রোজি এবার আমার দিকে তাকিয়ে বললে, হ্যালো ম্যান, তুমি কিন্তু আমার একটা প্রশ্নেরও উত্তর দাওনি। হু আর ইউ?
আমি বলতে যাচ্ছিলাম, তাতে তোমার দরকার কী? তুমি নিজের চরকায় তেল দাও।
কিন্তু তার আগেই আমার পিছন থেকে কে বলে উঠল, হি ইজ মিস্টার ব্যানার্জিস ব্রাদার-ইন-ল। এঁর আর এক মাসতুতো ভাই-খোকা চ্যাটার্জি বোম্বাইতে থাকেন!
এতক্ষণে পালে যেন বাঘ পড়ল। জিমি থতমত খেয়ে বললে, ডিয়ার স্যাটা, তুমি তাহলে এসে গিয়েছ। আমি রোর্জির সঙ্গে তোমার ফ্রেন্ডের আলাপ করিয়ে দেবার চেষ্টা করছিলাম।
রোজির মুখে ততক্ষণে কে যেন এক দোয়াত কালি ছুড়ে দিয়েছে। এয়ারকন্ডিশনের মধ্যেও তার নাকের ডগা ঘামতে আরম্ভ করেছে। বোসদা এবার কাউন্টারের মধ্যে ঢুকে এসে বললেন, তা রোজি, হঠাৎ কোথায় চলে গিয়েছিলে? আমরা তো ভেবে ভেবে কূল-কিনারা পাচ্ছিলাম না।
রোজি এবার ভয় পেয়ে একটুকরো কাগজের মতো হাওয়ায় কাঁপতে লাগল। জিমি ওকে ইশারায় একটু দূরে সরিয়ে নিয়ে গেলেন।
স্যাটাদা বললেন, তোমার কার্ডগুলো হয়ে গিয়ে থাকলে আমাকে দিয়ে দাও। গোয়েঙ্কা সায়েবের মাননীয় অতিথিরা কোনোরকম অসুবিধেয় না পড়ে যান।
জিমি ও রোজি দুরে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কী সব কথাবার্তা বললে। কথা বলতে বলতে ওরা আমার দিকে তাকাল। তারপর ফিরে এসে দুজনে আবার কাউন্টারের সামনে দাঁড়াল। জিমি বোসদাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললে, পুওর গার্ল! আহা রে! তা রোজি, তোমার আন্টি এখন কেমন আছেন? ভাললা তো? বৃদ্ধা মহিলা কদিন তাহলে খুব ভুগলেন।
রোজি বললে, আমার কপাল। কিন্তু আমার চিঠি পাওনি, সে কেমন কথা। ম্যানেজার ছিলেন না বলে, আমি তোমার ঘরে খামটা রেখে গিয়েছিলাম।
বোসদা কপট গাম্ভীর্যের সঙ্গে বললেন, হ্যাঁ, হা, কিছুই আশ্চর্য নয়। হয়তো ইঁদুর টেনে নিয়ে কোথায় ফেলে দিয়েছে।
জিমি বললেন, ইয়েস, খুবই সম্ভব। আমার ঘরের ইঁদুর-সমস্যাটা কিছুতেই গেল না। এক একটা ইঁদুর দেখলে ভয়ে আমার বুক শুকিয়ে যায়। এই ইঁদুরগুলোই আমাকে শেষ পর্যন্ত মারবে। উইপোকা মারবার জন্যে যেমন কোম্পানি আছে, তেমনি বাড়িতে বাড়িতে ইঁদুর মারবার জন্যে কেন কোম্পানি হচ্ছে না? এমন জরুরি একটা চিঠি আমার হাতে এল না!
বোসদা বললেন, আমার সময় নষ্ট করবেন না, এখনই গিয়ে মার্কোপোলোকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে আসুন!
জিমি যেতে গিয়েও একবার থমকে দাঁড়ালেন। কিন্তু তোমার ফ্রেন্ড। পুওর ফেলো।
বোসদা গম্ভীর হয়ে বললেন, তোমাকে আগেও বলেছি, এখনও বলছি, আমার কোনো ফ্রেন্ড নেই। দিস বয় ইজ নট মাই ফ্রেন্ড। সিমপ্লি, আমার কোলিগ, আমার সহকর্মী। যাই হোক, ওর জন্যে চিন্তা করো না। তুমি রোজির জন্যে চেষ্টা করো। কৃতজ্ঞতায় গদগদ হয়ে জিমি বললেন, ধন্যবাদ। রোজিকে বললেন, চলো। কিন্তু ঘামে ভেজা এই জামাটা পরেই যাবে? একটু পাখার তলায় দাঁড়িয়ে নাও।
রোজি চোরা কটাক্ষ হেনে বললেন, বরফের মধ্যে চুবিয়ে রাখলেও আমার বগলের ঘাম বন্ধ হবে না। আর চাকরিই যদি না থাকে, তবে আমার সব স্কার্টই সমান।
ওরা দুজনে এবার দ্রুতবেগে ম্যানেজারের খোঁজে চলে গেলেন। বোসদা হেসে আমাকে একটা আলতো চাটি মেরে বললেন, শাজাহান হোটেল না বলে, এটাকে শাজাহান থিয়েটার বললে বোধহয় ভালো হয়। চাকরি অবশ্য রোজির কিছুতেই যাবে না। রোজির গুণগ্রাহীর সংখ্যা এ-হোটলে কম নেই। তাছাড়া মার্কোপোলোর কী যে হয়েছে, সারাদিন মনমরা হয়ে পড়ে থাকেন। কারুর চাকরি তিনি নিশ্চয়ই খেতে চাইবেন না। যত দোষ্ট করুক, একটা মোটা-মুটি যুক্তিসঙ্গত কারণ খাড়া করে নিবেদন করতে পারলেই তিনি ওয়ার্নিং দিয়ে ছেড়ে দেবেন।
মার্কোপোলো তখন একতলায় কিচেনে ঘোরাঘুরি করছিলেন। রোজিকে নিয়ে জিমি সেই দিকেই চলে গেলেন। একটু পরেই মুখ কাচুমাচু করে রোজি একলা ফিরে এল। ফিরে এসে সে সোজা কাউন্টারের কাছে দাঁড়াল। বোসদা বললেন, কী হল?।
নখগুলো আবার দাঁতে কামড়াতে কামড়াতে রোজি বললে, জিমি বেচারার কপালটাই মন্দ। আমার জন্যে সে শুধু শুধু বকুনি খেলো। মার্কোপোলো দাঁত খিঁচিয়ে ওর দিকে তেড়ে গেলেন। অসভ্য ভাবে বললেন, মেয়ে মানুষের ওকালতি করবার জন্যে তাকে হোটেলে রাখা হয়নি। আর লেডি টাইপিস্টের ঘ্যানঘ্যানানি শোনবার মতো অঢেল সময় তার নেই। আগে লাঞ্চ এর সময় শেষ হয়ে যাক, তারপর যা হয় হবে।
বোসদা গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। সেই সময় রোজি হঠাৎ এক কাণ্ড বাধিয়ে বসল। ভাগ্যে তখন কাউন্টারে কেউ ছিল না। বাইরে সারি সারি গাড়ি এসে পড়বার সময়ও তখন হয়নি। রোজি হঠাৎ কান্নায় ভেঙে পড়ল। কাঁদতে কাঁদতে বললে, আমি জানি স্যাটা, তুমি আমাকে দেখতে পারো। কিন্তু বলো তো আমি তোমার কী করেছি? তুমি আমাকে দেখতে পারো। কোনোদিন তুমি আমাকে দেখতে পারো না। আমার সর্বনাশ করবার জন্যে তুমি নিজের কাজিনকে এনে আমার চাকরিতে বসিয়ে দিয়েছ।
বোসদা ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, রোজি, এটা হোটেলের কাউন্টার। এখানে সিন ক্রিয়েট কোরো না। কী বললে তুমি? তোমাকে তাড়াবার জন্যে আমি লোক নিয়ে এসেছি!
রোজি ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললে, এর আগেও তো একবার আমি চারদিনের জন্যে চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু তখন তো কেউ আমার চেয়ারে এসে বসে যায়নি।
বোসদা বললেন, রোজি, তুমি কী সব বলছ?
রোজি রুমালে চোখ মুছতে মুছতে বললে, জানি আমি কালো কুচকুচে; জানি আমি সুন্দরী নই। লোকে আমাকে আড়ালে নিগ্রো বলে। তোমরা আমাকে দেখতে পারো না। ইচ্ছে করে তুমি ম্যানেজারকে আমার বোম্বাই পালানোর কথা বলে দিয়েছ। আবার অতগুলো লোকের সামনে বললে, ওই ছোকরা মিস্টার ব্যানার্জির ব্রাদার-ইন-ল।
