হ্যাঁ, যা বলছিলাম।—বোসদা আবার শুরু করলেন। আমি যেবার চাকরিতে ঢুকেছিলাম, সেবার ওঁরা কাগজে যা বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন, তার মানে দাঁড়ায়-শেক্সপিয়ারের মতো ইংরিজি, রবীন্দ্রনাথের মতো বাংলা, আর তুলসীদাসের মতো হিন্দি জানা একটি লোক চাই। মাইনে পঁচাত্তর টাকা। তার উত্তরে ওঁরা আমার মতো লোক পেলেন। সব কোয়ালিফিকেশনই আছে, কেবল একটু এদিকে ওদিক—তুলসীদাসের মতো ইংরিজি, শেক্সপিয়ারের মতো বাংলা এবং রবীন্দ্রনাথের মতো হিন্দি জানা লোক আমি! কিন্তু কাজ কি চলছে না? বেশ ভালোভাবেই চলছে। যা হোক, ওসব বাজে চিন্তা না করে এখন কাউন্টারের ভিতরে ঢুকে পড়ো।
০৪. এবার রিসেপশনিস্টের গল্প
এবার রিসেপশনিস্টের গল্প। রোজি বলে এক উদ্ভিন্ন-যৌবনা হোটেল-মানো টাইপ-ললনার পুনরাবির্ভাবের গল্প। কেমন করে সত্যসুন্দরদার অনুগ্রহে আমি হোটেলের সব রকম কাজ শিখলাম, সবাইকে খুশি করলাম, কাউন্টারে দাঁড়িয়ে কলকাতার কালো জাদু দেখলাম, তার গল্প।
কিন্তু সে-সবের আগে সাদারল্যান্ড সায়েবের কাহিনি। আজ এতদিন পরে কেন জানি না, সাদারল্যান্ড সায়েবের মুখটা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছে।
সাদারল্যান্ড সায়েবের টানা-টানা পটল-চেরা চোখ দেখে আমার যাঁর কথা মনে হয়েছিল তার নাম কৃষ্ণ। বোসদা বলেছিলেন, তুমি বড়ো সঙ্কীর্ণ মনের। সব কিছুকে দেশি উপমা দিয়ে বুঝতে চাও। সে-উপমা তেমন ভালো না হলেও, তুমি ছাড়বে না। সেই আদ্যিকালের ঈশ্বর গুপ্তকে আঁকড়ে বসে আছ—দেখো দেশবাসিগণে, কত রূপে স্নেহ করি দেশের কুকুর ধরি বিদেশের ঠাকুর ফেলিয়া।
আমি বলেছিলাম, আক্রমণ তো ঠিক হল না! আমি বিদেশিকে ধরে দেশের ঠাকুর বানাচ্ছি।
বোসদা বলেছিলেন, যতই পাবলিসিটি করো, আমাদের কিষেণঠাদ কি সাদারল্যান্ডের মতো লম্বা ছিলেন?
আমি বলেছিলাম, দরজির ফিতে দিয়ে আমরা দেবতাদের মহত্ত্ব মাপি না।
তা মাপো না, কিন্তু রাধিকার দেহ-সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গিয়ে মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত কোনো অংশই তো বাদ দাও না। বোসদা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিয়েছিলেন।
তারপর বলেছিলেন, আমাদের ঠাকুর দেবতারা আমাদের মতোই ছোট-খাট ছিলেন। সাদারল্যান্ড-এর সঙ্গে যদি কারুর তুলনা করতে হয় সে হলো গ্রিক ভাস্কর্যের। এই গ্রিক ভাস্কর্য দেখবার জন্য তোমার গ্রিসে যাবার দরকার নেই। কলকাতার পুরনো জমিদার বাড়িতে এখনও দু-চারটে ধ্বংসাবশেষ যা পড়ে আছে, তাই দেখলেই বুঝতে পারবে। ওইসব মূর্তির একটা হারিয়ে গেলে, তার জায়গায় সাদারল্যান্ডকে বসিয়ে রাখা যেতে পারে।
আজও যখন সাদারল্যান্ডের দেহটা আমার স্মৃতিতে অস্পষ্ট হয়ে ওঠে, তখন বোসদার উপদেশ উলটোভাবে কাজে লাগাই। চিৎপুর রোডে আমার এক পরিচিত পুরনো বাড়িতে গ্রিক ভাস্কর্যের তৈরি একটা উলঙ্গ পুরুষমূর্তি দেখতে যাই। অবহেলায় অযত্নে এবং আঘাতে সেই অপরূপ পুরুষমূর্তি আজ ক্ষতবিক্ষত। একটা হাত ভেঙে গিয়েছে, মুখের কিছু অংশ যেন কোনো দুর্ঘটনায় উড়ে গিয়েছে। কিন্তু তাতে আমার বিশেষ অসুবিধে হয় না। বরং সুবিধেই হয়—লোয়ার সার্কুলার রোডের সমাধিক্ষেত্রে ওঁর মুখে যে যন্ত্রণাময় বেদনা ফুটে উঠেছিল, তা আবার দেখতে পাই।
সেই যে প্রথম ওঁকে দেখেছিলাম, তখন শাজাহান হোটেলে আমার জীবন সবে শুরু হয়েছে। তখন শুনেছিলাম, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যসংস্থার কাজে ভারতবর্ষে এসেছেন তিনি। তারপর তাকে অনেকদিন আর দেখিনি। আমিও খোঁজ করিনি। প্রতিদিন কত জনই তো হোটেলে আসছেন, আবার কতজনই তো শাজাহান হোটেলের ঘর খালি করে দিয়ে, ব্যাগ এবং বাক্স সমেত হাওয়াই কোম্পানির জাহাজে চড়ে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছেন। এই প্রতিনিয়ত আসা-যাওয়ার মধ্যে কাকে দেখব, আর কাকেই বা মনে রাখব?
শুনেছিলাম, কি একটা জরুরি ভ্যাকসিন সম্বন্ধে উপদেশ দেবার জন্য তিনি এসেছিলেন; এবং কয়েকটি সর্বনাশা রোগের জীবাণু আইস-বাক্সর মধ্যে সাজিয়ে নিয়ে তিনি আবার ভারতবর্ষ ছেড়ে চলে গিয়েছেন।
গতরাত্রে লন্ডনের এরোপ্লেন নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে দমদমে এসে পৌঁছেছিল। সেই প্লেনে ডাক্তার সাদারল্যান্ড যখন আবার কলকাতায় ফিরে এসেছেন তখন ঘরের মধ্যে আমি গভীর ঘুমে অচেতন হয়েছিলাম।
ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে, বাইরে বেরিয়ে যে ডাক্তার সাদারল্যান্ডকে ইজিচেয়ারে বসে থাকতে দেখব, আমি কল্পনাও করিনি। একটা গেঞ্জি এবং ফুলপ্যান্ট পরে তিনি পূর্ব দিগন্তের দিকে স্বপ্নাবিষ্টের মতো তাকিয়ে রয়েছেন। দূরে রাস্তায় ভোরের বাস এবং লরির ঘরঘর শব্দ ভেসে আসছে, তিনি যেন সে শব্দও মন দিয়ে শুনছেন।
ওঁকে দেখে অপ্রস্তুত হয়ে, ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়েছি। আমার গায়ে কোনো গেঞ্জিও ছিল না। একটা লুঙি পরেই বেরিয়ে এসেছিলাম।
গুড়বেড়িয়া বেড-টি দিতে ঘরে আসতে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ওই সায়েব ছাদে এলেন কী করে?
গুড়বেড়িয়া বললে, তা জানি না হুজুর। বোস সায়েব রাত্রে ওঁকে নিয়েই উপরে উঠে এলেন। তিনশো সত্তর খালি ছিল, ওইখানেই ওঁকে ঢুকিয়ে দেওয়া হল।
উপরের এই সব ঘর গেস্টদের দেওয়া হয়? আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
গুড়বেড়িয়া বললে, বোস সায়েবের কী যে মতলব জানি না। গুড়বেড়িয়া যে বোস সায়েবের উপর একটু অসন্তুষ্ট হয়ে আছে, তা জানতাম। অসন্তুষ্ট হবার কারণও ছিল, পরবাসীয়া কফি হাউসের এক ছোকরার সঙ্গে মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধ করছে।
