না, ঘুমিয়েছি তো।-কোনোরকমে বললাম।
বোসদা সব বুঝলেন। আস্তে আস্তে বললেন, প্রথম প্রথম অমন হয়। আমারও হয়েছিল। তারপর দেখে দেখে তোমার চোখ পচে যাবে। মনে হবে এইটাই তো স্বাভাবিক।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বোসদা এবার গুড়বেড়িয়াকে ডাকলেন। বললেন, আমাদের দুজনের খাবার শংকরবাবুর ঘরে দিয়ে যেও।
তারপর আমার বিছানা থেকে উঠে পড়ে বললেন, তাড়াতাড়ি স্নান করে রেডি হয়ে নাও। একসঙ্গে নিচে নেমে যাব। শ্রীমান উইলিয়ম ঘোষ এতক্ষণে আমার ফোর্টিনথ জেনারেশনকে নরকে পাঠাচ্ছে।
মাখন মাখানো রুটি ও ওমলেট সহযোগে ব্রেকফাস্ট আরম্ভ হল। চায়ের কাপের আকার দেখে একটু অবাক হয়েছিলাম। তা লক্ষ্য করেই বোধহয় বোসদা বললেন, ব্রেকফাস্টে ওরা একটু বেশি চা খায়। এই কাপগুলোর নাম ব্রেকফাস্ট কাপ।
আমাদের কথাবার্তা হয়তো আরও চলত। কিন্তু বেয়ারা এসে খবর দিল, একজন ভদ্রলোক আমার সঙ্গে দেখা করবার জন্যে বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন।
আমার সঙ্গে! আমি অবাক হয়ে গেলাম। কিন্তু কিছু বলবার আগেই যিনি ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়লেন, তিনি বায়রন সায়েব ছাড়া আর কেউ নন।
গুড মর্নিং। স্যরি, বিনা নোটিশেই তোমাদের ঘরে ঢুকে পড়লাম। বায়রন সায়েব বললেন।
ওঁদের পরিচয় করিয়ে দেবার জন্যে বললাম, বোসদা, ইনিই বায়রন সায়েব, আমার চাকরি করে দিয়েছেন।
বোসদা নিজের পরিচয় দিতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তার আগেই বায়রন সায়েব বললেন, আর আপনি হলেন শংকরের বন্ধু, শাজাহান হোটেলের ম্যানেজারের দক্ষিণ হস্ত মিস্টার সত্যসুন্দর বোস। এখানে এগারো বছর কাজ করছেন, তার আগে একবার আপনার মামার মারফত এ্যান্ডে ঢোকবার চেষ্টা করেছিলেন।
আমরা দুজনেই অবাক হয়ে গেলাম। বোসদা যেন কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। বায়রন বললেন, আশ্চর্য হবার কিছু নেই। আমরা প্রাইভেট ডিটেটিভ, আমাদের জেনে রাখতে হয়—জেনে রাখাটাই আমাদের ক্যাপিটাল। আর জানানোটা আমাদের বিজনেস।
বায়রন এবার আসল প্রসঙ্গের অবতারণা করলেন। বোসদা বললেন, আমি কি উঠে যাব?
না, না, উঠবেন কেন? আপনাকে আমার দরকার। আজ সকালেই একটা খারাপ খবর পেলাম। তাই সঙ্গে সঙ্গে চলে এসেছি।
কী খবর? আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড। রোজি বোধহয় ফিরে আসছে।
অ্যাঁ!—আমি আর্তনাদ করে উঠলাম।
বায়রন বললেন, মিসেস ব্যানার্জি মিস্টার ব্যানার্জির খবর পেয়েছেন। বোম্বাইতে মিসেস ব্যানার্জির ভাই খোকা চ্যাটার্জি আমার পাঠানো ঠিকানা থেকে ভগ্নীপতির পাত্তা করেছেন। বকাবকিতে মিস্টার ব্যানার্জির মন সংসারের দিকে আবার ফিরে গিয়েছে। রোজিকেও কীভাবে খোকা চ্যাটার্জি শান্ত করেছেন। মিস্টার ব্যানার্জি যখন ফিরছেন, রোজিও তখন আর কোথায় পড়ে থাকবে? বিশেষ করে বোম্বাই-এর মতো জায়গায়!
ভোরবেলায় এমন সংবাদ শোনবার জন্যে আমি মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না।
বায়রন বললেন, এখনই ভেঙে পোড়ো না। আমি মার্কোপোলোর সঙ্গে দেখা করে তবে যাব। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যদি অন্য পোস্ট খালি না থাকে?
বোসদা একটু চিন্তা করলেন, তারপর উৎফুল্ল হয়ে উঠে বললেন, কিছু ভয় নেই।
আর সময় নষ্ট না-করে ওঁরা দুজন মার্কোপোলোর সঙ্গে দেখা করতে চলে গেলেন। আমি ওঁদের সঙ্গে যেতে সাহস করলাম না। মার্কোপোলোর ঘরের বাইরে ঘোরাঘুরি করতে লাগলাম।
মথুরা সিং আমাকে দেখে বললে, বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন কেন? ভিতরে যান।
মথুরা সিংকে আমি বলতে পারলাম না, কেন বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছি। আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে তিন প্রধান এতক্ষণে বৈঠক শুরু করে দিয়েছেন। মনে মনে ঈশ্বরকে প্রণাম জানিয়েছি। অযাচিতভাবে তিনি আমাকে বন্ধু দিয়েছেন—বিপদের দিনে, প্রতিদানের কোনো আশা না-নিয়েই বায়রন সায়েব এবং বোসদার মতো লোকেরা আমার হয়ে অন্যের সঙ্গে লড়াই শুরু করে দিয়েছেন।
প্রায় মিনিট পনেরো পরে তারা যখন বেরিয়ে এলেন, তখন দুজনের মুখেই হাসি। বায়রন বললেন, যদি তোমার কোনো থ্যাঙ্কস থাকে, মিস্টার বোসকেই দাও। রিসেপশনে দুজন লোকে যে কাজ চলে না, ক্যাবারেতে টিকিট বিক্রির লোক যে প্রায়ই পাওয়া যায় না, মমতাজ রেস্তোরাঁয় ড্রিংকস্ এবং ফুডের অর্ডার যে বাধ্য হয়েই বোসকে দশ ঘণ্টা ডিউটির পরেও নিতে হয়, তা মার্কোপোলোকে উনি জলের মতো সহজ করে বুঝিয়ে দিলেন।
আমি বোসদার মুখের দিকে কৃতজ্ঞ নয়নে তাকিয়ে রইলাম। বোসদা পিঠে একটা থাপ্পড় মেরে বললেন, এতদিন শুধু বসে বসে বাক্স বাজাতে; এবার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের সঙ্গে কাজ করবে। রোজি অর নো রোজি, তুমি কাউন্টারে ডিউটি দেবে। আমারই লাভ হল, মিস্টার বায়রন। ওবিডিয়েন্ট ওয়াইফ আর একটা বশংবদ অ্যাসিস্ট্যান্ট না পেলে লাইফে বেঁচে সুখ কী?
কাউন্টারের কাজ? আমি প্রশ্ন করলাম।
হ্যাঁ, হা, হাতি ঘোড়া কিছু নেই। তুমিও পারবে। বোসদা বললেন।শুধু দুটো স্যুট তৈরি করে ফেলতে হবে। সে খরচ তোমার নয়, হোটেল দেবে।
কিন্তু আপনারা যে কতরকমের ভাষা কেমন অনর্গলভাবে বলে যান। আমি তো কোনো ভাষাই ভালো করে বলতে পারি না। আমি ভয়ে ভয়ে নিবেদন করলাম।
বোসদা এবার হা হা করে হেসে উঠলেন। বললেন, কাউন্টারে চলো, তোমাকে আমার জীবনের একটা অভিজ্ঞতার কথা বলব।
কাউন্টারে উইলিয়ম ঘোষ তখন খাতাপত্তর বন্ধ করে বোসদার জন্যে অপেক্ষা করছিল। তাকে বিদায় দিয়ে বোসদা বললেন, সায়েব তো এখন তোমাকে ডিক্টেশন দিচ্ছেন না; আমার ফাইফরমাস খাটো। সব ট্রেড সিক্রেট আস্তে আস্তে শিখিয়ে দেব।
