ম্যাডান বলেছে, আমি নাম পালটিয়ে নিয়েছি। শরাবের লাইনেই যখন থাকতে হবে তখন আমি সরাবজি।
আমি বললাম, কিন্তু শরাবের সঙ্গে নিজে কোনো সম্পর্ক না করলে চলবে কেন?
সরাবজি লজ্জায় জিভ কেটেছে। কী যে বলেন, আমার ঠোঁট জীবনে মদ স্পর্শ করেনি। হাজার হাজার পেগ মদ বোতল থেকে ঢেলে অন্য লোককে দিয়েছি, কিন্তু তার আস্বাদ কী আমি জানি না।
আবার দেখা হয়েছে। সরাবজি আমাকে তার বিয়েতে নেমন্তন্ন করেছে। বলেছে, আপনার জন্যেই তো সব। সেদিন যদি হাফেসজির দোকানে টিকতে না পারতাম, তাহলে আমার কিছুই হত না।সরাবজি বলছে, যাকে বিয়ে করেছি সে বেচারা একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিল—হাজার হোকমদের দোকানে কাজ করি।
সরাবজির বউকে প্রায়ই মার্কেটে দেখেছি। সত্যি লক্ষ্মী বউ। নিজে রেস্তোরাঁর কাঁচা বাজার করেন। অন্য কারুর হাতে বাজারের ভার দিলেই ঠকাবে। মাংসর দাম বেশি লেখাবে, ওজনে কম দেবে। আমি বলেছি, আপনি বাজার করেন?
মিসেস সরাবজি বলেছেন, আমি না দেখলে ও-বেচারাকে দেখবে কে? নিজে বাজার করি বলে জিনিসটা ভাল হয়, খদ্দেররা প্রশংসা করে, অথচ দাম কম লাগে।
আমি প্রশ্ন করেছি, আপনি কি দোকানেও স্বামীকে সাহায্য করেন?
মিসেস সরাবজি বলেছেন, ওইখানেই তো মুশকিল। ওখানে আমার যাওয়া সম্পূর্ণ বারণ। আমি একবার বলেছিলাম কিচেনের লোকদের সঙ্গে একটু কথা বলে আসব। কিন্তু উনি খুব অসন্তুষ্ট হলেন। আমি বাজার নিয়ে বাড়ি যাই মেনু ঠিক করে দিই। উনি সেখান থেকে মালপত্তর নিয়ে দোকানে চলে আসেন। যেদিন কাজে আটকে পড়েন, সেদিন কিচেনের মেটকে পাঠিয়ে দেন। কেউ না এলে আমি টেলিফোন করি, কিন্তু তবু দোকানে যাওয়ার হুকুম নেই। উনি বলেন, দুনিয়ার যেখানে খুশি যেতে পার, কিন্তু আমার বার-এ নয়।
আর আপনিও বিনা বাক্যব্যয়ে তা মেনে নিয়েছেন। আমি উত্তর দিলাম।
মিসেস সরাবজি বোধহয় একটু লজ্জা পেলেন কিন্তু আমার সঙ্গে তার স্বামীর কি সম্পর্ক তা জানেন, তাই ফিসফিস করে সলজ্জ হাসিতে মুখ ভরিয়ে বললেন, আমি প্রতিবাদ করেছিলাম। কিন্তু উনি বলেন, তোমার দেহেনাসন্তান আসবে। বার-এর বাতাস সেই অনাগত অতিথির ক্ষতি করতে পারে।
হবস এবার বোধহয় হাঁপিয়ে পড়লেন। বড় একটা নিঃশ্বাস নিয়ে বললেন, সরাবজির সন্তান হয়েছে খবর পেয়েছি। আরও খবর পেয়েছি সমস্ত দোকানটাই সে কিনে নিয়েছে। ওর অংশীদার আর বিদেশ থেকে ফিরবেন না, তাই সামান্য যা সঞ্চয় ছিল এবং স্ত্রীর গহনা বিক্রি করে দিয়ে সরাবজি বার ও রেস্তোরা কিনে নিলে।
আমার সঙ্গে বার-এ আবার দেখা হয়েছে। সরাবজি বলেছে এসব আপনার জন্যেই সম্ভব হয়েছে, এই বার আপনার নিজের বলেই জানবেন।
তখন সবেমাত্র সন্ধ্যা। সরাবজি বললে, আমার এই বার হাফেসজির বারের মতো নয়। আমি ভালো জিনিস দিই, জল মেশাই না। মেয়েদের ঢুকতে দিই না। তবুও শান্তি নেই।
প্রশ্ন করলাম, কেন?
সরাবজি বললে, আমার বার সাড়ে-দশটায় বন্ধ। কিন্তু বিকেল থেকে যারা বসে থাকে, তারা ক্রমশ গরম হয়ে উঠতে আরম্ভ করে। প্রথম পেগে স্বাস্থ্য, দ্বিতীয় পেগে আনন্দ, তৃতীয় পেগে লজ্জা এবং চতুর্থ পেগ থেকে পাগলামো, তখন আমার ভালো লাগে না। রোজ কিছু না কিছু গোলমাল লেগেই থাকে।
সরাবজি বললে, আমার বার-এর যথেষ্ট সুনাম আছে। যারা শান্ত পরিবেশে শান্তিতে ড্রিঙ্ক করতে চায় তারাই আসে। তবু মাঝে মাঝে গোলমাল শুরু হয়ে যায়।
নিজের চোখেই তার নমুনা দেখলাম। বেয়ারা এসে বললে, কেবিনে এক সায়েব ডাকছেন।
সরাবজি উঠে পড়ল। ব্যাপারটা দেখবার জন্যে আমিও ওর পিছু পিছু গেলাম। ইন্ডিয়ান সায়েব ঠোঁট বেঁকিয়ে বললেন, নটা গুণ্ডা ড্রিঙ্ক-পানি ডালটা।
জিভ কেটে সরাবজি বললে, কী বলছেন আপনি? আমার বার-এ ও-সব জোচ্চুরি চলে না। বলেন তো বোতল পাঠিয়ে দিচ্ছি—তার থেকে আপনার সামনে ঢেলে দেবে।
খরিদ্দার বললেন, পাইব পেগ আলরেডি ড্রিঙ্ক করেছি, তবু মনে হচ্ছে যেন স্বামী বিবেকানন্দের চেলা।
কেবিন থেকে বেরিয়ে বার-এর কাউন্টারে আসতে আসতে সরাবজি বললে, আমি ব্যাপারটা বুঝতে পারছি। এমন কেস রোজই দুএকটা এসে পড়ে, নতুন লোক বুঝতে পারে না।
একটা হুইস্কির বোতল হাতে করে কেবিনে এসে সরাবজি বললে, আমরা ডাইরেক্ট মাল নিয়ে আসি। যদি বলেন, সামনে সীল খুলে সার্ভ করছি।
আমি বাইরে দাঁড়িয়েছিলাম। শুনলাম, এবার ভদ্রলোক আসল প্রসঙ্গ অবতারণা করলেন।গার্ল চাই।
হবস এবার হেসে ফেললেন। বললেন, ভাঙা ভাঙা ইংরিজিতে সরাবজি যা উত্তর দিয়েছিল তা কোনো সাহিত্যিকের কানে গেলে বিশ্বজোড়া সুনাম অর্জন করত। সরাবজির হাত ধরে ভদ্রলোক বললেন, প্লিজ…প্লেজার গার্ল।
সরাবজিও তার হাতটা চেপে ধরল। তারপর তাকে বোঝাতে লাগল, গার্লস হিয়ার নো গুড়। হাউস গার্ল, গার্লস ইন ইয়োর ফ্যামিলি ফার ফার বেটার।
হোটেল গার্লস টেক অল মানি। সরাবজি নিজের ভাব প্রকাশের জন্যে তারপর যেন অভিনয় শুরু করলে। তুলনামূলক সমালোচনা করতে গিয়ে জানালে, স্ট্রিট গার্লস ডোন্ট লাভ ইউ, দে লাভ ইওর মানিব্যাগ। হাউস গার্ল-সিস্টার ইইওর হাউস-লাভ ইউ। ইফ সি হিয়ারস, সি উইল উইপ-এবার সরাবজি কেঁদে কেঁদে অভিনয় করতে লাগল। ভদ্রলোক বোধহয় যেন একটু লজ্জা পেলেন। কোনোরকমে মদের বিল চুকিয়ে, একটা পয়সাও টিপস না দিয়ে গটগট করে বেরিয়ে গেলেন।
