সরাবজি আবার গিয়ে বসেছে। সিনথিয়ার পাশে বসে লেমনেড খেতে খেতে সে খদ্দের-এর আবির্ভাব কামনা করেছে। আজও আশ্চর্য সৌভাগ্য। গেলাসে এক চুমুক দেবার পরেই আগন্তুক এসে গিয়েছেন। পান-সঙ্গিনী হিসেবে সিনথিয়াকেই তিনি বেছে নিয়েছেন। সরাবজি গেলাসটা ছেড়েই উঠে আসছিল। সিনথিয়া বললে, মুখের জিনিসটা ফেলে দিও না। ওটা শেষ করে চলে যাও।
পরের দিনসরাবজি আবার সিনথিয়ার কাছে গিয়েছে। রিয়েলি লাবি চ্যাপ! সিনথিয়া বলেছে। কাল কী হল জানো? খদ্দেরকে নিয়ে ট্যাক্সিতে বেরিয়ে পড়েছিলাম। এক ঘণ্টার মধ্যে ফিরে এলাম, তার ট্রেন ধরবার তাগিদ ছিল। ফিরে এসে আফসোস হল, আর একবার গিয়ে বসা যেত। কিন্তু তোমাকে ছেড়ে দিয়ে যা ভুলই করেছিলাম। একাই ঢুকতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু ম্যানেজার সাহস করলে না। বললে, আবগারি দারোগারা প্রায়ই আসছে-গোলমাল পাকাবে। তাছাড়া তোমার তো এক রাউন্ড হয়েও গেল—অন্য বোনদের করে খাবার সুযোগ দাও।
সিনথিয়া নিজে থেকেই সরাবজিকে কিছু বেশি পয়সা দিয়েছে। বলেছে–তুমি অত ল্যাদাড়ু কেন? টেবিল ছেড়ে চলে যাবার আগে খদ্দেরের কাছে বকশিশ চাইবে। আমিও তখন বলব, আমার লোককে কিছু দিয়ে দিন। আমরা তো ভদ্রঘরের মেয়ে বাবা-মাকে লুকিয়ে এসেছি। পয়সা না পেলে ও বাড়িতে গিয়ে বলে দেবে, আমি লজ্জায় মুখ দেখাতে পারব না।
সরাবজি তবু পয়সা চাইতে পারেনি। চুপচাপ বসে থেকে সে বার-এর রূপ দেখেছে। মালিকের সঙ্গে পরিচয় করেছে। দেখেছে রাত্রের অন্ধকারে পুলিসের লোকেরা মাঝে মাঝে বার-এ আসে। হাফেসজি ছোটাছুটি আরম্ভ করে দেন। আদর আপ্যায়ন করেন। কোনো ড্রিঙ্ক করবেন কিনা জিজ্ঞাসা করেন। তারপর পুলিস খাতা চায়-বার ইনস্পেকশন বুক। ইংরিজিতে হুড়হুড় করে পুলিস অফিসার লিখে দেন–Inspected the bar at ll p.m. Mr Hafesji was in personal uttendance. Place full of customers. All ladies had escorts Nothing unusual to report.
কথা থামিয়ে হবস এবার একবার আমার মুখের দিকে তাকালেন। বললেন, আজও প্রতি রাত্রে কলকাতার বারগুলোর খাতায় ওই একই মন্তব্য লেখা হচ্ছে।
হবস বললেন, কয়েকদিন পরেই সিনথিয়ার পুরনো সঙ্গী ফিরে এসেছিল। সিনথিয়া কিছুতেই নতুন এসকর্টকে ছাড়তে চায়নি। বলেছিল, এমন পয়মন্ত ছেলেকে আমি কিছুতেই ছাড় না।
কিন্তু ম্যাডান রাজি হয়নি। বলেছে, আমি অন্যায় করতে পারব না। ওর কাজ আমি নিলে ভগবান অসন্তুষ্ট হবেন।
ভগবান এবার বোধহয় একটু মুখ তুলে তাকালেন! সিনথিয়ার সঙ্গী হাফেসজির বার-এ চাকরি পেয়ে গেল। ম্যাডান নিজেকে ধন্য মনে করেছে। সকালে যখন বার খোলে তখন কোনোই কাজ থাকে না। হাফেসজির বার খালি পড়ে থাকে। দুএকজন যদি বা আসে তারা এক-আধ পেগ টেনেই পালায়। আবার দুপুরে একদল আসে। মফস্সলের লোক। সন্ধ্যার অন্ধকারে সুন্দরী কলকাতার সান্নিধ্যসুখ উপভোগের সময় নেই তাদের। তারপর রাত্রি। হাফেসজি নিজে এসে কাউন্টারে বসেন। বার-এর রঙ এবং রূপ একেবারে পরিবর্তিত হয়।
মিস্টার হবস এবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার দেরি করিয়ে দিচ্ছি না তো?
বললাম, মোটেইনা। সরাবজিকে চেনবার এমন সুযোগ আপনি না থাকলে কোনোদিন পেতাম না।
হবস মাথা নাড়লেন।আমি নিজেই ওকে বুঝতে পারলাম না। আজ এখানে তাকে না দেখলে হয়তো সরাবজি আমার কাছে আরও পাঁচটা লোকের একটা হয়ে থাকত। কিন্তু এখন সে আমারই কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে।
আমি বললাম, সরাবজিকে আপনি আমার কাছে গল্পের নায়কের মতো করে তুলছেন।
হবস বললেন, অবজ্ঞা কোরো না, তোমাদের এই হোটেলের প্রতিটি ইটের মধ্যে এক একটা উপন্যাস লুকিয়ে রয়েছে।
হবস এবার একটু থামলেন। তারপর আবার শুরু করলেন। বুড়ো বয়সে বকবক করা মানুষের স্বভাব হয়ে দাঁড়ায়। আর চিন্তার শক্তি যখন উবে যায় তখন কোটেশন দেবার রোগে ধরে। আমারও একটা কোটেশন দিতে ইচ্ছে করছে। তোমাদের হোটেলেই স্যাটা আমাকে বলেছিলেন, a bar is a bank where you deposit your money and lose it; your time and lose it; your character and lose it; your self-control and lose ir; your own soul and lose it.
সবই খরচের খাতায়। এই পচা ব্যাঙ্কে তোমার টাকা, সময়, চরিত্র, সন্তানের সুখশান্তি এবং আত্মাকে গচ্ছিত রেখে খোয়াতে হয়। কিন্তু একজন ফুলে ওঠে। সে হাফেসজি। অন্যের খরচ-করা পয়সা হাফেজির ব্যাঙ্কে গিয়ে জমা পড়ে।
ম্যাডান যে কবে সরাবজি হয়ে গিয়েছে খবর পাইনি অনেকদিন ওর সঙ্গে দেখাও হয়নি। তারপর কয়েক বছর পরে হঠাৎ ধর্মতলার মোড়ে ওর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল আমাকে দেখেই সে ছুটে এল। আমার হাত দুটো জড়িয়ে ধরল। বললে, আমাকে মনে পড়ছে? আপনার দয়াতে সেবার চাকরিটা রক্ষে হয়েছিল।
আমি হাফেসজির দোকান ছেড়ে দিয়েছি।
সে কি? ঝগড়া হল নাকি?
না, ঈশ্বর মুখ তুলে তাকিয়েছেন! আমি নিজেই একটা দোকান করেছি।
বার? সে তো অনেক পয়সা লাগে।
ঈশ্বর যাকে দেখেন তার তো কিছুই প্রয়োজন হয় না। ধর্মতলায় একটা বার পেয়ে গেলাম যে মালিক সে অসুখে ভুগছে। তাকে বিলেত চলে যেতে হল। তাই আমাকে পার্টনার করে নিয়েছে। আমি দেখাশোনা করব, তাকে লাভের ভাগ দেব।
জোর করে সে আমাকে বার-এ ধরে নিয়ে গিয়েছে। সমস্ত দেখিয়ে বলেছে, অনেক শান্ত দোকান। ওখানকার মতো নয়। আমি দেখেছি অনেকে বসে ড্রিঙ্ক করছে কিন্তু হৈ হৈ হট্টগোল নেই।
