মায়ের কাছে। মা আমার সব দোষ ক্ষমা করবেন। সারাদিন ধোপার ময়লা ঘেঁটে ঘেঁটে যত পাপ করেছি, তা এবার মার চরণে বিসর্জন দিয়ে আসব। বোসদার দিকে তাকিয়ে লেনিনবাবু বললেন, আপনি তো সার সায়েব মানুষ, আপনাকে বলে লাভ নেই। এই ছোকরাকে, এই ব্রাহ্মণসন্তানকে অ্যালাউ করুন। ভোরবেলায় স্নানের অভ্যাসটা থাকলে অনন্ত নরকবাসের হাত থেকে বেঁচে যাবে।
বোসদা মৃদু হাসলেন। বললেন, আমি কি ওকে আটকে রেখেছি? ইচ্ছে হলে যাক। ন্যাটাহারিবাবু বললেন, তা হলে চলুন। এই সকালে ঘাটে গিয়ে দেখবেন কত পুরুষ আর মেয়েমানুষ সারারাতের পাপ ধুয়ে ফেলছে। আমাদের হেডবারম্যান রাম সিং এতক্ষণে স্নান শেষ করে পুজোয় বসে গিয়েছে।
আমি বললাম, আপনি একাই যান।
উনি চলে যেতে বোসদা বললেন, পাগল। ফেরবার সময় লোকটা এক ঘটি জল সঙ্গে করে নিয়ে আসবে। প্রথমে হোটেলের সামনে একটু ছড়িয়ে দেবে। পিছনের দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকে, বালিশ বিছানার পাহাড়ের উপর জল ছড়িয়ে দিয়ে বলবে, মা দুর্গতিনাশিনী, দেখিস মা।
একটা ঘর এই ভোরবেলায় খালি হয়ে গেল। এক আমেরিকান দম্পতি রাঁচির দিকে চলে গেলেন। বোসদা বললেন, ওপরে আমাদের একটা ঘর না হলে চলে না। দেখ, দুজনের কেউ উঠেছেন কি না।
উপরে উঠে গিয়ে দেখলাম, বোসদার ঘর ভিতর থেকে বন্ধ। হাওয়াই হোস্টেস মি মিত্র এখনও ঘুমিয়ে রয়েছেন। আমার ঘরের দরজাটা খোলা। গুড়বেড়িয়া বললে, সায়েব উঠে পড়েছেন। চা খেয়েছেন।
দরজায় নক করতেই হাওয়াই জাহাজের ভদ্রলোক বললেন, কাম ইন।
ঢুকে গিয়ে আমি বললাম, রাত্রে আপনার নিশ্চয়ই খুব কষ্ট হয়েছে। নিচের একটা ঘর খালি হয়েছে। আপনি চলুন।
গুড়বেড়িয়ার হাতে মালপত্র চালান করে দিয়ে, ভদ্রলোককে নিচের ঘরে ঢুকিয়ে বোসদাকে খবর দিয়ে এলাম।
বোসদা হেসে বললেন, এখানে থেকে থেকে ভাগ্যটা একেবারে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে। তোমার কপালের জন্যে হিংসে হচ্ছে। ভদ্রমহিলাকে কখন যে বিদেয় করে একটু ঘুমোতে পারব জানি না।
আজ এতদিন পরে বোসদার সেই কথাগুলো মনে পড়লে কেমন হাসি আসে। আশ্চর্যও লাগে। সুজাতা মিত্রের কথা, বোসদার কথা, ভাবলে মনটা কেমন হয়ে যায়। আজও কোনো কর্মহীন নিঃসঙ্গ সন্ধ্যায় আমি যেন সুজাতা মিত্রকে খুব কাছাকাছি দেখতে পাই। অকারণে আমার বয়সী চোখ দুটো সেই সুদুর অতীতে ফিরে যেতে চায়। আমি বুঝি, এ অন্যায়, সংসারের নিষ্করুণ পথে চিত্তের এই চঞ্চলতা মানায় না। আমার পরিচিতা একান্ত আপনজন সকৌতুকে এবং সস্নেহে অভিযোগ করেন, তোমার সব ভাল। শুধু এই ছেলেমানুষিটুকু ছাড়া। সংসারের পাঠশালায় এত শিখেও তুমি সেই কৈশোরেই রয়ে গেলে, বড় হয়ে উঠলে না।
যিনি আমার কাছে বারবার এই অভিযোগ করেন, তিনি হয়তো চান আমার অপরিণত মন কৈশোরের প্রবৃত্তি কাটিয়ে যৌবনের রংয়ে নিজেকে রঙিন করে তুলুক। কিন্তু কেন জানি না বেশ বুঝতে পারি কৈশোর থেকে সোজা আমি বার্ধক্যে এসে দাঁড়িয়েছি। ওঁদের দুজনকে স্কুটারের পিঠে ভ্রমণ করে ফিরে আসতে দেখে আমি সুজাতাদিকে বলেছিলাম শুনুন, জগন্নাথ চক্রবর্তীর কবিতা–
কদমে চলেছে দুই সাঁঝের তারকা
স্কুটারের পিঠে,
ফাঁপানো চুলের গুচ্ছে লাল ফিতে
ওড়নায় লেপটানো পিঠ অসম্বৃত
অদম্য অকুতোভয় স্কুটারের তরুণ চালক।
আর আবৃত্তি করতে দেননি, সুজাতাদি আমার কানটা চেপে ধরেছিলেন। আমি বলেছিলাম, লাগছে। ছেড়ে দিন।
বোসদা বলেছিলেন, আঃ, না হয় বলেই ফেলেছে।সুজাতাদি বলেছিলেন ওড়না ও কোথায় পেল?
এতদিন পরে সে-সব স্বপ্নের মতো মনে হয়।
সুজাতা মিত্রের কাহিনিতে একদিন আমাকে আসতেই হবে। কিন্তু তার আগে ককটেল এবং মিস্টার সরাবজি।
মিস্টার সরাবজি ভারতীয় প্রথায় হাতজোড় করে খাঁটি বাঙলায় বলেছিলেন, আসুন, বসুন। এই বার-এ আপনাকে পেলে আমি আর কিছুই ডর করি না।
সরাবজি আমাদের নতুন বার ম্যানেজার। বৃদ্ধ ভদ্রলোক, পাকা আপেলের মতো টকটকে রং। বয়সের ভারে একটু নুয়ে পড়েছেন। অবাক হয়ে বললাম, আপনি বাংলা জানেন?
কী যে বলেন। আমি যখন কলকাতায় এসেছিতখন আপনারা এই ওয়ার্লডে আসেননি, আমার নিজেরই তখন চৌদ্দ বছর বয়স।সরাবজিতার সাদা প্যান্টের বলেসটা টাইট করে নিয়ে আমার পিঠে হাত রাখলেন।
আমি বললাম, আবগারি খাতাগুলো ঠিক করে রাখা দরকার, ওগুলোর নাম শুনলে ভয় লাগে।
সরাবজি তাঁর চোখের মোটা চশমাটা খুলে প্রসন্ন হেসে বললেন, ওদের আমি ভয় পাই না। আমি যদি ডিউটি ফাঁকি দেবার চেষ্টা না করি, যদি আমি ড্রিঙ্কে জল না মেশাই, যদি আমি কোনো সন্দেহজনক মেয়েকে একলা বার-এ বসে থাকতে না দিই, তাহলে এক্সাইজ ডিপার্টমেন্টকে আমি কেন ভয় করতে যাব?
শাজাহানের বার-এ সরাবজি নিজের হাতে বোতলগুলো সাজিয়ে রাখছিলেন। হেড বারম্যান রাম সিং সায়েবের দিকে তাকিয়ে ছিল। সরাবজি অভ্যস্ত হাতে একটা বোতল আলোর দিকে নিয়ে নেড়ে দেখলেন কতটা আছে, তারপর আবগারি ডিপার্টমেন্টের স্টক রেজিস্টারের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে গিয়ে ওঁর যেন একটু সন্দেহ হল। বললেন, রাম সিং, খাতায় লেখা চার পেগ, অথচ পাঁচ পেগের মতো মাল রয়েছে মনে হচ্ছে।
রাম সিং অপ্রস্তুত হয়ে বললে, হুজুর, হাতের মাপ তো; কোথাও একটু কম, কোথাও একটু বেশি পড়ে যায়।
সরাবজি বললেন, আমি এর ভিতর নেই। নিজের হাতে আমি কাউকে কমও দেব না, বেশিও দেব না।
আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে সরাবজি বললেন, আমরা যখন এই লাইনে আসি তখন এক আধ পেগ ড্রিঙ্কের জন্যে কেউ মাথা ঘামাত না। তখন যার দাম ছটাকা ছিল এখন তা ছিয়াশি টাকাতেও পাওয়া যায় না। এখন কাস্টমারকে এক ফোঁটা কম দেওয়া মানে ফাঁকি দেওয়া।
