কাউন্টারের কাজকর্ম বুঝিয়ে দিয়ে বোসদা একদিন বলেছিলেন, ঘন্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাজ করতে, আর হাজার রকম লোকের দেড় হাজার রকম অভিযোগ শুনতে সবসময় হয়তো ভালো লাগবে না। কিন্তু আমার যখনই ওইরকম মানসিক অবস্থা হয়, তখনই মনকে বোঝাবার চেষ্টা করি, পৃথিবীর জানলার সামনে আমি দাঁড়িয়ে রয়েছি। শাজাহানের কাউন্টারে দাঁড়িয়ে পৃথিবীকে দেখবার এমন আশ্চর্য সৌভাগ্য কজনের কপালে জোটে?
পৃথিবী? আমি প্রশ্ন করেছিলাম।
পৃথিবী নয়তো কী? বোসদা বলেছিলেন। এই কাউন্টারে দাঁড়িয়ে আমিই একশ দেশের পাশপোর্ট দেখেছি। জঙ্গলের উলঙ্গ আদিমরা ছাড়া এমন কোনো জাতের মানুষ এই পৃথিবীতে নেই যাদের সঙ্গে না এই শাজাহান হোটেলের স্যাটা বোসের সংযোগ হয়েছে।
কিন্তু এই কি পৃথিবী? আমি প্রশ্ন করে বসেছিলাম।
বোসদা আমার কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন, সাবধান! এখানে শুধু দেখে যাবে, কখনও প্রশ্ন করবে না। প্রশ্ন করলেই অশান্তি। পৃথিবীতে যারা চুপচাপ শুনে যায় তারা অনেক সুখে থাকে। কিন্তু যাদেরই মনে হয়েছে এটা কেন হয়? কেন মানুষ ওটা সহ্য করে? তারাই বিপদে পড়েছে। তাদের অনেকের হাড়ে দুব্বো গজিয়ে গিয়েছে।
আমি কাউন্টারের রেজিস্টারগুলো গুটোতে গুটোতে হাসলাম। বোসদা বললেন, তা বলে তোমার কোশ্চেনের উত্তর দেব না এমন নয়। আমি তো ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি আসল পৃথিবী যেন অন্যরকম হয়। এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমরা যাঁদের দেখি তারা যেন নিয়মের ব্যতিক্রম হন। করবী গুহ বেচারী একবার আমাকে বলেছিলেন, ঘর দিয়ে বাইরের বিচার করা যায় না। ঘরের ছাগলই হোটেলে এলে বাঘ হয়ে যায়। তা করবী গুহ বলতে পারেন। ভদ্রমহিলার তো আর বই-পড়া বিদ্যে নয়। হোটেল সম্বন্ধে তার প্রত্যেকটা কথারই দাম লাখ টাকা।
করবী গুহ ভদ্রমহিলাটি কে তা আমার জানা ছিল না। বোসদা আমার মুখের ভাব দেখে বললেন, করবী গুহকে তুমি এখনও চেনোনি? এটা খারাপ খবরও বটে, আবার ভালোও বটে। অবশ্য করবী দেবী আজকাল একদম বেরোন না। বেরোলেও পিছনের সিঁড়ি দিয়ে লুকিয়ে চলে যান। ওঁর লাউঞ্জে এসে বসে থাকা বারণ—মিস্টার আগরওয়ালা জিনিসটা মোটেই পছন্দ করেন না।
আমি বোসদার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। বোসদা বললেন, দু নম্বর সুইট। অর্থাৎ মিস্টার আগরওয়ালার অতিথিশালা—ইংরিজিতে গেস্ট হাউস। পার্মানেন্ট খদ্দের আমাদের। ও সুইট কস্মিকালে বাইরের কাউকে ভাড়া দেওয়া হয় না। তারই চার্জে আছেন শ্রীমতী করবী গুহ। আমাদের সহকর্মীদেরই একজন বলতে পার।
করবী সম্বন্ধে বোসদা আর কিছুই প্রকাশ করতে রাজি হলেন না। বললেন, সময়মতো সব জানতে পারবে। দু নম্বর সুইট যা-তা জায়গা নয়। আমাদের অনেকেরই উন্নতি অবনতি দু নম্বর সুইটের মেজাজের উপর নির্ভর করে।
শুনলাম, করবী গুহ একদিন বোসদাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ঘর-সংসার ছেড়ে মানুষ কবে হোটেলে থাকতে শিখল বলতে পারেন? বাড়ির বাইরে এমন বাড়ি বানাবার বুদ্ধি কবে তার মাথায় এল?
সে-প্রশ্নের উত্তর বোসদা দিতে পারেননি। কিন্তু সংসারের অনেক সেরা নাটকই যে তারপর থেকে দিনের আলোয় এবং রাত্রের অন্ধকারে পান্থশালায় অভিনীত হতে আরম্ভ করেছে, বোসদা করবী দেবীকে তা জানাতে ভোলেননি।
বোসদা পুলিসের রিপোর্টটা তৈরি করতে করতে আমাকে বললেন, হোটেল নিয়ে এদেশে প্রতিবছর ডজনখানেক উপন্যাস লেখা হয়। তার কিছু কিছু আমি পড়েছি। কিন্তু পড়তে পড়তে আমার প্রায়ই হাসি এসে যায়। দু দিন হোটেলে থেকে, তিনদিন বারে বসে এবং চারদিন পুলিস রিপোর্ট ঘাঁটাঘাঁটি করেই যদি হোটেলের অন্তরের কথা জানা যেত, তাহলে আর ভাবনার কী ছিল? হয়তো বললে বিশ্বাস করবে না, এমন একটা বই পড়েই আমার হোটেলের রিসেপশনিস্ট হবার লোভ হয়েছিল।
সায়েবগঞ্জ থেকে সবে কলকাতায় এসে হোস্টেলে রয়েছি। কলেজের খাতায় নাম লেখানো আছে, বাবার কাছ থেকে মনি-অর্ডারও আসে; কিন্তু পড়াশোনা কিছুই করি না। সবসময় নাটক-নভেল পড়ি; সিনেমা দেখি, আর বিলিতি রেকর্ডের গান শুনি। সেই সময়েই একটা হোটেল-উপন্যাস একবার হাতে এসে গিয়েছিল। সে উপন্যাসের নায়ক একজন লক্ষপতি আমেরিকান। মধ্যপ্রাচ্যের এক শেখের রাজত্বের তলায় কোটি কোটি গ্যালন তেল জমা হয়ে রয়েছে, এ-খবর তিনি কোথা থেকে পেয়েছিলেন। কিন্তু শেখ সায়েব লোকটি তেমন সুবিধের নন। বিদেশিদের তিনি তেমন সুনজরে দেখেন না। এদিকে আর একজন তৈল চুম্বক তোমরা যাকে বলল অয়েল-ম্যাগনেটশেখকে আরও বেশি পয়সার লোভ দেখিয়ে তেল সন্ধানের লাইসেন্স চাইছেন। আলোচনা চালাবার জন্যে শেষ তঁার দুজন সহকারী নিয়ে আমেরিকার এক বিশাল শহরের বৃহত্তম হোটেলে উঠেছেন। সেই হোটেলের আরও দুটি সুইট দখল করেছেন দুই দলের দুই আমেরিকান। এঁদের একজন শেখের ঘরে ঢুকলে, আর একজনের মন খারাপ হয়ে যায়। মুখ শুকিয়ে আমসি হয়ে ওঠে। আবার ইনি যখন তার ঘরে ঢোকেন, তখন অন্য ভদ্রলোকের রক্তচাপ ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ওঠে। শক্তির এই টাগ-অফ-ওয়ারে কারুর যদি লাভ হয়ে থাকে, তিনি হোটেলের রিসেপশনিস্ট, আর তার অনুগত হল্-পোর্টার। সমস্ত হোটেলটাতে শেখ এবং এই দুই কোম্পানির প্রতিনিধি ছাড়া আর কেউ নেই। এঁদেরই ছোটাছুটি, কাঁদাকাঁদি, হাসাহাসিতে হোটেলটা বোঝাই হয়ে রয়েছে।
বোসদা বলেছিলেন, একজন কোম্পানির মালিকের একটি সুন্দরী মেয়ে ছিল। বাবার ব্লাডপ্রেসার বেড়ে যাওয়াতে, জোর করে বাবাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে, সে বাবার ঘরে রাত্রিদিন ডিউটি দিতে আরম্ভ করল। রিসেপশনিস্টের সঙ্গে তার ভাব হতে দেরি হল না। তারপর দুজনের যুক্ত বুদ্ধিতে শেখ শেষ পর্যন্ত কীভাবে এদের দিকে চলে গেলেন, কীভাবে তার মন গলে গেল তারই গল্প।
