কালো মতো ভদ্রলোক। একেবারে তরুণ নন। সরু পাকানো চেহারা, জুলপির চুলগুলো যে পেকে সাদা হয়ে গিয়েছে, তা দুর থেকেই বুঝতে পারলাম। একটু এগিয়ে গিয়ে দেখলাম, ভদ্রলোক এক মনে ব্যায়াম করছেন, আর তার সামনে একটা স্টোভে জল ফুটছে। ব্যায়াম করতে করতেই ভদ্রলোক এক একবার জলের দিকে তাকাচ্ছেন।
আমাকে দেখেই ভদ্রলোক মৃদু হাসলেন। তারপর চমৎকার বাংলায় বললেন, নমস্কার। আপনারও কি ভোরবেলায় ওঠার অভ্যাস?
বললাম, না। আমার মা গালাগালি করেও আমাকে সকালে ঘুম থেকে তুলতে পারেন না। কিন্তু কেন জানি না, আজ ভোরবেলায় উঠে পড়েছি।
ভদ্রলোক যে আমার খবরাখবর রাখেন তা বুঝলাম। তিনি নিজেই বললেন, রোজির জায়গায় আপনি এসেছেন তো?
এবার ভদ্রলোক নিজের পরিচয় দিলেন—আমার নাম পি সি গোমেজ—প্রভাতচন্দ্র গোমেজ। এখানে বাজনা বাজাই-ব্যান্ডমাস্টার।
আপনি এখানেই থাকেন? আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
না থেকে উপায় নেই—রাত্রে যখন ক্যাবারে শেষ হয়, তখন কলকাতায় বাস ট্রাম থাকে না।
ভদ্রলোক এবার ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়লেন। এক গ্লাস জল এনে স্টোভের পাত্রের মধ্যে ঢেলে দিলেন। আপনার জন্যেও এক কাপের ব্যবস্থা করছি।
আমি আপত্তি করতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু তিনি শুনলেন না। বললেন, প্রথম আলাপ। আমি সামান্য মানুষ, একটু কফি দিয়েই উৎসব করা যাক।
কফি? এই সাত সকালে?
গোমেজ হেসে ফেললেন। হ্যাঁ, ঠিক চারটের সময়, বিনা দুধ এবং বিনা চিনিতে এক পাত্র প্রচণ্ড কড়া কফি আমি খেয়ে থাকি। আপনি অত কড়া খেতে পারবেন না। আপনাকে চিনি মিশিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু স্যরি—দুধের কোনো ব্যবস্থা নেই আমার।
লজ্জায় মাটিতে মিশে যাচ্ছিলাম। এই ভোরবেলায় ভদ্রলোককে কষ্ট দিচ্ছি।
কাপে কফি ঢালতে ঢালতে গোমেজ বললেন, ব্রাহম—দি গ্রেট কম্পোজার—তিনি ভোরবেলায় এমনি কফি খেতেন।
কফির কাপে চুমুক দিতে দিতেই শুনলাম, ব্রাহম নিজের কফি নিজেই তৈরি করে খেতেন। আর এই তেততা, কড়া এবং কালো কফির কাপে চুমুক দিতে দিতেই তিনি চারটে সিমফনি, দুটো পিয়ানো কনসার্টো, একটা ভায়োলিন কনসার্টো, আর একটা ডবল কনসার্টে ফর ভায়োলিন অ্যান্ড চেলো সৃষ্টি করে গিয়েছেন।
কথাগুলোর অর্থ আমি ঠিক ধরতে পারছিলাম না। কিন্তু গোমেজ যে দরদ দিয়েই বলছেন, তা বোঝা যাচ্ছিল। আমার কাপটা ধুয়ে দিতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু গোমেজ কিছুতেই রাজি হলেন না। হেসে বললেন, তা হয় না। ব্রাহম-এর বাড়িতে যখন সুম্যান অ্যাসতেন, তখন কি তিনি কফির কাপ ধুতেন?
সুম্যান ভদ্রলোক কে আমার জানা ছিল না। আমার মুখের অবস্থা দেখে গোমেজ বোধহয় সঙ্গীতবিদ্যায় আমার গভীরতার আন্দাজ পেলেন। বললেন, দি গ্রেট সুম্যান। যার একটা প্রবন্ধের জোরে অখ্যাত ব্রাহম রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গেলেন।
সঙ্গীতের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কোনো দিনই বিশেষ মধুর নয়। কিন্তু সেই অজ্ঞতা চাপা দিয়ে গোমেজকে প্রশ্ন করলাম, তার মানে, এখানে আমি কি সেই সঙ্গীত-রস-চূড়ামণি সুম্যান?
না, তা হয়তো নন, কিন্তু আপনি আমার অতিথি, গোমেজ বললেন। তারপর প্রসঙ্গ পরিবর্তন না করেই বললেন, ব্ৰাহমের কাছে আমি এই শিখেছি যে, পৃথিবীতে কোনো কষ্টই কষ্ট নয়—কোনো অভাবই অভাব নয়, কোনো বেদনাই বেদনা নয়। আমাদের সকল কাঁটা ধন্য করে সঙ্গীতের ফুল ফুটে ওঠে।
এদিকে সূর্য আকাশে উঠতে আরম্ভ করেছেন। মিষ্টি হেসে গোমেজ এবার নিজের ঘরে ঢুকে পড়লেন। বললেন, ছেলেগুলো এখনও ঘুমোচ্ছে। ওদের জাগিয়ে দেওয়া দরকার।
আর আমিও নিজের ঘরে ফিরে এলাম।
ঘরে ফিরেও রাত্রির সেই অভিজ্ঞতার কথা ভুলতে পারছিলাম না। উঁকি মেরে দেখলাম, আমার পাশের ঘরের দরজা বন্ধ। চায়ের ট্রে হাতে করে গুড়বেড়িয়া সেই ঘরের মধ্যে কিন্তু বেমালুম ঢুকে পড়ল। চায়ের ট্রে ভিতরে রেখে দুসেকেন্ডের মধ্যে সে ছিটকে বেরিয়ে এল। মুখটা কুঁচকে গজগজ করে নিজের ভাষায় বলতে লাগল, এ তো মহা ফ্যাসাদে পড়া গেল। ক্যাবারে মেমসাব ভিতর থেকে চাবিও লাগাবে না, অথচ কাপড়ও পরবে না।
ঘরের মধ্যে আমি চুপচাপ বসে ছিলাম। এমন সময় দরজায় টোকা পড়ল। উঠে গিয়ে দরজা খুলেই দেখলাম সত্যসুন্দরদা। ভিতরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করতে করতে সত্যসুন্দরদা বললেন, নিজে উঠে দরজা খোলার দরকার নেই। শুধু বলবে, কাম ইন। আর যদি দরজা খোলবার অবস্থায় না থাকো তবে বলবে, জাস্ট-এ-মিনিট। এই মিনিট বলে তুমি হোটেলে আধ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় নিতে পারো।
সত্যসুন্দরদা জিজ্ঞেস করলেন, বিছানা-চা পেয়েছ তো?
বিছানা-চা?
হ্যাঁ, বিছানায় শুয়ে শুয়ে দাঁত মুখ না পরিষ্কার করে শাজাহান হোটেলের শাজাহানরা যে বেড-টি পান করেন, তারই বাংলা নাম বিছানা-চা।
বললাম, এই মাত্র কফি…
কথা শেষ করতে হল না। বোসদা যেন হাঁ করতেই সব বুঝে নিলেন। প্রথম দিনেই ছাত-কফি খেয়েছ তুমি—তুমি তো খুবই লাকি চ্যাপ। দুনিয়াতে দুটি মাত্র লোকের ওই সময়ে কফি পানের অভ্যাস আমাদের গোমেজ সায়েব, আর জার্মানির ব্রহ্ম সায়েব।
ব্রহ্ম না, ব্রাহ্ম।—আমি হেসে বললাম।
ওই হলো—যাহা বাহান্ন তাহা তিপ্পান্ন। তাছাড়া শেক্সপিয়ার সায়েবই না বলে গিয়েছেন-নামে কী আসে যায়? ব্রাহমকে ব্ৰহ্ম বললে কি সুরকার হিসেবে তার দাম কমে যাবে, না ব্রাহ্ম সমাজে ব্রহ্মের পুজো বন্ধ হয়ে যাবে?
আমার মুখের দিকে তাকিয়ে সত্যসুন্দরদা এবার কেমন গম্ভীর হয়ে গেলেন। বললেন, কাল রাত্রে তুমি কি ঘুমোওনি?
