সায়েব বলেছেন, ও আই সি। কিন্যাপিং নয়, ইলোপমেন্ট নয়, প্লেন এন্ড সিমপল ম্যারেজ।
চাকরির কিন্তু পাওয়া যায়নি। প্রথমে সন্দেহ হয়নি। কিন্তু ক্রমশ যেন রবি বুঝতে পারছে ওর চাকরি হবে না। কলকাতার কোনো আপিস তাকে আর চাকরি দেবে না। যা সঞ্চয় ছিল, তাও ফুরিয়ে আসছে। সাজানো বাড়িটা ছেড়ে দিয়ে, ওদের অন্য একটা ছোট বাড়িতে উঠে যেতে হল।
জেন বললে, আমি চাকরির চেষ্টা করব।
মেয়েদের কাজ করবার সুযোগ তখন সামান্যই ছিল। টাইপ কিংবা টেলিফোনের চাকরি তখন ছিল না। হয় লেডিজ ড্রেস মেকার, না-হয় হেয়ার ড্রেসার। পার্ক স্ট্রিটে দোকান করে, বড়সায়েবদের বুড়ি বউদের সাদা চুল কালো করবার চেষ্টা করো। কিন্তু সে-সব কাজও তো শিখতে হবে। না শিখলে, কে আর জামা তৈরি করতে পারে, বা চুল ছাঁটতে সাহস করে?
কাজের খোঁজে তবু জেনকে দুএক জায়গায় পাঠিয়েছি। কিন্তু রবি কিছুতেই রাজি নয়। সে যুগের লোকরা তোমাদের মতো আধুনিক হয়ে উঠতে পারেনি। স্ত্রী কাজ করবে ভাবতেই তাদের মাথা ঘুরতে আরম্ভ করত। রবি বলেছে, এখন থেকেই উতলা হয় না। ব্যাঙ্কে এখনও আমার কিছু টাকা রয়েছে।
এদিকে জেনও একদিন আবিষ্কার করল, চাকরি পেলেও তার পক্ষে কাজ করা সম্ভব হবে না। সে মা হতে চলেছে। অভাব, অনটন, দুশ্চিন্তার মধ্যেই দুঃখদিনের রাজা তাদের ঘরে আসছেন।
রবি আমার কাছে প্রায়ই আসত। ওদের খবরাখবর পেতাম। বলত, কলকাতার প্রভুরা যে আমাদের জন্যে এত শাস্তি তুলে রেখেছিলেন জানতাম না। কিন্তু আমরা দুজনে এর শেষ পর্যন্ত দেখব। জেন আর আমি ওদের নাকের ডগায় সুখে-স্বচ্ছন্দে বেঁচে থাকব। বারমেডকে বিয়ে করা যে সমাজের চোখে এতবড়ো অন্যায় তা তো জানতাম না। এর আগে কলকাতায় কেউ কি কখনও কোনো হোটেলের মেয়েকে বিয়ে করেনি?
করেছে, আমি বলেছি। ওই তো হোটেল-সার্জেন্ট ওলে কিছুদিন আগে বিয়ে করল পেগিকে। রাত্রে পুলিসের লোক কলকাতার বারগুলো ঘুরে ঘুরে দেখত। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়ে এক রাত্রে পেগিকে সার্জেন্ট ওলে অ্যারেস্ট করেছিল। তারপর পেগির হাতেই সার্জেন্ট নিজে গ্রেপ্তার হলেন! গবরমেন্টের আইনে বিয়ের কোনো বাধা নেই। ওরা দুজনে তো বেশ সুখে শান্তিতে সংসার করছে। ওদের দুটো ছেলেকে ইস্কুলে পাঠিয়েছে। চাকরি যাওয়া তো দুরের কথা, কপালগুণে সার্জেন্টের পদোন্নতি হয়েছে।
রবিকে শেষ পর্যন্ত একটা কাপড়ের এজেন্সি জোগাড় করে দিয়েছি। ম্যাঞ্চেস্টারের মিস্টার স্ট্রিট সেবার ব্যবসার কাজে কলকাতায় এসে শাজাহান হোটেলে উঠেছিলেন। তার সঙ্গে সামান্য পরিচয় ছিল আমার; সেই সুযোগেই ওঁকে বলেছিলাম, রবিকে রাখুন। মাইনে দিতে হবে না, কমিশনে কাজ করবে।
রবির কাছে তখন সে-ই আশীর্বাদ। কাপড়ের নমুনা নিয়ে সে সারাদিন দোকানে দোকানে ঘুরে বেড়াতো। বড়বাজার যেত সকালের দিকে; আর দুপুরে জেন সামান্য যা বেঁধে রাখত তাই খেয়ে আবার বেরিয়ে পড়ত অন্য পাড়ায়। ওদের কোম্পানির ছাতার কাপড় খুব বিখ্যাত ছিল। রবি আমাকে একটা ছাতা উপহারও দিয়েছিল। কিন্তু সারা বছরে কটা ছাতাই আর তখন বিক্রি হত বললো।
এমন কিছু বিক্রি হত না। ফলে কমিশনও সামান্য। এত সামান্য যে তাতে বেয়ারা এবং কুক রাখা যায় না। জেন নিজেই সব করে নিত। চরম দুঃখের মধ্যেই দুঃখের রাজার আবির্ভাবের দিন এগিয়ে আসছে। কিন্তু ওদের অবস্থা তখন আরও খারাপ হয়ে গিয়েছে। উইলিয়ামস্ লেন-এ একটা ভাঙা ঘরে ওদের বাসা। পাশের বাড়িতে একজন চার্চের পাদ্রি থাকতেন। তাঁর সঙ্গে মিসেস ব্রকওয়েরও যথেষ্ট আলাপ ছিল। ওদের দুঃসময়ে ফাদার রোজ আসতেন। ফাদারের স্ত্রীও। জেন-এর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছি। শাজাহানের প্রাসাদে যে একদিন রাত্রি যাপন করত, নরম কার্পেটের উপর দিয়ে চলা যার অভ্যাস ছিল, সে আজ যোগিনী সেজেছে। দুটো ঘর। দেওয়ালে চুন-বালি খসে ইট দেখা যাচ্ছে। ওয়েটাররা যাকে খাতির করে ডাইনিং হল-এ নিয়ে যেত, পাছে অসুবিধা হয় বলে সযত্নে টেবিলটাকে চেয়ার থেকে সামান্য বেঁকিয়ে ধরত, সে আজ নিজেই রান্না করছে। অসুস্থ শরীরটা টানতে টানতে ঘরের জিনিসপত্তর গোছাচ্ছে।
শাজাহান হোটেল আজ যেন অনেক দূরে সরে গিয়েছে। বার-এ দাঁড়িয়ে হাসির মুক্তো ছড়িয়ে যে হুইস্কি, ব্র্যান্ডি, ড্রাইজিন, রাম, ভারমুথ বিতরণ করত যে যেন কোথায় হারিয়ে গিয়েছে। জেন বোধহয় আমার মনের কথা বুঝতে পেরেছিল। সে বললে, শাজাহানকে আমি কোনোদিন বোধহয় ক্ষমা করতে পারব না। ওইখানেই আমি আমার স্বামীকে পেয়েছি; তবুও।
বললাম, কেন?
জেন এবার কেঁদে ফেলল। চাকরির খোঁজে, আপনাদের না বলে ওখানেও একদিন গিয়েছিলাম। বলেছিলাম, বার-এ কাজ করতে আমি আবার রাজি আছি। শুধু দুপুরে আমাকে তালা দিয়ে রাখা চলবে না। হোটেলে আমি খাবও না। কাজ শেষ হলেই নিজের বাড়িতে ফিরে যাব। অন্তত বিলেত থেকে নতুন মেয়ে না-আসা পর্যন্ত আমাকে কাজ করতে দাও। লোকের অভাবে তোমাদেরও তো অসুবিধে হচ্ছে।
সিলভারটন তখন মুখ বেঁকিয়ে নিয়েছিলেন। বলেছিলেন, তালা খোলা অবস্থায় থাকতে হলে খিদিরপুরে যাও। আর বিবাহিত মেয়েকে বারমেড করবার মতো দুর্মতি শুধু আমার কেন কলকাতার কোনো হোটেলেরই হবে না, শাজাহান থেকে যখন বেরিয়েছ, তখন খিদিরপুরেই তোমাকে শেষ করতে হবে।
জেন-এর চোখ দিয়ে তখনও জল গড়িয়ে পড়ছে। রবির পায়ের আওয়াজ পেয়ে সে তাড়াতাড়ি চোখ মুছে ফেলেছে। সারাদিন বড়বাজার, শ্যামবাজার আর ধর্মতলায় ঘুরে ঘুরে রবির দেহটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। ঘামে জামা কাপড়গুলো ভিজে গিয়েছে। সারাদিন রবি কিছুই বিক্রি করতে পারেনি। আগে যা বিক্রি করেছে, তার দামও আদায় করতে পারেনি। অথচ মাস শেষ হয়ে আসছে, বিলেতে হিসেব পাঠাতে হবে।
