রায়বাহাদুরের সেক্রেটারি তাই নিজেই এসেছেন অনেকগুলো কার্ড নিয়ে। সঙ্গে আর-এস-ভি-পির ফাইল। এই ফাইলেই নেমন্তন্নর উত্তরগুলো রয়েছে।
আর-এস-ভি-পি রহস্যটা কাসুন্দেতে থাকার সময় একদম বুঝতাম না। বোসদা বললেন, শুধু তুমি কেন, আমিও বুঝতাম না। ইস্কুলে আমরা বলতাম, কথাটার মানে রসগোল্লা-সন্দেশ-ভর-পেট। নেমন্তন্নর চিঠির তলায় ওই চারটি অক্ষর থাকলেই বুঝতে হবে, প্রচুর আয়োজন হয়েছে।
এই লাঞ্চ পার্টির জন্য রায়বাহাদুরের—অর্থাৎ কিনা তার কোম্পানি লিভিংস্টোন, বটমূলে অ্যান্ড গোয়েঙ্কা লিমিটেডের নির্দেশে, বিশেষ ধরনের মেনুকার্ডের ব্যবস্থা হয়েছিল। সেই সুদৃশ্য কার্ড কলকাতার সেরা ছাপাখানা থেকে সাতরংয়ে ছাপানো হয়েছিল। সেই কার্ডের পরিকল্পনা করেছিলেন কলকাতার আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এক প্রচার প্রতিষ্ঠান। শেষ পৃষ্ঠায় রায়বাহাদুর নিজের এবং মাননীয় অতিথির একটি ছবি ছাপিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু রায়বাহাদুরের মতো শখের কার্ড শেষ পর্যন্ত ব্যবহার করা সম্ভব হল না। কার্ডের গোড়াতেই গতকালের তারিখ দেওয়া রয়েছে। গতকালই পার্টির কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে মাননীয় অতিথি পাটনা থেকে এসে পৌছুতে পারবেন না জানালেন। ওখানেও তাঁর এক গুরুত্বপূর্ণ কমিটি বৈঠক ছিল। বৈঠক শেষ করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসে পৌছানো তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। তারিখটা তার একান্ত সচিব ট্রাঙ্ককলে একদিন পিছিয়ে দিয়েছিলেন।
টেলিফোন পেয়ে লিভিংস্টোন, বটমলে অ্যান্ড গোয়েঙ্কা কোম্পানির অফিসাররা সারারাত ঘুমোতে পারেননি। প্রত্যেকটি অতিথিকে ফোনে ডেকে মাননীয় অতিথির অনিবার্য কারণে না-আসার সংবাদটা জানাতে হয়েছে। অত তাড়াতাড়ি আবার সাতরংয়ের কার্ড ছাপানো সম্ভব হয়নি। প্রথমে ঠিক হয়েছিল, শুধু তারিখটা কালো কালিতে বুজিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু রায়বাহাদুর সদাসুখলালের তা পছন্দ না হওয়ায়, আমাদের স্পেশাল কার্ডেই আজকের মেনু ছাপিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। সেই মেনুই আমি কার্ডে ছাপাবার ব্যবস্থা করছিলাম। জব্বর মেনু। প্রথমে-Les Hors doeuvre Sajahan, তারপর সুপ-Crene de Champignors, এবার Filets de Beckti Sicilience:
Jambon Grille Kualalampur
Chicken Curry & Pilao;
Pudding de Vermicelle et Creme;
Tutti Frutti Ice cream:
Cream Cheese, এবং সর্বশেষে–
Cafe et The, অর্থাৎ কফি এবং চা। যাঁরা নিরামিষাশী তাদের জন্যে–
Papya Cocktail:
Potato & Cheese soup :
Green Banana Tikia (কাচকলার চপ!)
Mixed Vagetable Grill :
Dal Mong Piazi;
Pilao ইত্যাদি।
এই মেনুই নিজের মনে কাউন্টারে বসে টাইপ করে যাচ্ছিলাম। এখনই সত্যসুন্দরদা কার্ডগুলো নিয়ে ব্যাংকোয়েট হ-এ ঢুকে যাবেন। ঠিক সেই সময় এক ভদ্রমহিলা হাতে একটা ঝোলানো এয়ার-ব্যাগ নিয়ে কাউন্টারের সামনে এসে দাঁড়ালেন। স্টুয়ার্ড জিমিও কাউন্টারের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি হঠাৎ উল্লাসে চিৎকার করে উঠলেন। সুদীর্ঘ বিরহের পর কাকে যেন তিনি আবার ফিরে পেয়েছেন।
মুখ ফিরে তাকিয়েই, এক মুহূর্তে বুঝলাম ওই যুবতী মহিলাটি কে। আমি যে এত কাছাকাছি বসে আছি, তা অবজ্ঞা করেই স্টুয়ার্ড বলে ফেললেন, রোজি, ডার্লিং, তোমার আঙুরের মতো মুখ শুকিয়ে কিসমিস হয়ে গিয়েছে। তোমার সোনার মতো রং পুড়ে তামা হয়ে গিয়েছে।
রোজি এবার খিলখিল করে হেসে উঠল। বললে, আমার দাঁত?
জিমি ঘাড় নেড়ে বললেন, তোমার দাঁতগুলো কিন্তু ঠিক মুক্তোর মতোই রয়েছে।
মাথা ঝাঁকিয়ে বিশৃঙ্খল চুলগুলো সামলাতে সামলাতে রোজি বললে, হোটেলে কাজ করে জিমি, তুমি কিছুতেই সত্যি কথা বলতে পারো না। সোনার মতো রং আমার আবার কবে ছিল? তুমিই তো বলেছিলে কালো গ্রানাইট পাথর থেকে কুঁদে কে যেন আমাকে বার করেছে!
জিমি যেন একটু লজ্জা পেয়ে গেলেন। আস্তে আস্তে বললেন, এতদিন কোথায় ছিলে? বলা নেই, কওয়া নেই।
রোজি জিমিকে কোনো পাত্তা দিলে না। তার নজর হঠাৎ আমার দিকে পড়ে গিয়েছে। তার মেসিনে বসে, বাইরের কেউ যে টাইপ করতে পারে, তা সে কিছুতেই যেন সহ্য করতে পারছিল না। স্বভাবসিদ্ধ ওয়েলেসলি স্ট্রিটীয় কায়দায় সে আমাকে উদ্দেশ করে বলে উঠল, হ্যালো ম্যান, হু আর ইউ?
রাগে অপমানে আমার সর্বশরীর জ্বলে যাচ্ছিল। কোনো উত্তর না দিয়ে, আমি একমনে টাইপ করে যেতে লাগলাম।
জিমি এবার সুযোগ বুঝে আমাকে আক্রমণ করলেন। হ্যালো ম্যান, তোমাদের সোসাইটিতে তোমরা কি লেডিদের সম্মান করো না? একজন ইয়ং লেডি তোমাকে একটা প্রশ্ন করছেন, আর তুমি তার উত্তর দিতে পারছ না?
রোজিও এবার কি বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই জিমি বললেন, রোজি, তুমি নিশ্চয়ই খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছ। বাইরে কি খুবই গরম? তোমার বগলের জামাটা ভিজে উঠেছে।
সেদিকে আড়চোখে একটু তাকিয়ে রোজি বললে, হ্যাঁ। তারপর বেশ রাগতস্বরে চিবিয়ে চিবিয়ে বললে, কিন্তু জিমি, কোনো লেডির শরীরের পার্টিকুলার অংশের দিকে ওইভাবে খুঁটিয়ে তাকানো কোনো ভদ্রলোকের কাজ নয়।
জিমি জিভ কেটে বললেন, ছিঃ ছিঃ, তোমাকে এমব্যারাস করবার জন্যে আমি কিছু বলিনি, বিশ্বাস করো। কিন্তু ওইভাবে জামা ভিজে থাকলে মেয়েদের স্মার্টনেস যে নষ্ট হয়ে যায় তা নিশ্চয়ই মানবে।
