আগে ফোন করে জানালেন, জামাইয়ের সর্দি হয়েছে, আসবেন না।
মিসেস পাকড়াশী এবার নখটা দাঁতে খুঁটতে খুঁটতে বললেন, রবার্ট তা হলে এখনও আসেনি। আমি ভেবেছিলাম, এতক্ষণে ও চলে আসবে।
বোসদা বললেন, না, আসেননি তো। কোনো খবরও পাঠাননি।
মিসেস পাকড়াশী যেন একটু লজ্জিতভাবে বললেন, রবার্ট কমনওয়েলথ সিটিজান। আপনার পুলিসের হাঙ্গামা পোয়াতে হবে না।
আরে, মিসেস পাকড়াশী যে! হোটেলের ভিতর থেকে স্যুটপরা এক ভদ্রলোক বেরোতে গিয়ে ওঁকে দেখেই কাউন্টারের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
মিসেস পাকড়াশীর মুখ যেন মুহূর্তের মধ্যে নীল হয়ে উঠল। কী উত্তর দেবেন বুঝতে পারছেন না। কোনোরকমে তিনি বললেন, আপনি এখানে!
