অনভ্যস্ত আমি বৃষ্টিটা থামলে যেন একটু ভরসা পেতাম। বোসদাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করতাম, এ কোথায় এলাম?
বোসদা নিশ্চয়ই, তার স্বভাবসুলভ রসিকতায় উত্তর দিতেন, কলকাতার প্রাচীনতম শাজাহান হোটেলে।
হ্যাঁ, প্রাচীনতম। বোসদার কাছেই শুনেছিলাম—
সে কিছু আজকের কথা নয়। কোন দূর শতাব্দীর এক অখ্যাত বর্ষামুখর অপরাহ্নে জব চার্নক নামে এক ভদ্রলোক হুগলি নদীর তীরে এই কলকাতায় তাঁর তরী ভিড়িয়েছিলেন। সেদিন তার কষ্টের অবধি ছিল না। কিন্তু সেই ক্লান্ত অতিথিকে আশ্রয় দেবার জন্য কোনো সরাইখানার দরজা খোলা ছিল না। সুতানুটি হুগলির লোকেরা তখন হোটেল বা সরাইখানার নামও শোনেননি। জীবন তখন ছিল অনেক কঠিন। সে-রাত্রে চানক সায়েব নিজেই নিশ্চয় সব ব্যবস্থা করেছিলেন, যেমন অনাদিকাল থেকে বিদেশি পথিকরা করে এসেছেন।
তারপর কতদিন কাটল। নীল সমুদ্রের ওপার থেকে আরও কত আগন্তুক কলকাতার মাটিতে পদার্পণ করলেন। কিন্তু তখনও তাদের আশ্রয়ের জন্য কলকাতার নোনামাটিতে কোনো হোটেল গজিয়ে ওঠেনি।
হাসতে হাসতে বোসদা বলেছিলেন, ছোটোবেলায় রবীন্দ্রনাথের একটা কবিতা মুখস্থ করেছিলাম, কিন্তু তখন তার মানে বুঝতে পারিনি-দেশে দেশে মোর ঘর আছে, আমি সেই ঘর মরি খুঁজিয়া। এখন বুঝি, কবি যা মিন করেছিলেন, তা হলো–পৃথিবীর সব দেশেই হোটেলের ঘর রয়েছে। অনেক ঘরই দেখছি, কিন্তু কোনোটাই তেমন পছন্দ হচ্ছে না। এখনও মনের মতো ঘর খুঁজে মরছি। কবি যদি আরও একশ বছর আগে জন্মগ্রহণ করতেন, তা হলে অমন সুন্দর কবিতাটা লেখা হতো না। কারণ তখন তো ক্যালকাটাতে কোনো হোটেলই ছিল না।
কলকাতার বুকে তখন যা গজিয়ে উঠছে তার নাম ট্যাভার্ন। আমাদের উইলিয়ম ঘোষের ভাষায়, মদ বোঝাই করবার পেট্রোলপাম্প। হুগলি নদীর তীরে জাহাজ বেঁধে রেখে আনন্দপিয়াসী ঘর ছাড়া নাবিকের দল ছুটে আসত কলকাতার সরাইখানায়। জীবনের কত বিচিত্র অধ্যায়ই না সেদিন অভিনীত হতো এই রঙ্গমঞ্চে!-বোসদা বলেছিলেন।
এতদিন পরে, অন্য এক শতাব্দীর উন্মাদ কোলাহল সত্যিই যেন আমার কানে এসে বাজতে লাগল। সেদিনের তপ্ত কামার্ত নিঃশ্বাস যেন আজ রাত্রে আমার অসতর্ক দেহের উপর এসে পড়েছে। প্রথমে দেহটা কেমন যেন শিরশির করে উঠেছিল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে নিতে পেরেছিলাম। মনে পড়ে গিয়েছিল, যে বিশালপুরীর সবচেয়ে উপরতলার নির্জন ঘরে এই বিজন রাত্রে আমি জেগে রয়েছি এবং সেখানে আমি আরও অনেক রাত্রি যাপন করব, সেখানেও ইতিহাসের কত অনধীত ধুলোয় মলিন হয়ে পায়ের তলায় পড়ে রয়েছে।
যে-বাড়িতে আমি প্রভাতের মিলন প্রতীক্ষা করছি, সোনার আলোর রথে চড়িয়ে রূপসী রাত্রিকে যে-বাড়ি থেকে বিদায় দিতে চাই, সেটি আজকের নয়। এই শতাব্দীরও নয়।
কোনো কিছুই স্থায়ী হয় না, এই আজব নগরে—বোসদা বলেছিলেন। জীবন? সেও স্থায়ী নয়। অমন যে জবরদস্ত চার্নক সায়েব, তিনিও দুবছরের মধ্যে কলকাতার এই নোনা মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। তাঁকে তাড়াতাড়ি কবরের গর্ভে পুরে, তরে যেন শান্তি পেয়েছিল কলকাতা।
গতকাল সত্যসুন্দরদা বলেছিলেন, খ্যাতি? সেও এখানে পদ্মপত্রে জলের মতোই দীর্ঘস্থায়ী। গতকাল যিনি রাজা ছিলেন, শাজাহান হোটেলের সব চেয়ে দামী ঘরে রাত্রিযাপন করেছিলেন, আজ তিনি কুকির হয়ে কলকাতার পথে আশ্রয় নিয়েছেন। এই শহরের জীবন, যৌবন এবং অন্য সবই যেন ক্ষণস্থায়ী। মহাকালকে চোখ রাঙিয়ে, কলকাতার মাটিতে কোনো কিছুই দাঁড়িয়ে থাকতে সাহস করে না।
এরই মধ্যে অবিশ্বাস্য দম্ভে শাজাহান হোটেল দাঁড়িয়ে রয়েছে। বোসদা বলেছিলেন, বহু রাত্রির বহু দুঃখ, শোক, আনন্দ, উৎসব, কামনা, লোভ, গ্রহণ ও ত্যাগের ইতিহাস বুকের মধ্যে জমিয়ে রেখে আজও সে বেঁচে রয়েছে। কিন্তু সময়কে এমনভাবে অবজ্ঞা করে যে সে এতদিন টিকে থাকবে, তা সিম্পসন সায়েবও ভাবতে পারেননি।
সেন্ট জন্স চার্চের কবরখানা থেকে উঠে পড়ে, আজ রাত্রে বৃষ্টির সুযোগ নিয়ে দারোয়ানকে ফাঁকি দিয়ে সিম্পসন সায়েব যদি তাঁর প্রিয় শাজাহান হোটেলের সামনে এসে দাঁড়ান, তবে তিনি অবাক হয়ে যাবেন। তার কীর্তির রথ তাকে বহু পিছনে ফেলে রেখে কলকাতার রাজপথ ধরে এগিয়ে চলেছে। বিস্ময়ে রুদ্ধবা হবেন সিম্পসন সায়েব। অনেক দিন আগে লোকে তাকে পাগল বলেছিল। জিজ্ঞাসা করেছিল, আজকাল সারাক্ষণ কি তুমি মদের নেশায় রয়েছ?
সিম্পসন রাগ করে বলেছিলেন, আমি টি-টোটালার—আমি মদ স্পর্শ করি না।
তা হলে কি লাস্যময়ী প্রাচ্যের অহিফেনের আশীর্বাদে রঙিন স্বপ্ন দেখছ? তারা প্রশ্ন করেছিল।
স্বপ্ন নয়, প্ল্যান করছি। ব্যবসার বুদ্ধি। আকাশে ফোর্ট উইলিয়ম তৈরি করার প্ল্যান!
তা কেন? এই ফোর্ট উইলিয়মের পাশেই, মাটির বুকে একটা হোটেলের প্ল্যান করছি। কলকাতা ভারতবর্ষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করবে। ফলে অনেককে এখানে আসতে হবে। মাথা গুঁজবার ঠাই-এর জন্যে তারা ট্যাকের কড়ি খসাতে দ্বিধা করবে না। তাদের জন্যে আমি এমন এক হোটেল তৈরি করব, যা দেখে শুধু তোমরা নও, তোমাদের সন এবং গ্র্যান্ডসনরাও এই সিম্পসনকে ধন্যবাদ দেবে। আমার কোনো স্ট্যাচু থাকবে না, কিন্তু শাজাহান হোটেলের প্রতিটি ব্রেকফাস্ট, প্রতিটি লাঞ্চ এবং প্রতিটি ডিনারের মধ্যে আমি বেঁচে থাকব।
সিম্পসন সায়েব সেদিন সন এবং গ্র্যান্ডসনকে ডিঙিয়ে ভবিষ্যতের আরও গভীরে উঁকি মারতে সাহস করেননি। আজ রাত্রে সেন্ট জম্স চার্চের ফাদারদের সন্ধানী চোখকে ফাঁকি দিয়ে সিম্পসন সায়েব যদি পালিয়ে আসতে পারেন, তাহলে তার হোটেলে যাদের দেখতে পাবেন, তারা তাঁর পরিচিত বন্ধুদের গ্র্যান্ডসন নয়, গ্র্যান্ডসনের গ্র্যান্ডসনও নয়। গ্রেট, গ্রেট, গ্রেট—যতগুলো ইচ্ছে গ্রেট বসিয়ে দিয়ে, আমাদের এই ছাদে এসে তিনি দাঁড়াতে পারেন।
