ম্যাডানের তখন কত বয়স-চোদ্দ বছরের বেশি নয় বোধহয়। বেচারা কাঁদতে কাঁদতে এসে আমার হাত চেপে ধরেছিল। অত কম বয়সের ছেলেদের মদের দোকানে চাকরি দেবার নিয়ম নেই, রিপোর্ট করেছে কে, এবার চাকরি গেল। আমার দুঃখ হয়েছিল। অনেক চেষ্টা করে সে রিপোর্ট আমি চাপা দিতে পেরেছিলাম। তখন থেকেই ওর সঙ্গে আমার আলাপ! আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। পার্সিদের মধ্যে এমন দারিদ্র তো নেই। ওদের এত ট্রাস্ট আছে, এত দান নেবার সুযোগ আছে যে, কোনো কমবয়সী ছেলের পথে ঘোরবার প্রয়োজন নেই।
তাই মনে একটু সন্দেহও জেগেছিল বিপদ মিটলে একদিন হাফেসজির দোকানে গিয়েছিলাম। সেদিন বার-এ তেমন ভিড় ছিল না। একটা ছোটো পেগের অর্ডার দিয়ে বসলাম। সরাবজি আমাকে দেখেই ছুটে এল। আস্তে আস্তে বললে, আপনি এইভাবে না দেখলে এতক্ষণ আমাকে চৌরঙ্গীর পথে পথে ঘুরতে হত।
আমি বললাম, তুমি এত কম বয়সে ছোটো কাজ করছ কেন?
সরাবজি ভাঙা ভাঙা ইংরিজীতে বলেছিল, আমি অরফ্যান বয়, অরফ্যান স্কুলে মানুষ হয়েছি। আমার মাথায় বুদ্ধি নেই, ওঁরা অত চেষ্টা করলেন, তবু পড়াশোনা হল না। ওঁরা বলেছিলেন, কোন একজন ইন্ডিয়ান গ্রামারিয়ান প্রথম জীবনে একেবারে জড়বুদ্ধি ছিলেন, তারপর চেষ্টা করে তিনি সব শিখেছিলেন। আমিও ট্রাই করেছিলাম। কিন্তু হল না। আমার মাথায় ঢুকল না। তাই শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে এসেছি।
আমি বলেছিলাম, কোনো ট্রাস্টের সাহায্য নিতে পারো। সরাবজি রাজি হয়নি। না স্যর, জন্ম থেকে বাবা মা-ই যাকে সাহায্য করতে রাজি হল না, সে কী করে অন্যের কাছে সাহায্য চাইবে? সেটা ভাল দেখায় না। গড় নিশ্চয়ই চান, আমিই নিজেকে সাহায্য করি। আমি আপনাদের আশীর্বাদে কেবল সেই চেষ্টাই করব।
হবস সায়েব আবার একটু থামলেন। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, স্বাধীন ভারতবর্ষে তোমরা তো মেয়েদের সব বিষয়ে সমান অধিকার দিয়েছ, তাই না?
আমি বললাম, আজ্ঞে হ্যাঁ। সায়েব হাসতে লাগলেন। এবার তাহলে একটা ছেলেঠকানো প্রশ্ন করি। বল দেখি, কোন ক্ষেত্রে মেয়েদের স্বাধীনতা এখনও স্বীকৃত হয়নি?
আমি তার মুখের দিকে তাকালাম। আমার পিঠে একটা হাত রেখে হবস বললেন, সরাবজিকে জিজ্ঞাসা করো, সে এখনি বলে দেবে, নারী-স্বাধীনতার বিরোধী দলের শেষ দুর্গ হল হোটেল। বার লাইসেন্সে লেখা আছে কোনো নিঃসঙ্গ মহিলাকে বার-এ ঢুকতে দেওয়া হবে না। মেয়েরা তোমাদের দেশে একা একা যেখানে খুশি যেতে পারে, এভারেস্টের চূড়ায় উঠলেও কেউ আপত্তি করবে না। কিন্তু আজও বার-এ কোনো মহিলার একলা প্রবেশ নিষেধ। সঙ্গে পুরুষ সঙ্গী থাকলে অবশ্য কোনো আপত্তি নেই। যতক্ষণ ইচ্ছে যে কোনো ড্রিঙ্কের আনন্দ উপভোগ করা চলতে পারে।
মিস্টার হবস হাসতে লাগলেন। বললেন, সংবিধানের ব্যক্তি-স্বাধীনতার বিরোধী এই নিয়ম কোনো মহিলা একবার আদালতে যাচাই করে দেখলে পারেন। তবে নিয়মটা অনেকদিন থেকেই চলছে। এবং যারা আইন করেছিলেন, তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল অন্য। নিঃসঙ্গ মহিলারা বার-এ আসতে চান অন্য উদ্দেশ্যে। আর আজও তারা এসে থাকেন। খারাপ বারগুলোতে ঢুকলেই বোঝা যায়। সেকেন্ডহ্যান্ড দেহের পসরা সাজিয়ে দেশ বিদেশের মেয়েরা বড়শিতে রুই কাতলা ধরবার জন্যে প্রতীক্ষা করছে।
মিস্টার হবস হাসলেন। নিয়মটা বোধহয় খারাপ নয়। কিছু পুরুষ শুধু এই আইনের জোরেই করে খাচ্ছে। মেয়ে ধরবার জন্যে ফর্সা জামা এবং ফুল প্যান্ট পরে গরিব অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ছেলেরা দাঁড়িয়ে থাকে। হ্যালো ডলি, আজ কিন্তু আমাকে নিয়ে যেতে হবে। যত রাত হোক তোমার জন্যে আমি বসে থাকব।
ডলি বলে, পিটারের মাকে কথা দিয়েছি। পিটারকে এসকর্ট হিসেবে নিয়ে যাব। একটা টাকা দিলেই হবে।
আমি বারো আনায় রাজি আছি। আমার পয়সার দরকার। ছোকরা বলে।
তোমরা যে চিংড়িমাছের মতো হয়ে গেলে দেখছি, তোমাদের দাম মেয়েমানুষের থেকেও কম। বারো আনা পয়সার জন্যে ওই গুণ্ডা রাজত্বে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমার সঙ্গে বসে থাকতে রাজি আছ?
আবগারি আইনকে ফাঁকি দেবার জন্যে এই এসকর্ট বা সঙ্গীদের না হলে অনেক বার-এ ঢোকা যায় না আর এইভাবেই ম্যাডান অর্থাৎ সরাবজি কলকাতায় প্রথম অন্ন সংস্থান করেছিল।
হবস বললেন, সরাবজির মুখেই শুনেছি, এক ছোকরা অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান তাকে এই সুযোগ করে দিয়েছিল। বয়স তার কম—আইন অনুযায়ী এই বয়সের সঙ্গী নিয়েও বার-এ ঢোকা যায় না কিন্তু হাফেসজি বার-এর মালিক মিস্টার হাফেসজি আইন সম্বন্ধে অত খুঁতখুঁতে ছিলেন না। তিনি এসকর্টের বয়স নিয়ে মাথা ঘামাতেন না। কম বয়সের এসকর্টরা দামে সস্তা হয়, এবং বেচারা মেয়েদের পক্ষে খরচের ভার কিছুটা কমে যায়, তা তিনি বুঝতেন। তিনি শুধু বলতেন, তোমরা ওই অসভ্যতাটুকু কোরো না-একটা লেমনেড নিয়ে দুজনে ভাগ করে খেও না। এতে হোটেলের সুনামের ক্ষতি হয়, অন্তত দুটো বোতল সামনে রাখো।
সরাবজি যখন কলকাতার পথে পথে দুমুঠো অন্নের জন্যে ঘুরছে তখন ধর্মতলা স্ট্রিটের উপর এক ছোকরার সঙ্গে আলাপ হয়। সে বদলি খুঁজছিল। সিনথিয়াকে সে-ই রোজ বার-এ নিয়ে যায়। তার সঙ্গে বসে থাকে; তারপর চারে খদ্দের আসে, দর-দাম ঠিক হয়ে যায়, তখন নতুন আগন্তুককে সিনথিয়ার পাশে বসতে দিয়ে সে কেটে পড়ে। সঙ্গীকে রোজ আসতে হয়, অথচ তার কয়েকদিনের জন্যে খুগপুরে যাওয়া দরকার। রেলের কারখানায় জানাশোনা একজন ভদ্রলোক আছেন—তার কাছে চাকরির তদ্বির করতে হবে।
