বোসদা পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। আস্তে আস্তে বললেন, রোজি, জীবনে কারুর অন্নে হাত বসাবার চেষ্টা আমি করিনি। কখনও করবও না। তবে মিস্টার ব্যানার্জির প্রসঙ্গটা তোলার জন্যে আমি লজ্জিত। প্লিজ, কিছু মনে কোরো না।
লাঞ্চের মেনুকার্ডগুলো গুছিয়ে নিয়ে বোসদা কাউন্টার থেকে বেরিয়ে গেলেন। আর রোজিও সঙ্গে সঙ্গে ভিতরে এসে ঢুকল। আমাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সে দেখতে লাগল। তারপর হঠাৎ বললে, স্যাটার ডানদিকের ড্রয়ারটা খোললা তো।
আমি বললাম, মিস্টার বোস তো এখনই আসছেন। আমি ড্রয়ার খুলতে পারব না।
রোজি ঝুঁকে পড়ে পায়ের গোছটা চুলকোতে চুলকোতে বললে, ওই ড্রয়ারে গোপন কিছু থাকে না। উইলিয়ম ঘোষ ওর মধ্যে অনেক সময় আমার জন্যে চকোলেট রেখে যায়। দেখো না, প্লিজ।
ড্রয়ারটা খুলতেই দেখলাম গোটাকয়েক চকোলেট রয়েছে।
রোজির মুখে হাসি ফুটে উঠল। বললে, উইলিয়মটা এখনও নেমকহারাম হয়নি। হি ইজ সাচ্ এ সুইট বয়। ওর সঙ্গে আমার কথা ছিল, আমার জন্যে সবসময়ে চকোলেট-বার রেখে দেবে। ড্রয়ার খুললেই পাব।
চকোলেট থেকে ভেঙে খানিকটা আমার হাতে দিয়ে রোজি বললে, বাবু, একটু নাও। হাজার হোক তুমি ইনফ্লুয়েন্সিয়াল লোক। তুমি স্যাটাকে পর্যন্ত হাত করেছ। আমরা তো জানতাম স্যাটার হার্ট বলে কিছু নেই। থাকলেও সেটা প্লাস্টিকের তৈরি। অথচ তুমি সেখানে জেঁকে বসেছ।
না বলতে পারলাম না। চকোলেটটা নিয়ে চুষতে আরম্ভ করলাম। রোজি বললে, তুমি ভাবছ, উইলিয়ম পয়সা দিয়ে কিনে আমাকে চকোলেট খাওয়ায়? মোটেই তা নয়। উইলিয়মের বয়ে গিয়েছে। ওরা কাউন্টারে অনেক চকোলেট পায়। আমেরিকান ট্যুরিস্টরা রিসেপশনের লোকদের টিপস দেয় না—ভাবে, তাতে ওদের অসম্মান করা হবে। টিপসের বদলে ওরা হয়, পকেটের পেন অথবা চকোলেট দিয়ে যায়।
বোসদা কাউন্টারে আবার ফিরে এলেন। বললেন, রোজি, বড়সায়েব এখনও খুব ব্যস্ত রয়েছেন। তা তারই মধ্যে তোমার সম্বন্ধে কথা হয়ে গেল।
কী কথা? রোজি সভয়ে প্রশ্ন করল।
সে প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বোসা আমাকে বললেন, তুমি ওপরে চলে যাও। নিজের মালপত্তরগুলো রোজির ঘর থেকে বার করে প্যামেলার ঘরে ঢুকিয়ে দাওগে যাও।
সে কি? আমি বলতে যাচ্ছিলাম।
কিন্তু তার আগেই বোসদা বললেন, প্যামেলার শো কলকাতায় চলবে। পুলিসে নোটিশ দিয়েছে। প্যামেলা ঘর খালি করে দিয়েছে। সে আজই চলে যাচ্ছে।
এবার বোসদা গম্ভীর হয়ে উঠে বললেন, আজকের লাঞ্চ পার্টিতে তোমাকে কাজ শেখাব ভেবেছিলাম। কিন্তু স্টুয়ার্ড রাজি নন। বলছেন, নতুন লোক, হয়তো গণ্ডগোল করে ফেলবে। যা হোক, পরে অনেক সুযোগ আসবে। এখন উপরে চলে যাও। আমি ফোনে গুড়বেড়িয়াকে বলে দিচ্ছি।
রোজি এবার সত্যদার মুখের উপর হুমড়ি খেয়ে বললে, স্যাটা, ডিয়ার, আমার সম্বন্ধে ম্যানেজার কী বললেন?
বোসদা হেসে বললেন, আর চিন্তা করতে হবে না। এখন গিয়ে নিজের পুরনো ঘরটা দখল করোগে যাও। তোমার কামাই করবার কারণটা সায়েবকে আমি বুঝিয়ে দিয়েছি।
রোজির মুখ আনন্দে ও কৃতজ্ঞতায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
ছাদের উপরে আমাকে দেখে রোজি আহত কেউটে সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করতে লাগল। আমি আস্তে আস্তে গুড়বেড়িয়াকে দিয়ে আমার জিনিসগুলো তার ঘর থেকে বার করে অন্য ঘরে সরিয়ে নিলাম। রোজি আমার দিকে তাকিয়ে বললে, ঠিক হ্যায়, আমারও দিন আসবে। তখন স্যাটাকেও দেখব। শাজাহান হোটেলে কত মহাজনকেই দেখলাম! সব পুরুষমানুষই তো হয় যীশু না হয় সেন্ট পিটার!
আমার পূর্ববঙ্গীয় রক্ত তখন গরম হয়ে উঠেছে। এই পরিষ্কার হোটেলের নোংরা অন্তরের কিছুটা পরিচয় আমি এর মধ্যেই পেয়ে গিয়েছি। তাও সহ্য করেছি। চাকরি করতে এসেছি—ভিখিরিদের বাছ-বিচার করা চলে না। কিন্তু বোসদার সম্বন্ধে কোনো গালাগালিই এই নোংরা লোকগুলোর মুখে আমি শুনতে রাজি নই।
রাগে অন্ধ হয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম, আপনি বোধহয় ভদ্রতার সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছেন।
হোয়াট? কী বললে তুমি? রোজি এবার যেন আগুনের মতো জ্বলে উঠল।
দূরে গুড়বেড়িয়া দাঁড়িয়েছিল। সে তার রোজি মেমসায়েবকে চেনে। এই কদিনে আমাকেও কিছুটা চিনে ফেলেছে। বুঝলে এবার বোধহয় গুরুতর গোলমাল শুরু হয়ে যাবে। নিজেকে বাঁচাবার জন্যে সে যেন কাজের অছিলায় কয়েক গজ দূরে সরে গেল।
ইতিমধ্যে রোজি খপাং করে সজোরে আমার হাতের কজিটা ধরে ফেলেছে। এই কলকাতা শহরে কোনো অনাত্মীয়া মহিলা যে এইভাবে এক অপরিচিত পুরুষের হাত চেপে ধরতে পারে তা আমার জানা ছিল না। আমার মধ্যেও তখন কী রকম ভয় এসে গিয়েছে। জোর করে হাতটা ছাড়িয়ে নিতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত এক কেলেঙ্কারি বাধিয়ে বসব? এখনই হয়তো চিৎকার করে, কান্নাকাটি করে এই সর্বনাশা মেয়েটা লোকজন জড়ো করে বসবে।
দূর থেকে গুড়বেড়িয়া আড়চোখে আমার এই সঙ্গীন অবস্থা দেখেও কিছু করল না। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই রোজি হঠাৎ হিড় হিড় করে আমাকে টানতে টানতে নিজের ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল। তারপর দড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে দিল।
আমি কিছু বোঝবার আগেই যেন চোখের নিমেষে সমস্ত ব্যাপারটা ঘটে গেল। শুধু ঢোকবার আগের মুহূর্তে মনে হল গুড়বেড়িয়ার মুখে একটা রহস্যময় অশ্লীল হাসি ফুটে উঠেছে।
ঘরের মধ্যে নিছিদ্র অন্ধকার, কোনো জানলা পর্যন্ত খোলা হয়নি। তারই মধ্যে হাঁপাতে হাঁপাতে রোজি ভিতর থেকে দরজায় চাবি লাগিয়ে দিল।
