রবিকে আড়ালে নিয়ে গিয়ে বলেছি, তোমরা পালাও। মাদ্রাজ কিংবা বোম্বাই চলে যাও। চাকরি পেয়ে যাবে।
রবি রাজি হয়নি। জেন বোধহয় আমার কথা বুঝতে পেরেছিল। কিছুতেই নয়, সে বলেছিল এই কলকাতায় আমাদের থাকতে হবে। ওদের অপমানের যোগ্য উত্তর এখানে বসে বসেই আমাদের দিতে হবে। চিরকাল কিছু আমাদের এমন অবস্থা থাকবে না। আমরা আবার রাসেল স্ট্রিটে ফ্ল্যাট নেব। তারপর একদিন শাজাহানেই আমরা ব্যানলেয়েট দেব। ওদের সবাইকে সেখানে হাজির করব। আমাদের বিয়ের রজতজয়ন্তী উৎসব শাজাহান হোটেলে না করে আমরা কলকাতা ছাড়ছি না।
রবি আনন্দে জেনকে আমার সামনেই জড়িয়ে ধরেছে। বলেছে, ঠিক বলেছ, জেন।
চরম দুঃখের মধ্যেও ওদের আনন্দ দেখে আমার চোখে জল এসে গিয়ে ছিল। ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেছি, তাই যেন হয়। কিন্তু তখন কি জানতাম, চোখের জলের সবে মাত্র শুরু; আসল বর্ষা এখনও নামেনি।
সে অবস্থা আমি চোখে দেখিনি। ফাদারের মুখেই খবর পেয়েছিলাম। ফাদার বলেছিলেন, সর্বনাশা অবস্থা।
কেন, কী হয়েছে?
আপনার বন্ধু রবি অ্যাডাম-এর বসন্ত হয়েছে। আসল স্মলপক্স।
ওরা কোথায় আছে? আমি জিজ্ঞাসা করেছি।
কোথায় আর থাকবে। এখনও উইলিয়ামস লেনের বাড়িতে। কিন্তু বাড়িতে বোধহয় আর রাখা চলবে না। সংক্রামক ব্যাধির হাসপাতালে পাঠাতে হবে। কে দেখবে? কে সেবা করবে? এবং সবচেয়ে বড়কথা, টাকা পাবে কোথায়? জেন কিছুই শুনতে চাইছে না। দেহের ওই অবস্থা নিয়ে সর্বদা স্বামীর পাশে বসে রয়েছে। গতরাত্রে বেচারা অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিল।
বন্ধুরা আমাকে বারণ করেছিলেন। বসন্ত! ওর আধ মাইলের মধ্যে যেও। যদি কিছু সাহায্য করতে চাও, ফাদারের হাত দিয়ে পাঠিয়ে দিও।
কিন্তু কিছুতেই চুপ করে বসে থাকতে পারিনি। বৌবাজার স্ট্রিট ধরে হাঁটতে হাঁটতে ওদের বাড়ির কাছে এসেছি। দূর থেকে ফিনাইল ও ওষুধের গন্ধ ভেসে এসেছে। কিন্তু বাড়ির মধ্যে ঢুকতে সাহস হয়নি। ফাদার তখনও বোধহয় ঘরে বসে বসে ওর সেবা করছিলেন-বসন্তের গুটিতে তুলি দিয়ে অলিভ তেল লাগিয়ে দিচ্ছিলেন। রবির সর্বদেহে কে যেন আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেহটাকে ভুট্টার মতো করে পোড়ানো হচ্ছে।
আর জেন! মেটারনিটি কোট পরে, থলে হাতে বোধহয় বাজার করতে বেরোচ্ছিল। আমাকে দেখেই সে থমকে দাঁড়িয়েছিল। জেনকে আমি চিনতে পারছিলাম না। এই জেনকে দেখবার জন্যেই কলকাতার রসিকজনরা একদিন শাজাহান হোটেলের বার-এ ভিড় করে দাঁড়িয়েছিল? হাততালি পড়েছিল; ছোকরা মাতালরা গুন গুন করে গান ধরেছিল; শাজাহান হোটেলে মদের বিক্রি বেড়ে গিয়েছিল।
আপনি! আপনি এখানে? জেন আমাকে দেখে কোনোরকমে প্রশ্ন করেছিল।
রবি কেমন আছে খবর নিতে এসেছি। আমি মাথা নিচু করে উত্তর দিয়েছিলাম।
রবি নিশ্চয়ই ভালো হয়ে উঠবে। ফাদার কাল চার্চে ওর জন্য প্রার্থনা করেছেন। লোকাল হিন্দু বয়েজরা খুব ভালো। ওরা শাজাহান হোটেলে, উইলসন সায়েবের হোটেলে, বড়াপোচখানায় যায় না বটে; কিন্তু জেন্টেলমেন। ওরা দল বেঁধে আজ ফিরিঙ্গি কালীর কাছে পুজো দিতে গিয়েছে। আমি পয়সা দিতে গিয়েছিলাম, ওরা নিল না। ওরা নিজেরা চাদা করে পয়সা তুলেছে। বলেছে, সায়েব ভালো হয়ে গেলে, চাকরিতে ঢুকলে আমাদের একদিন কেক তৈরি করে খাইও। ঠিক বিলিতি কেক যেমন হয়। যেমন কেক কলকাতার বড় বড় হোটেলে বড় বড় সায়েবরা চায়ের সঙ্গে খায়। যে কেকে কামড় দিতে দিতে মেমসায়েবরা খিলখিল করে হেসে ওঠে।
আমি বলেছি, জেন, যদি তুমি কিছু না মনে করো, কিছু টাকা…
জেন মাথা নেড়েছে। হ্যামিলটনের হিরের ব্রোচ এখনও আমার কাছে আছে। শাজাহান হোটেলে এক বছর কাজ করেও আমি কিছু জমিয়েছিলাম। রবি কোনোদিন তা স্পর্শ করেনি। সেগুলো আমার কাছে আজও আছে।
লোকাল বয়েজরা ঠিক সেই সময় কোথায় থেকে হাজির হল।মেমবউদি, মেমবউদি, আপনি কেন বাজারে যাবেন? আমরা রয়েছি।
মেমবউদির হাত থেকে ওরা বাজারের থলেটা কেড়ে নিয়েছে। বাজার করে নিয়ে আসছি। কিন্তু নো মাছ। স্ট্রিক্টলি ভেজিটারিয়ান। মাদার সে না হলে অসন্তুষ্ট হবেন।-ছেলেরা বলেছে।
ছেলেরা বলেছে—আজ রাত্রে বউদি আপনি ডিপ ডিপ স্টিপ। নো দুশ্চিন্তা। সায়েবদাদাকে হোল নাইট আমরা গার্ড দেব। নো ফিয়ার বউদি। স্নাইট সন্দেহ, দেন এন্ড দেয়ার কলিং বউদি।
জেন বলেছেন, তা হয় না, মাই বয়েজ। তোমরা মানুষ নও, তোমরা অ্যাঞ্জেল। কিন্তু এই সর্বনাশা রোগে তোমরা কাছে এসো না। তোমাদের বাবা মা আছেন, ভাইবোন আছেন। রোগটা মোটেই ভালো নয়।
ছেলেদের মধ্যে একজন হেসে উঠেছে। আমরা কী অততা বোকা ছেলে, বউদি। মাদার সেটুলাকে একেবারে কন্ট্রোল করে ফেলেছি। আমাদের কিছু হবে না। হকি-ইন্ডিয়ান মেডিসিন। শার্টের হাতাটা গুটিয়ে ওরা সুতোয় বাঁধা একটুকরো হর্তুকি দেখিয়েছে। কিচ্ছু হবে না। আপনার জন্যেও আমরা এনেছি। তাড়াতাড়ি স্নান করে, ওটা আজই হাতে বেঁধে ফেলুন।
জেন-এর সঙ্গে আমার আর কথা হয়নি। হকি পরাবার জন্যে ছেলেটা ওদের মেমবউদিকে প্রায় টানতে টানতেই বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছে।
খবর পেয়েছি, রবির অবস্থা ভালো নয়। লোকাল বয়েজদের ইচ্ছে ছিল, তবু হাসপাতালে দিতে হয়েছে। হাসপাতালের বেড-এ প্রায় অচৈতন্য অবস্থায় সে পড়ে আছে। লোকাল বয়েজরা যমের সঙ্গে টাগ অফ-ওয়ারে একেবারে হাল ছেড়ে দেয়নি। হাসপাতালের ওয়ার্ডে বাইরের লোকদের ঢোকা মানা। ওরা তবু ফিরিঙ্গি কালীর ফুল প্রতিদিন ওয়ার্ড-বয়ের হাতে দিয়ে এসেছে। এই দড়ি টানাটানিতে কে জিতবে জানা নেই, কিন্তু লোকাল বয়েজরা অন্তত ফলাফল ঘোষণা দেরি করিয়ে দিয়েছে। হাসপাতাল থেকে ফিরে ওরা প্রতিদিন মেমবউদির কাছে গিয়েছে, মেমবউদিকে সায়েবদাদার সব বিবরণ অর্থাৎ যতখানি তারা সংগ্রহ করতে পেরেছে—দিয়েছে। মেমবৌদির যে আর রাস্তায় বেরোবার সামর্থ্য নেই। শুয়ে শুয়েই ওদের কথা তিনি শোনেন। ছেলেরা বলেছে, বুঝতে পারছি বউদি, আপনার মনের কথা বুঝতে পারছি। ভয়ের কিছু নেই।
