তাই ছোকরা ম্যাডান, অর্থাৎ সরাবজির সঙ্গে পরিচয় হতে তাকে সিনথিয়ার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল। বললে, মাত্র এক সপ্তাহের কাজ কিন্তু। আমি ফিরে এলেই তোমাকে কেটে পড়তে হবে। তখন যেন গণ্ডগোল পাকিও না। দুএকজন আগে আমাদের লাইনে এই নোংরা চেষ্টা করেছে, মেয়েরা দুটো মিষ্টি কথা শুনিয়েছে, হয়তো একটা চি রেট দিয়েছে, তাতেই মাথা ঘুরে গিয়েছে। কিন্তু বাজারে ঠ্যাঙানি বলে একটা জিসি এখনও আছে। সামনের দুটো দাঁত যদি ঘুষি মেরে উড়িয়ে দিই তা হলে সেখানে আর দাঁত গজাবে না, মনে থাকে যেন।
ম্যাডান রাজি হয়ে গিয়েছিল এখন কদিন তো খেয়ে বাঁচা যাক। সিনথিয়ার সঙ্গে সেপ্রথম বার-এ ঢুকেছিল। প্রথমে একটু ভয় ভয় করেছিল। সিনথিয়া একটা পায়ের উপর আর একটা পা তুলে দিয়ে মুখ থেকে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলেছিল, দেখি, তুমি লাকি চ্যাপ কি না। হয়তো এখনি কাস্টমার পেয়ে যাব।
সরাবজির কেমন ভয় লাগছিল। এমন বেয়াড়া পরিবেশ জীবনে সে কখনও দেখেনি। সিগারেটের ধোঁয়ায় এমন অবস্থা যে, মনে হচ্ছে ঘরের মধ্যে কাঁচা ঘুটেতে কেউ আগুন দিয়েছে। দুরে গোটা তিনেক লোক বাজনা বাজাচ্ছে। মাঝে মাঝে তারা ইশারায় মেয়েদের ডাকছে-বসে বসে লেমনেড না গিলে এখানে এসে একটু নাচো গাও। আমাদের বার-এর সামর্থ্য নেই যে, আবার পয়সা দিয়ে নাচ গানের মেয়ে রাখবে। অথচ মিউজিক ও ডান্স লাইসেন্স রয়েছে। প্রতি বছর এক আঁচল পয়সা দিয়ে লাইসেন্স রিনিউ করতে হচ্ছে।
সরাবজি দেখেছিলেন, বার-এর মধ্যে শুধুই লেমনেড চলেছে। জোড়ে জোড়ে সিনথিয়া এবং তার মতো এসকর্টরাই বসে রয়েছে। ঘরের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সিনথিয়া বলেছে, রাত নটা পর্যন্ত এইভাবে চলবে, তারপর খরিদ্দাররা আসতে শুরু করবে। আজ আবার ভাল জায়গা পেলাম না। একটু দেরি করলেই ভাল জায়গাগুলো অন্য মেয়েরা নিয়ে নেয়। সেলারগুলো একটু কোণ চায়। কোণগুলো সব ভর্তি হলে তবে ওরা আমাদের দিকে আসবে। সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে সিনথিয়া বলেছে, আমার বাপু অত ধৈর্য নেই। সেই সন্ধে সাড়ে সাতটা থেকে আমি বসে থাকতে পারব না। আর, রহিমকে কিছু পয়সা দিলে হয়। তাও তো এমনিই মাসে এক টাকা দিতে হয়, আর কত দেব?
সরাবজির বোধহয় গলা শুকিয়ে আসছিল। সে আর একটু লেমনেড খেতেই সিনথিয়া হাতে একটা টোকা দিয়েছিল। হ্যালো ম্যান, তুমি কি আমাকে ডোবাবে নাকি? কতক্ষণ এখানে বসতে হবে ঠিক নেই, আর তুমি এরই মধ্যে অর্ধেক গেলাস সাবাড় করে দিয়েছ। যদি আবার লেমনেড কিনতে হয় তোমাকে পয়সা দিতে হবে বলে দিলাম। আমার পয়সা অত সস্তা নয়, কোথায় খদ্দের তার নেই ঠিক, অথচ খোলামকুচির মতো পয়সা ছড়িয়ে চলেছি।
সরাবজি আর কোনও কথা বলেনি। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে, সামনে গেলাসের মধ্যে কণাগুলো তখনও মুক্তির স্বাদ পেয়ে নেশাখোরের মতো নাচছে। সিগারেটের গন্ধে কাশি আসছে। ঘরের মধ্যে এবার দুজন সেলার এসে ঢুকল। বিরাট লম্বা-কড়িকাঠে মাথা ঠেকে যায়। সিনথিয়া চেয়ার ছেড়ে তাদের দিকে ছুটে গেল। কিন্তু তার ছিপে মাছ আটকালো না। সিনথিয়া ফিরে এসে একটু হাঁপাল, তারপর আবার সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়াটা সঙ্গীর মুখের উপর ছেড়ে দিল। সঙ্গীর তখন সেদিকে খেয়াল নেই। সে একমনে জলবিন্দুর রাজ্যে যে সঙ্গীত ও নৃত্য চলেছে তাই দেখছে।
সিনথিয়া বললে, ঠিক আছে, এখন আর একটু খেয়ে নাও। কাল থেকে বেরোবার আগে দুতিন গ্লাস জল খেয়ে আসবে। এখানে কতক্ষণ বসে থাকতে হবে তার ঠিক নেই। ভাগ্য ভাল থাকলে হয়তো একঘণ্টা পরেই পয়সা নিয়ে চলে যেতে পারবে।
আরও কথা হত। কিন্তু হঠাৎ সিনথিয়া ভয়ে জড়সড় হয়ে পড়ল। হ-এর অরণ্য উল্লাসের মুখে কে যেন ছিপি এঁটে দিল। বেয়ারা এসে সব মেয়েদের টেবিলের দিকে দ্রুত দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে লাগল, সবার সঙ্গী আছে তো? না হলে গভরমেন্টের লোক বিপদে ফেলবে, কী যে ওঁদের মর্জি-মাঝে মাঝে দেখতে আসেন কোনো মেয়ে একলা বসে আছে কি না।
সরাবজি শুনলে ম্যানেজার বলছে, দেখুন স্যার। সবার এসকর্ট রয়েছে। জেনুইন কাস্টমার।
ইনস্পেক্টর এবার ওদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। সিনথিয়া এসবে অভ্যস্ত। সে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে সরাবজির আঙুলগুলো নিয়ে খেলতে লাগল। তারা যেন গল্প করছিল এমন ভাব দেখাবার জন্যে বললে, আচ্ছা জন, তারপর কী হল?
সরাবজি ভয় পেয়ে গিয়েছে। সে নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধেই চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েছে। তাকে উঠে পড়তে দেখে ম্যানেজার অসন্তুষ্ট হলেন। ইনস্পেক্টর জিজ্ঞাসা করলেন, এঁকে সঙ্গে করে আপনি বার-এ এসেছেন?
সে বেচারা বুঝতে পারছিল না কী উত্তর দেবে! সিনথিয়া কিছু বলেও দেয়নি। সিনথিয়া এবার তার দিকে চোখ টিপলে। সেও কোনোরকমে মাথা নাড়ল।
ইনস্পেক্টর বোধহয় সব বুঝলেন। হেসে বললেন, একেবারে নতুন বুঝি?
ম্যানেজার বললেন, কী বলছেন স্যার, জেনুইন কাস্টমার। প্রায়ই আসে।
ম্যানেজারের কানের কাছে মুখ এনে ইনস্পেক্টর হ্যাঁ, লেমনেড খাবার এমন সুন্দর জায়গা তো কলকাতায় নেই।
তারপর খরিদ্দার এসে গিয়েছে। নিজের পয়সা নিয়ে সরাবজি চলে এসেছে। তারই শূন্য স্থানে এসে বসেছে হাফেসজি বার-এর নতুন অভ্যাগত।
পরের দিন সিনথিয়ার সঙ্গে আবার দেখা হয়েছে। সিনথিয়া বলেছে, তোমার পয় আছে। গতকালের লোকটা দিল্ খুলে ড্রিঙ্ক করিয়েছে, তারপরেও টাকাকড়ি নিয়ে ছোটলোকমি করেনি। মেহনত পুষিয়ে দিয়েছে। এমন খদ্দের রোজ পেলে আমাদের দুঃখের কিছুই থাকবে না।
