বউদি অঝোরে কেঁদেছে। জিজ্ঞাসা করেছে, তোমরা কারা? তোমরা কেন এত করছ?
ছেলেরা বুঝতে না পেরে, প্রথমে ভড়কে গিয়েছে। মুখচাওয়াচাওয়ি করে বলেছে, কী করছি আমরা?…ও…সায়েবদাদার অসুখ তাই। অসুখ না করলে আমরা কিছুই করতাম না। ফাদারের পেয়ারা গাছ থেকে পেয়ারা চুরি করে খেতাম।
ছেলেদের কাছেই আবার একদিন খবর পেলাম। খবর নিতে একদিন জেন-এর কাছে যাচ্ছিলাম। গলির মোড়ে ছেলেরা মুখ শুকনো করে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখেই ওরা সরে গেল। নিজেদের মধ্যে সভয়ে ফিস্ ফিস্ করে কী যেন বললে, আমাকে সোজাসুজি কিছুই বলতে চাইল না। অথচ বাড়িতে জেনকে দেখতে পেলাম না। সেখানে কেউ নেই।
ওরা বললে, আপনি ফাদারের সঙ্গে দেখা করুন।
ওদেরই একজন আমাকে ফাদারের কাছে নিয়ে গেল। ফাদার তখন বোধহয় ভিতরে ছিলেন। একটু অপেক্ষা করবার পর, ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, ও আপনি এসে গিয়েছেন? শুনেছেন?
বললাম, না, এখনও কিছু শুনিনি।
ফাদার বললেন, সেই নবজাত শিশুকে আমার স্ত্রী দুধ খাওয়াবার চেষ্টা করছেন। বহু কষ্ট করে একটা ওয়েট নার্স যোগাড় করে এনেছি।
মানে? আমি চমকে উঠেছি।
ওদের কী দোষ? ওদের সত্যি দোষ নেই। ওরা লজ্জা পেয়েছে, ভয়ে আমার কাছে আসছে না, কিন্তু আমি জানি, অলমাইটি গডের চরণতলে তারা কিছু অপরাধ করেনি। তবে, আমাকে একবার জিজ্ঞেস করতে পারত। আমি তো ডাক্তারদের সঙ্গে রোজ কথা বলি। প্রয়োজন হলে আমিই বলতে পারতাম।
ফাদারের কাছে ঘটনাটা শুনলাম—
সেদিনও পাড়ার ছেলেরা ফিরিঙ্গি কালীর ফুল নিয়ে রবিকে দেখতে গিয়েছিল। অর্থাৎ ওয়ার্ডের সামনে পর্যন্ত গিয়েছিল, যেখানে লেখা—No ADMISSION, সেখানে অন্যদিনের মতো ওয়ার্ড-বয়ের হাতে তারা টিফিন থেকে বাঁচানো কয়েকটা পয়সা দিয়েছে। ফুলগুলো সায়েবের বিছানার তলাতে দেবার জন্যে বলেছে। ফুলগুলো সায়েবের বিছানার তলায় দিয়ে ওয়ার্ড-বয় আবার ফিরে এসেছে। ছেলেরা জিজ্ঞেস করেছে, সায়েবদাদা কেমন আছেন?
ওয়ার্ড-বয় বলেছে, সায়েব তোমাদের কে হয়?
কেউ নয়। আমাদের পাড়ায় থাকেন। সায়েবদাদা যে আমাদের মতো গরিব হয়ে গিয়েছেন। মেমবউদি আমাদের মতো ডাল ভাত খেয়ে থাকেন। কী করবে, পয়সা নেই।
ওয়ার্ড-বয় মাথা দুলিয়ে বলেছে, তা হলে আপনাদের বলি, পেসেন্ট আপনাদের আত্মীয় নন যখন। বত্রিশ-নম্বরের আঁখ খতম। ডাগদার সাব আজ ভোরে দেখেছেন।
অন্ধ! সায়েবদাদা জীবনে আর দেখতে পাবেন না? ছেলেদের চোখ ছলছল করে উঠেছে। যদি আমরা চাদা করে আট টাকা ভিজিটের ডাক্তার নিয়ে আসি, দারোয়ানজি?
ওয়ার্ড-বয় ততক্ষণে ভিতরে ঢুকে পড়েছে। ওদের কথা আর কানেও নেয়নি।
মেমবউদিকে ওরা প্রথমে বলতে চায়নি। মেমবউদি জিজ্ঞেস করেছেন, আজ তোমরা রবিকে কেমন দেখলে? রবি কেমন আছে?
তারা মিথ্যে বলতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মিথ্যে কথা বলবার অভ্যেস নেই যে ওদের। কিছু না বলে তারা চোখের জল মুছতে আরম্ভ করেছিল। একজন এরই মধ্যে হঠাৎ কান্নায় ভেঙে পড়ল।
মেমবউদি তখন ওদের হাত চেপে ধরেছেন। বলো বলছি। আমি তোমাদের গুরুজন। আমাকে মিথ্যে বললে তোমাদের অকল্যাণ হবে।
ওরা বলে ফেলেছে। সায়েবদাদা যে পৃথিবীর আলো কোনোদিন চোখ দিয়ে দেখতে পাবেন না, তা আর চেপে রাখতে পারেনি।
জেন-এর জ্ঞানহীন দেহটা ঠিক সঙ্গে সঙ্গেই যে মেঝেতে লুটিয়ে পড়বে, তারা তা ভাবতে পারেনি। মেমবউদির মুখ তারা জলের ঝাপটা দিতে আরম্ভ করেছে, আর একজন ডাক্তার ডাকতে ছুটেছে। ডাক্তার এসে পরীক্ষা করে বলেছেন, এখনি ওষুধ কিনে নিয়ে এসো। ওষুধ কেনার পয়সা ছেলেদের কাছে ছিল না—যা দরকার তার থেকে আট আনা কম হয়ে যাচ্ছে। ছেলেরা তখন ফাদারের কাছে ছুটে এসেছে। ফাদারও সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে এসেছেন।
জেনের সংজ্ঞাহীন দেহটাকে ফাদারের বাড়িতে আনা হয়েছে। এবং সেই রাত্রে সে এক সন্তানের জন্ম দিয়েছে—প্রিম্যাচিওর বেবি। দুঃখদিনের রাজা নির্ধারিত সময়ের আগেই ঘরে এসেছেন।
শেষ রাত্রেই ফাদার মৃত্যুপথযাত্রী জেনের জন্য নতজানু হয়ে সর্বশক্তিমানের উদ্দেশে প্রার্থনা জানিয়েছেন। রাত শেষ হবার আগেই উইলিয়ামস লেনের লোকাল বয়েজদের কাঁদিয়ে জেন যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে, শাজাহান হোটেলের বার তখনও বন্ধ হয়নি। সায়েবরা তখনও নিশ্চয় চিৎকার করছেন, হে মিস, হুইস্কি সরাব, ব্লতি পানি লে আও।
ফাদার অসন্তুষ্ট হয়েছেন। দুঃখের সঙ্গে ছেলেদের বলেছেন, কে তোমাদের বলেছে, সে অন্ধ হয়ে গিয়েছে? বাজে কথা। একটা চোখওনলি ওয়ান আই–নষ্ট হয়েছে। আর একটা ঠিক আছে। মিরাকুলাসলি বেঁচে গিয়েছে।
কিন্তু তখন বড় দেরি হয়ে গিয়েছে। জেন-এর প্রাণহীন দেহ তখন সাদা চাদরে ঢাকা দেওয়া হয়ে গিয়েছে। লোকাল বয়েজরা সেই রাত্রে হাঁটতে হাঁটতে লোয়েলিন কোম্পানিকে খবর দিতে চৌরঙ্গীতে চলে গিয়েছে। লোয়েলিন কোম্পানি—আন্ডারটেকার। ছেলেরা বলেছিল, যদি আপত্তি না থাকে, আমরাই কাঁধে করে নিয়ে যাব। আমরাই সব করব।
ফাদার বলেছিলেন, তোমরা থেকো, কিন্তু ক্রিশ্চান ফিউনারাল-এ আজও অনেক গোলমাল আছে। লোয়েলিন কোম্পানিকে না-ডাকলে অসুবিধে হবে। ওরা দিনরাত ওই কাজ করছে।
রবি ওদিকে সুস্থ হয়ে উঠছে। জ্বর কমে গিয়েছে। শরীরের অসহ্য জ্বালাটাও যেন ক্রমশ কমছে। ঘাগুলো শুকিয়ে আসছে। এতদিন সব যেন ভুলেই ছিল। আবার সব মনে পড়ছে। উইলিয়ামস লেনের একটা ভাঙা বাড়িতে জেনকে যে রেখে এসেছে তাও মনে পড়ল।
