সরাবজি গম্ভীর হয়ে গেলেন। নিজের মনেই বোতলগুলো নাড়াচাড়া করতে লাগলেন। তারপর আমাকে বার-এ একলা রেখে সেলারে চলে গেলেন।
মাটির গর্ভে দেড় শো বছরের প্রাচীন একটা অন্ধকার ঘর আছে, সেখানে সাধারণের যাওয়া নিষেধ। সেই অন্ধকার সেলারের কোণে এমন বোতলও আছে যা শাজাহানের প্রতিষ্ঠাতা সিম্পসন সায়েব নিজের হাতে ঢুকিয়ে রেখে গিয়েছিলেন। তারপর শাজাহানের বুকের ওপর দিয়ে ইতিহাসের চাকাকতবারই তে গড়িয়ে গিয়েছে। সোলাটুপি এবং খাকি প্যান্ট পরে তরুণ ইংরেজ সৈন্যদক্ষ চঁদপাল ঘাটে জাহাজ থেকে নেমে হিন্দুস্থানের প্রথম রাত্রি শাজাহান হোটেলে কাটিয়েছেন। সেদিন সেই নিঃসঙ্গ সৈনিককে সঙ্গ দেওয়ার জন্যে এই কুঠুরি থেকেই স্কচ বোতল বেরিয়ে এসেছে। গঙ্গানদীতে পাল-তোলা জাহাজের বদলে যেদিন কলের জাহাজ দেখা গিয়েছিল, সেদিনও শাজাহানের সেলার থেকে পাঠানো পানীয়তেই উৎসব-রাত্রি মুখর হয়ে উঠেছিল। তারপর খাকি টুপি এবং হাফ প্যান্টপরা একদল লোক হাতে নকশা নিয়ে কলকাতায় হাজির হয়েছিলেন। তাদের দলপতি দাড়িওয়ালা ম্যাকডোনাল্ড স্টিফেনস স্পেনসেসের বড়াপোচখানায় উঠেছিলেন। আর দলের কয়েকজন আশ্রয় নিয়েছিলেন আমাদের এই শাজাহানে। বার-এ বসে বসে তারা দিনরাত কাগজে কি সবনকশা আঁকতেন। বারম্যানরা বলত, পাগলা সায়েবের দল এসেছে —এরা কলের গাড়ি আনবে ব্লাইত থেকে। তামাম হিন্দুস্থানের পায়ে এরা বেড়ি পরিয়ে দেবে-লোহার রাস্তা তৈরি করবে, এবং একদিন তার উপর দিয়ে বিরাট বিরাট দৈত্য ছোটাছুটি করবে। দৈত্যদের লড়াই-এহারিয়ে দিয়ে সায়েবরা লোহার বাক্সে বন্দি করে রেখেছে। দৈত্যরা তাই কিছুই করতে পারবে না, শুধু মাঝে মাঝে মনের দুঃখে নিশ্বাস ছাড়বে—আর সেই কালো নিশ্বাসে হিন্দুস্থানের সুখের গ্রাম, সোনার ধানক্ষেত পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে। সায়েবরা মনে মনে তা জানেন, মাঝে মাঝে ওঁদের মনে দুঃখ হয়—সেইজন্যে দিনরাত মদে চুর হয়ে থাকেন। সায়েবরা বিদায় নিয়েছেন। একদিন এই বাধাবন্ধহীন ফুর্তিকেন্দ্র শাজাহানের পানাগারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সর্বনাশ হয়েছে। কেউ কোনোদিন যা ভাবতে পারেনি তাই হয়েছে—পামার কোম্পানি ফেল করেছে। রাতারাতি অনেক রাজা ফকির হয়েছেন। দেউলিয়া রাজার দলকে মনোবল দেবার জন্যে শাজাহানের সেলার থেকে আবার ব্রান্ডি, হুইস্কি এবং জিন-এর বোতল বেরিয়ে এসেছে। হুইস্কির মোহিনী মায়ায় কলকাতা আবার সব ভুলে গিয়েছে। নতুন বড়লাট এসেছেন, নতুন ঘোটলাট এসেছেন—আবার পুরনো বোতল ভেঙে নবাগতদের স্বাস্থ্যপান করা হয়েছে।
তারপর শাজাহানের কর্তারা একদিন মাথায় হাত দিয়ে বসেছেন। বড়াপোচখানায় নতুন কল এসেছে। লিফট। পায়ে হেঁটে আর কাউকে উপরে উঠতে হবে না। অবশ্য বড়াপোচখানায় এখন এই লিট কেবল লেডিজদের জন্যে। তারা খিলখিল করে হাসতে হাসতে একটা খাঁচার মধ্যে গিয়ে বসলেন, আর দুজন বেয়ারা দড়ির কপিকল দিয়ে সোঁ সোঁকরে টেনেতাদের উপরে তুলে দিচ্ছে। এর পর কেউ কি আর লিবিহীন এই সেকেলে শাজাহানে আসবে? সে-চিন্তাও তারা যখন করেছেন তখন তাদের সামনে ছিল শাজাহান হুইস্কি—স্পেশালি বন্ড ইন স্কটল্যান্ড ফর হোটেল শাজাহান।
এমনি করেই একদিন শাজাহানে আকাশে নতুন শতাব্দীর সূর্যোদয় হয়েছে। দিন পালটিয়েছে, দৃষ্টিভঙ্গি পালটিয়েছে, পোশাক পালটিয়েছে, রাজা, হোটেলের মালিক, বারমেড, বারম্যান সব পালটিয়েছে, কিন্তু হুইস্কির পরিবর্তন হয়নি। আকাশের চন্দ্র সূর্য এবং মাটির হুইস্কি-এদের কোনোদিন পরিবর্তন হবে না—হবস সায়েব আমাকে একবার বলেছিলেন। তার কাছেই শুনেছিলাম, শাজাহানের সেলারে সিম্পসন সায়েব যে এক কেস রেড ওয়াইন রেখেছিলেন, তার একটা বোতল খোলা হয়েছিল সেবার যখন লর্ড কার্জন আমাদের এই হোটেলে পদার্পণ করেছিলেন। তারপর বাকি কটা বোতল আজও কোনো বৃহৎ অতিথির আবির্ভাব অপেক্ষায় শতাব্দীর নিদ্রায় অচেতন হয়ে রয়েছে।
সরাবজি একটু পরেই ফিরে এলেন। এখন দুপুরবেলা-লাঞ্চের ভিড় শেষ হয়ে গিয়েছে। কয়েকজন ক্লাইভ স্ট্রিট কর্তা এই কোণে ঝুঁদ হয়ে বসে রয়েছেন, লাঞ্চ করতে এসে নেশার ঘোরে অফিসের ঠিকানা ভুলে গিয়েছেন বেয়ারাকে জিজ্ঞাসা করছেন, টুম জানটা হ্যায়? বিকুল গড়বড় হো গিয়া।
বেয়ারা বেচারা বলেছে, হুজুর, আপনি কোন অফিসে কাজ করেন তা আমি কী করে জানব? নেশার ঘোরে সায়েব এবার আমাকে ডেকে পাঠালেন। তোমরা এই সব শুড়-ফর নাথিং ফেলোদের রেখেছ কেন?
সরাবজি এবার কাউন্টার থেকে আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন। সায়েবকে বললেন, তুমি অমুক অফিসে কাজ করো।
সায়েব চমকে উঠলেন, এতক্ষণে মনে পড়েছে আমি ওখানকার ম্যানেজিং ডিরেক্টর। অথচ কোথায় কাজ করি তা মনে করতে না পেরে আমি দেড় ঘণ্টা এখানে বসে আছি।
সায়েব চলে যেতে, সবজিকে বললাম, কেমন করে বললেন?
সরাবজি হাসলেন,এদের প্রায় সবাইকে আমি চিনি। শুধুঅফিসনয়, এদের বাড়ির ঠিকানাও হোটেলের লোকদের জেনে রাখতে হয়, রাত্রে প্রায়ই এদের বাড়ি ফিরে যাবার সামর্থ্য থাকে না। ড্রাইভার থাকলে অসুবিধে হয় না, কিন্তু অনেকে যে নিজেই গাড়ি চালিয়ে আসেন তখন গাড়ি পড়ে থাকে, ট্যাক্সি করে আমরা বাড়ি পৌঁছে দিই।
এর পর গল্প করবার মতো সময় আমাদের ছিল না। সন্ধের ককটেলে অনেক কাজ।
যদি কখনও আধুনিক এই পৃথিবীতে আদিম সভ্যতার রসাস্বাদন করতে চান তবে শাজাহান হোটেলের ককটেলে আসবেন। মিসেস পাকড়াশীর পার্টিতে আমি সেই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলাম। সরাবজি আমার কানে কানে বলেছিলেন, ককটেলের চারটে অধ্যায় আছে। প্রথম প্রহরে ঠাকুর চেঁকি অবতার, দ্বিতীয় প্রহরে ঠাকুর ধনুকে টঙ্কার, তৃতীয় প্রহরে ঠাকুর কুকুরকুণ্ডলী, চতুর্থ প্রহরে ঠাকুর বেনের পুঁটুলি।
