আমি চুপ করে রইলাম। ভদ্রমহিলার মুখের দিকে তাকিয়ে এক বিষণ্ণ-নয়না সুন্দরীকে আবিষ্কার করলাম। আমারই চোখের সামনে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন, তিনি যেন প্রিন্সেস অব স্যাত্ আইজ ছাড়া আর কেউ নয়। তার দৃঢ় নমনীয় গ্রীবার মধ্য দিয়ে যে সৌন্দর্য খুঁজে পেলাম তা স্নিগ্ধ নয়, শান্ত নয়, কর্কশও না, মধুরও না। সামান্য হাই তুলে ভদ্রমহিলা বললেন, এত রাত্রে কাউকে এমনভাবে বিপদে ফেলার কথা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারতাম না।
ভদ্রমহিলার কণ্ঠস্বরেও বৈশিষ্ট্য। নাচের ঘুঙুর যদি আরও চাপা হত, ট্রামের ঘর্ঘর যদি ঘনশ্যাম ঘাসের ভেলভেটে আরেকটু অস্পষ্ট হত, আরেকটু সংযত, তাহলে অনেকটা যেন মিস্ মিত্রের স্বর হত তারা।
চাবি নিয়ে এসে বোসদা দরজাটা খুললেন। চাপা গলায় বললেন, আজকের রাতটা কোনোরকমে এখানে কাটিয়ে দিন।
মিস্ মিত্র ঘরটার চারিদিকে তাকিয়ে বললেন, কার ঘর আমি জোর করে অধিকার করলাম? বোসদা বললেন, সে-সব পরে খোঁজ করা যাবে, এখন শুয়ে পড়ুন। ভদ্রমহিলা শুনলেন না। বললেন, কার ঘর না বললে, আমার ঘুমই আসবে না। বোসদা চুপ করে রইলেন। আমি বললাম, মিঃ স্যাটা বোসের।
কী বোস? ভদ্রমহিলার বিষণ্ণ চোখে এবার সত্যিই হাসি ফুটে উঠল।
বোসদা বাধ্য হয়ে, এবার নিজেই উত্তর দিলেন, ছিলাম সত্যসুন্দর, কপালদোষে স্যাটা হয়েছি!
ভদ্রমহিলা বললেন, আমরা বাসেই থাকতে পারতাম, কিংবা কয়েক ঘণ্টা লাউঞ্জে কাটিয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু কী যে করলেন আপনি। এখন আপনারা শোবেন কোথায়?
আমার তো পোবার প্রশ্নই ওঠে না, মিস্ মিত্র, আমি তো ডিউটিতে থাকব। আর এই শ্রীমানেরও একটু পরে কাজ রয়েছে।বাথরুমের দরজাটা খুলে বোসদা বললেন, চাবিটা একটু শক্ত আছে, সামনের দিকে টেনে একটু জোরে ঘোরাবেন, তাহলেই দরজা খুলে যাবে। টাওয়েলটা ধোপ-ভাঙা, সুতরাং ব্যবহার করতে পারেন।
মিস্ মিত্রকে নমস্কার করে আমরা দুজনে বেরিয়ে আসছিলাম। ভদ্রমহিলাও আমাদের সঙ্গে বেরিয়ে এলেন। কোনোরকমে বললেন, আপনাকে কীভাবে কৃতজ্ঞতা জানাব বুঝে উঠতে পারছি না!
শুভরাত্রি জানিয়ে বোসদা আমাকে নিয়ে নীচে নেমে এলেন। বললেন, আর কোনো উপায় ছিল না। তোমাকে ছাড়া কাউকে জাগাবার মতো অধিকারও আমার নেই।
বোসদা বললেন, ভদ্রমহিলা হচ্ছেন হাওয়াই হোস্টেস। ওঁদের প্লেনে হঠাৎ যান্ত্রিক গোলযোগ হওয়ায় হোটেলে চলে আসতে বাধ্য হয়েছেন। প্লেনের অফিসারদের জন্যে সাধারণত আমাদের আলাদা ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু আজ শোচনীয় অবস্থা। ঘর খালি নেই। তারাও আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলেন না। ভদ্রমহিলা একবার বললেন, আপনার কষ্ট করবার দরকার নেই, লাউঞ্জের সোফাতেই গড়িয়ে নিচ্ছি। কিন্তু তা কখনও হয়? বাধ্য হয়েই তোমাকে ডেকে তুললাম। কয়েক ঘণ্টার ব্যাপার তো। সকালেই দুএকটা ঘর খালি হয়ে যাবে। তখন ওঁদের সরিয়ে দেব।
আমি বোধহয় আর একটা হাই চেপে রাখার চেষ্টা করছিলাম। বোসদা পিঠে হাত দিয়ে বললেন, হোটেলে যদি কাজ করতে হয়, তাহলে রাত জাগার অভ্যাস রাখা ভাল। রাত্রে কারা জেগে থাকে জানো? আমি বললাম, ছোটবেলায় শুনেছি, দুষ্টু এবং অবাধ্য ছেলেরাই রাত্রে জেগে থাকে।
ঠিক। পৃথিবীর অবাধ্য দুষ্টু ধেড়ে খোকারাই রাত্রে জেগে থাকে। সারারাত্রের অত্যাচারে ক্লান্ত হয়ে ভোরের সান্ধ্য মুহূর্তে তারা ঘুমিয়ে পড়ে।
কিছুই কাজ নেই, জেগে থাকা ছাড়া। কাউন্টারে আমরা দুজন জেগে বসে রয়েছি। বসে বসে বোসদা একটুকরো কাগজের উপর পেন্সিল দিয়ে ছবি আঁকছেন। পেন্সিলের আঁচড়ে শাজাহানের লাউঞ্জকে নকল করবার চেষ্টা করছেন। বাইরে আর একজন দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে শাজাহান হোটেলের প্রায়-মিলিটারি পোশাক। তার হাতে একটা পেন্সিল ও খাতা।
এক অদ্ভুত স্বাধীনতার আনন্দে মনটা ক্রমশ ভরে উঠল। কেউ কোথাও নেই, শাজাহান হোটেলের সর্বেসর্বা যেন আমরাই। এই বিশাল হোটেলের অসংখ্য ঘরে যাঁরা রয়েছেন, তারা পরম বিশ্বাসে আমাদের উপর সব দায়িত্ব অর্পণ করে নিঝুম রজনীতে ঘুমিয়ে রয়েছেন। রাতের রেলগাড়ির ড্রাইভার ও ফায়ারম্যানের মতো অতি দূরতীর্থের যাত্রীদলকে আমরা দুজনে যেন কোনো সোনার প্রভাতের দিকে নিয়ে চলেছি। মণিমাণিক্যে ভরা সেই নতুন প্রভাতে এই ঘুমন্ত মহাদেশের তীর্থযাত্রীরা কি পরম বৈভব খুঁজে পাবেন জানি না; কিন্তু আমরা তখন তাদের আনন্দে ভাগ বসাবার জন্যে জেগে থাকব না। হোটেলের দায়িত্ব অন্য কারুর উপর দিয়ে, দিনের আলোতে আমরা তখন অবহেলিতা অভিমানিনী রাত্রিকে আমাদের ছোট্ট ঘরে ডেকে আনবার চেষ্টা করব।
মিস্টার আগরওয়ালা নতুন হোস্টেস রেখেছেন। রাত্রির নিস্তব্ধতার মধ্যেও দেখলাম, দুনম্বর সুইট থেকে এক ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন। আমি চিনতে পারিনি। বোসদা কানে কানে বললেন, ইনি আমাদের দেশের একজন নামকরা শ্রমিকনেতা। আগরওয়ালাদের কারখানাগুলোর শ্রমিকদের ইনিই নেতৃত্ব করেন। একটা ট্যাক্সি সামনে এসে দাঁড়াতেই তিনি দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে পড়লেন। গাড়িটা শ্যামবাজারের দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল। দারোয়ানজি পকেট থেকে নোটবই বের করে কী একটা টুকে নিলেন।
বোসদা হেসে বললেন, গাড়ির নম্বরটা আমরা রাত্রে টুকে রেখে দিই। অত রাত্রে যারা যাতায়াত করে, তাদের কপালে যে কী আছে তার ঠিক নেই।
রাত্রি যে শেষ হয়ে আসছে এবার বুঝলাম। লেনিনবাবু একটা খাটো ধুতি পরে গামছা হাতে স্তব পাঠ করতে করতে বেরিয়ে যাচ্ছেন। এত সকালে আইন কানুন মানা হয় না তাই; না-হলে হোটেলের কোনো কর্মচারীকে ঐ বেশে সামনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতে দেওয়া হয় না। স্তব পাঠ করতে করতেই তিনি আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। আমি প্রশ্ন করলাম, কোথায় চললেন?
