মেমসায়েব এবার গুড়বেড়িয়াকে শুদ্ধ ইংরিজিতে জিজ্ঞাসা করলেন, হুইস্কির হিন্দি কি?
হুইস্কির হিন্দি যে হুইস্কিই, তা শুনে বললেন, চাই। এখনই চাই।
বার আন্ডার লক অ্যান্ড কি–গুড়বেড়িয়া খানিকটা ইংরিজিতে, খানিকটা মাতৃভাষায় বুঝিয়ে দিলে, বার বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এখন ঠান্ডা পানি ছাড়া আর কিছুই সে দিতে পারবে না।
ও মামি, তুমি আমাকে কোন ফরেস্টে নিয়ে এসেছ? বলে মেয়েটি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে আরম্ভ করলেন।
মা বোধহয় তখন সান্ত্বনা দিতে লাগলেন, কেমন করে জানব, ক্যালকাটায় রাত একটার পর কোনো বার খোলা থাকে না? সোনা আমার, বাছা আমার, ঘুমিয়ে পড়বার চেষ্টা করো, এখনই ভোর হয়ে যাবে।
মেয়ে তখন গালাগালি শুরু করেছেন। গেট আউট, গেট আউট। আমার ঘর থেকে বেরিয়ে যা। তুই শুধু আমার টাকা ভালোবাসিস। ওনলি মানি। টাকার বদলে মেয়েকে তুই শার্কদের কাছেও ছেড়ে দিতে রাজি আছিস।
প্যামেলা, প্যামেলা—ভদ্রমহিলা কাতরভাবে মেয়েকে সংযত করার চেষ্টা করলেন।
বেরিয়ে যা! বেরিয়ে তুই নিজের ঘরে যা, আমি এখন আনড্রেস করব। আমার সামনে কেউ থাকবে না। মেয়ে দাঁত চেপে চিৎকার করে উঠলেন।
মাই ডিয়ার গার্ল, আমি তোমার মা। মায়ের কাছে তোমার সঙ্কোচ থাকতে পারে না। আমারও মা ছিল। আমি তো কখনও অবাধ্য হতাম না। ভদ্রমহিলা বোঝাবার চেষ্টা করলেন।
ও, সেইজন্যে বুঝি তুই আঠারো বছর বয়সে বাড়ি থেকে পালিয়েছিলি? বাটলারের সঙ্গে হাওয়া হয়ে গিয়েছিলি? মেয়ে ব্যঙ্গমিশ্রিত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন।
মা এবার রেগে উঠলেন।প্যামেলা, আমি যাঁর সঙ্গে বেরিয়ে এসেছিলাম তিনি তোমার বাবা।
ইয়েস! বাট হি ওয়াজ এ বাটলার। মেয়ে এবার খিলখিল করে হেসে উঠলেন।
আর আমার সমস্ত শরীর যেন শিউরে উঠল। এ আমি কোথায় এলাম? এ জগতের কিছুই যে বুঝতে পারছি না। সত্যসুন্দরদার উপর আমার রাগ হল। আমাকে এই ভাবে ফেলে তিনি কেমন নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছেন।
আমার অনেক পরিচিত মুখ যেন চোখের সামনে ভেসে উঠল। রামজী হাজরা লেনের ছোকাদা, উমেশ ব্যানার্জি লেনের হেজাদা, নবকুমার নন্দী লেনের পানুদা, কাসুন্দের কেষ্টদা—সবাই এখন ঘুমে অচেতন হয়ে রয়েছেন। শুধু আমি জেগে রয়েছি। আমার জাগবার ইচ্ছে নেই, তবু জেগে রয়েছি চোখের পাতা বন্ধ করতে সাহস হচ্ছে না।
ওদিকে পাশের ঘরে তখন পুরোপুরি কথা-কাটাকাটি চলছে। ভদ্রমহিলার বাটলার বাবার অর্ধেক গোপন কাহিনি ইতিমধ্যে আমি জেনে ফেলেছি। বুড়ি মা শেষ পর্যন্ত বললেন, তা হলে আমি কি অন্য ঘরে গিয়ে শোব?
ইয়েস, ইয়েস। কতবার তোকে বলব? আর এখনও যদি না যাস, তা হলে আমি বয়কে ডাকব, বার করে দেবার জন্যে।
ভদ্রমহিলা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, একলা শুয়ে থাকতে পারবি তো? ভয় করবে না তো!
খিলখিল করে হেসে মহিলা বললেন, আমার মরার দিন পর্যন্ত তুই আমার পাশে শুয়ে থাকবি, তা আমি জানি।
ভদ্রমহিলার মা এবার বিদায় নিলেন বোধহয়। শুভরাত্রি জানালেন তিনি। গুড় নাইট, মাই গার্ল। মে গড় ব্লেস ইউ-ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন।
ও-ঘরের আলো এবার নিবে গেল। শাজাহান হোটেলের রাত্রি এবার যেন সত্যিকারের রাত্রে রূপান্তরিত হল। আর গোবেচারা কাসুরে ভয়-পাওয়া ঘুম এবার সাহস পেয়ে পা টিপে টিপে আমার ঘরের মধ্যে ঢুকে আমাকে নিবিড় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করল।
সেইভাবে কতক্ষণ যে ছিলাম মনে নেই। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। দরজায় খুব আলতোভাবে যেন টোকা পড়ছে। জর্জ টেলিগ্রাফ ইস্কুলে একবার টেলিগ্রাফ শেখবার চেষ্টা করেছিলাম। একটা টেলিগ্রাফ কলও কিনেছিলাম। ঠিক তেমনি শব্দ—টরে টক্কা, টরে টক্কা।
তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে, অন্ধকারে চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুলতেই চাপা পুরুষালি আওয়াজ পেলাম-প্যামেলা! তুমি দরজা খুললে তা হলে। আমি ভাবছিলাম তুমি খুলবে না।
নিদ্রাজড়িত কণ্ঠে আমি চাপা আর্তনাদ করে উঠেছিলাম, হোয়াট? কে? কে আপনি?
রাত্রের আগন্তুক এবার বোধহয় সংবিৎ ফিরে পেলেন। মাথা নিচু করে পালাতে পালাতে বললেন, স্যরি, রং নাম্বার।
আমার দেহটা তখন সত্যিই কাপতে আরম্ভ করেছে। স্লিপিং গাউন পরা হটা সেই সুযোগে যে কোনদিকে অদৃশ্য হয়ে গেল বুঝতে পারলাম না।
আলো জ্বালিয়ে বাইরে এসে দেখলাম—টুলের উপর গুড়বেড়িয়া অঘোরে ঘুমিয়ে রয়েছে। তার পায়ের গোড়ায় একটা বেড়ালও মনের সুখে রাত্রির বিশ্রাম গ্রহণ করছে। ওদিকে টুলের পাশে একটা টেবিলে আর একটা বেড়াল পরম সুখে শেষ রাত্রের নিদ্রা উপভোগ করছে। গুড়বেড়িয়ার মাথার উপর একটা আলো শুধু জেগে রয়েছে-সব কিছু দেখে শুনে আলোটাও যেন ভ্যাবাচাকা খেয়ে গিয়েছে।
রাত্রির প্রতীক্ষা কাকে বলে জানতাম না। আজ বুঝলাম আমি সত্যিই প্রভাতের অপেক্ষায় জেগে রয়েছি। শাজাহান হোটেলের ছাদের উপরে ময়লা আকাশ ক্রমশ পরিষ্কার হয়ে আসছে, আপিসের হেড ক্লার্ক নির্ধারিত সময়ের কিছু আগে থেকেই জুনিয়র বাবুদের আবির্ভাবের অপেক্ষায় যেমনভাবে ঘড়ির দিকে তাকাতে থাকেন, সূর্যের আশায় আমিও সেইভাবে পূর্ব দিগন্তের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
তখনও অন্ধকার কাটেনি। ঘোমটার আড়ালে রাঙাবউ-এর মান-অভিমান পালা শুরু হয়ে গিয়েছে। সেই প্রায়ান্ধকারে ছাদের কোণে এক ভদ্রলোককে দেখতে পেলাম। আন্ডারপ্যান্ট ও গেঞ্জি পরে তিনি খালি হাতের ব্যায়াম করছেন। ছোটার ভঙ্গিতে সামান্য লাফালাফি করছেন—স্লো মোশন পিকচার্সে যেমন দেখা যায়।
