হঠাৎ দরজায় ধাক্কা শুনতে পেলাম। কে যেন বার বার ন করছে। ধড়মড় করে উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দেখি গুড়বেড়িয়া দাঁড়িয়ে রয়েছে। বৃষ্টি কখন থেমে গিয়েছে।
গুড়বেড়িয়া বললে, হুজুর, আপনি আলো জ্বেলে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন?
সত্যি। বৃষ্টির ঘুমপাড়ানি ছন্দে, কখন যে চোখে ঘুম নেমে এসেছিল বুঝতে পরিনি। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম, রাত্রি অনেক হয়েছে।
গুড়বেড়িয়ার উপর রাগ হল। এত রাত্রে এমনভাবে ডেকে তোলবার কী প্রয়োজন ছিল?
মনে হল গুড়বেড়িয়া ভয় পেয়ে গিয়েছে। বললে, হজুর, রাত্রে আলো জ্বালিয়ে এমনভাবে ঘুমিয়ে পড়বেন না। আপনারও মুশকিল, আমারও মুশকিল।
চোখের পাতা দুটো রগড়াতে রগড়াতে বললাম, কেন?
গুড়বেড়িয়া ফিসফিস করে বললে, সিম্পসন সায়েব পছন্দ করেন না। কোনো কিছুর অপচয় তিনি দেখতে পারেন না।
সিম্পসন সায়েব?
হ্যাঁ, হুজুর, গুড়বেড়িয়া বললে। যারা রাত্রে ডিউটি দেয়, তারা সবাই ওঁকে ভয় করে। রাত্রে তিনি যে ইন্সপেকশনে আসেন। বড্ড কড়া সায়েব, হুজুর। একটুও মায়া দয়া নেই। সারারাত একতলা, দোতলা, তিনতলা, চারতলা ঘুরে ঘুরে বেড়ান।
সিম্পসন সায়েবকে তোমরা চেনো?
হ্যাঁ হুজুর। এই হোটেলের এক নম্বর মালিক। ডান পা-টা একটু টেনে টেনে চলেন। ওঁকে আমরা সবাই চিনি।
গুড়বেড়িয়ার গলা যেন শুকিয়ে আসছে। টোক গিলে গলাটা ভিজিয়ে নেবার চেষ্টা করে সে বললে, ওই সায়েবের জন্য রাত-ডিউটিতে একটু বিশ্রাম করবার উপায় নেই।
গভীর দুঃখের সঙ্গে গুড়বেড়িয়া বললে, হুজুর, মানুষ-সায়েবকে বুঝি। কিন্তু ভূত-সায়েব বড়ো নিষ্ঠুর; একটুও মায়া দয়া করে না।
গুড়বেড়িয়া বললে, তখন আমি নতুন চাকরিতে ঢুকেছি হুজুর। রাত দুটো বাজে। সমস্ত গেস্ট ঘুমিয়ে পড়েছে। সব ঘর ভিতর থেকে চাবিবন্ধ। একটুও শব্দ নেই কোথাও। করিডরের আলো নিভিয়ে দিয়েছে। শরীরটা তেমন ভালো যাচ্ছিল না। একটু ঝিমুনির মতো আসছিল। টুলের উপর বসে, পা দুটো তুলে সবে একটু চোখ বুজেছি। এমন সময় মনে হলো, কে যেন আমার কোমরের বেল্ট খুলে নিচ্ছে।
চমকে উঠে বেল্টটা চেপে ধরতেই বুঝলাম সিম্পসন সায়েব এসেছেন। তখন হুজুর ওঁর পা জড়িয়ে ধরতে গেলাম, কিন্তু হুজুর ভূতের পা কিছুতেই ধরা যায় না। অথচ কোমরের বেল্টটা এবার খুলে বেরিয়ে যাচ্ছে। শেষে কাঁদতে আরম্ভ করলাম। বললাম, আমি নতুন লোক, সায়েব। আর কখনও ভুল হবে না।
উনি কোনো কথায় কান না দিয়ে, বেল্ট নিয়ে চলে যাচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত কী ভেবে, তিনতলার শেষ কোণে বেল্ট ফেলে রেখে চলে গেলেন।
গুড়বেড়িয়ার কথা শুনে আমি আধা ঘুমন্ত অবস্থাতেও হেসে ফেলতে যাচ্ছিলাম।
গুড়বেড়িয়া বললে, হাসবেন না, হুজুর। হাবসি সায়েবকে জিজ্ঞাসা করবেন। এখানে সবাই জানে, সিম্পসন সায়েব বেঁচে থাকতে, সারারাত ঘুরে বেড়াতেন। দেখতেন, সবাই কাজ করছে কি না। কাউকে ঘুমোতে দেখলেই, তার বেল্ট খুলে নিতেন। পরের দিন সকালে জরিমানা দিয়ে বেল্ট খালাস করতে হতো। বেল্ট না পরে ডিউটিতে আসা একদম বারণ ছিল।
আলো না-নেভাবার জন্য গুড়বেড়িয়ার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, আমি ভিতরে ঢুকতে যাচ্ছিলাম। সেই সময় সিঁড়ির কাছে চার-পাঁচজনের খিলখিল হাসির শব্দ শুনতে পেলাম। সেই মিলিত হাস্যে নারী ও পুরুষের কণ্ঠস্বর ছিল।
গুড়বেড়িয়া চাপা গলায় বললে, আমি চললাম। আপনিও আর কথা বলবেন না।
কিছু বুঝতে না পেরে, একটু রেগে বললাম, কেন?
ফিসফিস করে গুড়বেড়িয়া বললে, অনেক রাত হয়েছে। ল্যাংটা মেমসায়েবরা ঘরে ফিরে আসছেন। আপনি আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ুন। আমাকে এক ভয়াবহ রহস্যের মধ্যে ফেলে রেখে গুড়বেড়িয়া দ্রুতবেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আলো নেভালাম, শুয়ে পড়লাম। কিন্তু ঘুম আসে না। আমার পরিচিত কাসুরে দরিদ্র ঘুম যেন শাজাহান হোটেলে ঢুকতে সাহস করছে না।
ওদিকে ছাদের উপর কারা খিলখিল করে হেসে উঠছে। সিঁড়ি বেয়ে হৈহৈ করে যে মেমসায়েবরা উপরে উঠে এলেন, গুড়বেড়িয়া যাদের এক অদ্ভুত নামে ডাকল, তাদেরই গলা। ঠিক আমারই পাশের ঘরে ওঁদের দু একজন এসে ঢুকলেন। পাতলা কাঠের পার্টিশনের মধ্যে দিয়ে তাদের গলার আওয়াজ পুরোপুরি ভেসে আসছে। তারাও কিছু চাপা গলায় কথা বলবার চেষ্টা করছেন না।
আমার ঘর অন্ধকার হলেও ওঁদের ঘরে আলো জ্বলছে। এবং সেই আলোরই কিছুটা কাঠের পার্টিশনের ফাঁক দিয়ে আমার ঘরে অনধিকার প্রবেশ করছে।
বাটলার, বাটলার! ও-ঘর থেকে নারীকণ্ঠে কে যেন ডেকে উঠলেন।
বেচারা গুড়বেড়িয়া যে ও-ঘরে ছুটে গেলো, তা বিছানায় শুয়ে শুয়েই আমি বুঝতে পারলাম।
ইউ বাটলার হ্যায়? মেমসায়েব বিরক্ত হয়েই প্রশ্ন করলেন।
না মেমসাব। আই গুড়বেড়িয়া ওয়েটার।
শুধু ওয়েটার বললেই ভালো করত। কিন্তু মধ্যিখানে নিজের নামটা ঢুকিয়ে দিয়েই গুড়বেড়িয়া মেমসায়েবকে আরও বিপদে ফেলে দিলে। কয়েকটা অশ্লীল শপথ করে মেমসায়েব বললেন, তুমি কী ধরনের ওয়েটার? সঙ্গে বোধহয় আরও কোনো ভদ্রমহিলা বসে ছিলেন। কারণ, শুনতে পেলাম মেম সায়েব বলছেন, আই টেল ইউ মামি, দিস ইজ মাই লাস্ট ভিজিট টু ইন্ডিয়া। এই শেষ, আর কখনো এই পোড়া দেশে আসব না।
ইন্ডিয়াতে এসে মহিলা যে প্রচণ্ড ভুল করেছেন, সে-কথা মেমসায়েব তার মাকে বার বার বোঝাতে লাগলেন। মামি, এত জায়গা থাকতে ইন্ডিয়াতে আসতে কেন তুমি রাজি হলে? মেমসায়েব জিজ্ঞাসা করলেন।
এঁরা কারা? বুঝতে পারছি না। কিন্তু সারা রাতই যে তারা কথা বলে কাটিয়ে দিতে পারেন তা বুঝলাম।
