পি-আর-ও বেচারা তখন চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন। অতিথিরা কাজ শেষ করবার জন্য ঢকঢক করে আরও কয়েকটা পেগ সেরে ফেললেন, তারপর টলতে টলতে বেরিয়ে গেলেন। কাচের টুকরো পরিষ্কার করতে গিয়ে বেয়ারারা দেখল, এক কোণে টেবিলের তলায় কে একজন সায়েব ফ্ল্যাট হয়ে শুয়ে রয়েছেন। কাছে গিয়ে দেখলাম, ফোকলা চ্যাটার্জি বেসামাল অবস্থায় পড়ে রয়েছেন। কোনোরকমে উঠে বেরিয়ে যাবার সময় বললেন, খুবই সাবধানী ব্যাটসম্যান। কিন্তু ভাগনের বিয়েতে ইচ্ছে করেই বোল্ড আউট হলাম।
এর নামই ককটেল পার্টি। ঝলমলে সন্ধ্যায় পুত্র এবং পুত্রবধুকে নিজের দু-দিকে নিয়ে মিসেস পাকড়াশী যখন বার-এ ঢুকেছিলেন, তখন সবটা কল্পনা করে নিতে পারিনি।
অনিন্দ্য পাকড়াশী আজ একেবারে অন্য মানুষ হয়ে গিয়েছিলেন আমাকে দেখে একবার একটু থেমেছিলেন, হয়তো দু-একটা কথা বলবার ইচ্ছে ছিল কিন্তু মিসেস পাকড়াশী বললেন, খোকা, এখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাজে গল্প করবার সময় নয়, গেস্টরা তোমারই জন্যে অপেক্ষা করছেন।
অনিন্দ্যর সঙ্গে আর কথা বলবার সুযোগ পাইনি। বলবার ইচ্ছেও ছিল না। তবু বার বার হাল্কা হাসির ফোয়ারার মধ্যে, রঙিন মদের সোনালি নেশার ভিতর দিয়ে একটা বিষণ্ণ মহিলার মুখ বার বার অহেতুকভাবে আমার চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল।
মিসেস পাকড়াশীর পার্টিতে আমার হয়তো কোনো লাভ হয়নি। কিন্তু হোটেলের হয়েছিল—একটা ককটেল থেকে তারা দশ হাজার টাকার চেক পেয়েছিলেন। আবগারি ইন্সপেক্টর হিসেব পরীক্ষা করতে এসে বললেন, চমৎকার, এই রকম ককটেল যত হয় তত আপনাদেরও লাভ, গভর্নমেন্টেরও লাভ।
বেয়ারাদেরও লাভ। সরাবজি হাসতে হাসতে বললেন।
দুনিয়াতে সবারই লাভ, ক্ষতি কেবল লিভারের, গলার আওয়াজে মুখ ফিরিয়ে দেখি হবস সায়েব!
হবসের সঙ্গে অনেক দিন দেখা হয়নি। তাকে আমাদের মধ্যে পেয়ে খুব আনন্দ হল। মাথার টুপিটা খুলতে খুলতে সায়েব বললেন, মার্কোর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলাম। এক বন্ধুর জন্যে ঘর চাই। কিন্তু ম্যানেজারকে পেলাম না।
এর জন্যে ম্যানেজারকে কী প্রয়োজন? আমরা তো রয়েছি।অভিমানভরা কণ্ঠে আমি অভিযোগ জানালাম। হবস বললেন তা হলে ব্যবস্থা করে দাও।
ওঁকে নিয়ে বার থেকে বেরোবার পথে সরাবজির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। সরাবজিকে দেখেই মিস্টার হবস যেন একটু অবাক হয়ে গেলেন। বললেন, তুমি! তুমি এখানে?
সরাবজি ম্লান হাসলেন। সবই তার ইচ্ছা। আমরা কী করতে পারি? সরাবজির সামনে হবস দাঁড়িয়ে পড়লেন। কোনো ব্যক্তিগত কথা থাকতে পারে আন্দাজ করে আমি এগিয়ে গেলাম। কাউন্টারে খাতায় হবস সায়েবের বন্ধুর কোনো জায়গা করে দেওয়া যায় কি না দেখতে লাগলাম। তিনি এসে আমার পিঠে হাত রেখে বললেন, কলকাতার হোটেলজীবনকে আমি যতদূর জানি তাতে এইটুকু বলতে পারি, রিসেপশনিস্ট ইচ্ছে করলে সব সময় জায়গা করে দিতে পারে।
বোসদা কাউন্টারে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বললেন, একদিন সত্যিই তা ছিল। কিন্তু ফরেন ট্যুরিস্ট, বিজনেস-টুর এবং কনফারেন্সের দৌলতে সে-ক্ষমতা কোথায় উবে গিয়েছে। ম্যানেজার নিজেই সব সময় বুকিং-এর উপর শ্যেন দৃষ্টি রেখেছেন।
হবস সায়েবের বন্ধুর অবশ্য কোনো অসুবিধা হল না। সেদিন সৌভাগ্যক্রমে জায়গা খালি ছিল, পাওয়া গেল।
হবস প্রশ্ন করলেন, সরাবজি কবে থেকে এখানে এলেন?
এই কিছুদিন। আমি বললাম।
ওঁর মেয়ের কী খবর?
আমি কিছুই জানি না। সুতরাং বোকার মতো ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। হবস এবার প্রশ্ন করলেন, মার্কো কোথায়?
বেরিয়ে গিয়েছেন।
একটু হেসে তিনি বললেন, তোমাদের এই হোটেলটা আমি যেন এক্স-রে চোখ দিয়ে দেখতে পাই। বোধহয় তিনি কর্পোরেশন স্ট্রিটে মেকলে পান করতে গিয়েছেন। লর্ড মেকলের নামে যে কোনো পানীয় আছে তা জানতাম না। সাহেব হেসে বললেন, পেনাল কোডের রচয়িতা ঐতিহাসিক মেকলে বেঁচে থাকলে আঁতকে উঠতেন। বাঙালিরা তার সর্বনাশ করেছে। দেশি মা কালী-মার্কা ধেনোর নাম দিয়েছে মেকলে। তোমাদের অনেক আচ্ছা আচ্ছা কাপ্তেন, ডিম্পল স্কচ, জন হেগ, হোয়াইট হর্স ফেলে মেকলে খেতে যান।
হবস এবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, কিছুক্ষণ দেখেই যাই। মার্কোর সঙ্গে একটু প্রয়োজনও ছিল।
আমরা দুজনে লাউঞ্জে বসলাম। বোসদা এগিয়ে এসে বললেন, ওঁকে কিছু অফার করো। চা বা কফি পাঠিয়ে দেব? আমরা সামান্য হোটেল কর্মচারী কীই বা ওঁকে দিতে পারি। পৃথিবীর খুব কম লোকেই হোটেল সম্বন্ধে ওঁর থেকে বেশি জানে।
হবস বললেন, বেশ, কফি খাওয়াও। উনিশ শতকের অষ্টম দশক থেকে তোমাদের হোটেলে কতবারই তো খেয়ে গেলাম, আর একবার খাওয়া যাক।
বোসদা আমাদের জন্যে কফির অর্ডার দিয়ে আবার কাজে বসে গেলেন। হবসের মাথাটা সামনের দিকে একটু ঝুঁকে পড়েছে। বলছেন, ইউরোপের সেরা কোনো ঔপন্যাসিক যদি এখানে এসে কয়েক বছর থাকতেন, তা হলে হয়তো এক আশ্চর্য উপন্যাস লিখতে পারতেন। ওয়েস্টের বহু হোটেল আমি দেখেছি কিন্তু ইস্টের সঙ্গে তার তুলনা হয় না। সিম্পসন, সিলভারটন, হোরাবিন থেকে আরম্ভ করে তোমাদের মার্কোপোলো, জুনো এমনকি এই সরাবজি—সব যেন বিশাল ঐতিহাসিক উপন্যাসের এক-একটা চরিত্র।
হাতে সময় ছিল। সায়েবকেও সময় কাটাতে হবে তাই বোধহয় গল্প জমে উঠল। কফির কাপে চুমুক দিয়ে তিনি বললেন, নরি সরাবজি যে কোনোদিন তোমাদের হোটেলে এসে চাকরি নেবে তা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। ওকে আমি সেই প্রথম মহাযুদ্ধের আগে থেকে দেখছি। তখন হাফেসজির দোকানে ছোকরা ড্রিঙ্ক সার্ভ করত। আমার মনে আছে, আমাদের এক বন্ধু একবার একসাইজ ডিপার্টমেন্টে রিপোর্ট করেছিল। ওর আসল নাম সরাবজিও নয়—বোধহয় ম্যাডান না ওই ধরনের কি একটা! সরাবের লাইনে থেকে ছোকরা সরাবজি হয়ে গেল।
