আজও তারা কারার বন্ধন ছিন্ন করে চৌরঙ্গীর পাঠকের মনের জানালার ধারে এসে দাঁড়াতে চাইছে। কিন্তু হোটেলের সামান্য কর্মচারী আমি কী করব? নিজের অক্ষমতার তীব্র যাতনা সেইদিন বুঝতে পেরেছিলাম যেদিন শাজাহান হোটেলে মিসেস্ পাকড়াশী পার্টির ব্যবস্থা করেছিলেন। ককটেল পার্টি–রিসেপশন টু অনিন্দ্য অ্যান্ড শ্যামলী।
অনিন্দ্যর বিবাহ উপলক্ষে ডিনার পার্টি পাকড়াশী-হাউসে ইতিমধ্যেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল। শাজাহানের উর্দিপরা বয়রা সেখানে গিয়ে পরিবেশন করেছিল। আমারও যাবার হুকুম হয়েছিল। বোসদা বোধহয় আমার মনের অবস্থা বুঝতে পেরেছিলেন, তাই আমাকে সে যাত্রা রক্ষা করে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ম্যানেজারকে জানাবার প্রয়োজন নেই, তোমার বদলে আমিই যাবখন।
সেদিন অনেক রাত্রে বোসদা হোটেলে ফিরে এলেন। আমি তখন ঘর থেকে একটা চেয়ার বের করে ছাদের উপর চুপচাপ বসেছিলাম। বোসদা যখন ফিরে এলেন, তখন ঘামে তার শার্ট ভিজে গিয়েছে। আমাকে বসে থাকতে দেখে রাগ করলেন। বললেন, শুধু শুধু এখনও জেগে রয়েছ কেন?
আমি হাসলাম। গলার টাইটা আলগা করতে করতে বোসদা বললেন, দেড় হাজার লোকের স্পেশাল কেটারিং তো সোজা জিনিস নয়। হাড় ভাজা ভাজা হয়ে গিয়েছে। আমি তখনও চুপ করে ছিলাম। বোসদা বললেন, কী এত ভাবছ?
বললাম, কিছুই না। একটা সিগারেট ধরিয়ে বোসদা বললেন, আমরা ছোটোবেলায় সুর করে গাইতাম–ভাবিতে পারি না পরের ভাবনা।
বললাম, সারাজীবনই তো আপনি আমাদের মতো পরের ভাবনা ভেবে গেলেন।
বোসদা আমার পিঠে হাত রেখে বললেন, তোমরা কী আমার পর?
যাদের আপন ভাবছেন, একদিন হঠাৎ বুঝবেন, তারা সবাই পর। আমি বোসদার দিকে তাকিয়ে বললাম। অন্ধকারে সিগারেটের অস্পষ্ট আলোকে আমার মুখটা বোসদা বোধহয় ভালভাবে দেখতে পেলেন না। বললেন, কেন? বিপদে পড়লে তুমি কি আমাকে দেখবে না?
মনে মনে বললাম, নিজেকে আমার বুঝতে একটুও বাকি নেই। এই তো দুনম্বর সুইটে আমার সাহায্যপ্রার্থিনীকে কেমন দেখলাম।
দেখে দেখে এবং শাজাহানের বিষ গ্রহণ করে করে সত্যসুন্দর বোস নীলকণ্ঠ হয়ে গিয়েছেন। আকাশের দিকে একঝলক ধোঁয়া ছুড়ে দিয়ে বললেন, সংসারের হোটেলখানায় কেউ কাউকে সার্ভ করতে পারে না। আমরা কেবল ভাল ওয়েটারের মতো সামনে ট্রে ধরতে পারি, তার থেকে যার যা পাওনা তুলে নিতে হবে।
কথা শেষ করেই বোসদা এবার হেসে উঠলেন। বললেন, এখন তোমাকে আর ঐ ট্রে ধরতে হবে না। তোমাকে যা ধরতে হবে তার নাম পেগ। কারণ মিসেস পাকড়াশী ককটেলের ব্যবস্থা করেছেন, এই হোটেলেই। শুধু ডিনারে আজকাল কলকাতার কোনো শুভকাজ সম্পন্ন হয় না। এখন পাকস্পর্শের পর জলস্পর্শ। অর্থাৎ কোনো হোটেলে একদিন বিশেষভাবে নির্বাচিত অতিথিদের সেবাযত্ন। এ-সবের ব্যবস্থা তোমাকেই করতে হবে, কারণ কাল থেকে ওখানে তোমার ডিউটি, মিস্টার সরাবজি হবেন তোমার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। কিন্তু সে-সব পরে শুনবে, এখন ঘরের ছেলে ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ো।
আর আপনি? আমি প্রশ্ন করেছিলাম।
আমি এখন স্নান করব। স্নান সেরে গায়ে একটু পাউডার ছড়িয়ে কিছুক্ষণ কুমীরের মতো চুপচাপবিছানার উপর পড়ে থাকব, তারপর রাত-ডিউটির জন্যে একতলায় নেমে যাব।
এই পরিশ্রমের পর রাত-ডিউটি! আমি বারণ করেছিলাম। আমার হয়ে মিসেস পাকড়াশীর বাড়িতে তিনি যখন কাজ করে এসেছেন, তখন আমি এবার ওঁর বদলিতে যাই। কিন্তু সত্যসুন্দরদা কিছুতেই রাজি হলেন না। বললেন, আমি তোমার উপর-ওয়ালা। ডিউটি-চাৰ্টতৈরি করবার দায়িত্ব আমার না তোমার? একরকম জোর করেই বোসদা আমাকে ঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন।
অবসন্ন দেহটা ক্লান্তিভরা রাত্রের অন্ধকারে বিছানায় নিশ্চিন্ত প্রশ্রয়ে কখন যে ঘুমকে নিবিড় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করেছিল খেয়াল করিনি। হঠাৎ মনে হল ঘরের দরজায় যেন টোকা পড়ছে। ধড়মড় করে উঠে দরজা খুলতেই দেখলাম, একটা টর্চ হাতে করে সত্যসুন্দরদা দাঁড়িয়ে আছেন। আমার পিঠে হাত রেখে বললেন, সরি, তোমাকে এমন সময় ডেকে তুলতে বাধ্য হলাম। তোমাকে ঘরটা এখনি ছেড়ে দিতে হবে। ব্যাপারটা পরে বলছি। এখন চল দিকিনি, তোমার বিছানার চাদরটা সোজা করে দিই।
দ্রুতবেগে বোসদা বিছানাটা ঠিকঠাক করে দিলেন। আমাকে বললেন, তাড়াতাড়ি মুখে চোখে একটু জল দিয়ে নাও।
বাথরুমের ভিতরে মুখে চোখে জল দিতে দিতেই শুনলাম, বোসদা কাদের লছেন,আসুন। আপনারা ক্লান্ত হয়ে রয়েছেন, বিশ্রাম না করলে হয়তো অসুস্থ হয়ে পড়বেন।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে দেখলাম, এক ভদ্রলোক আমার বিছানায় বসে পড়ে জুতো খুলতে আরম্ভ করেছেন। জুতো খুলতে খুলতেই তিনি বললেন, মিস্ মিত্রের কী ব্যবস্থা হবে? বোসদা বললেন, আপনি চিন্তা করবেন না। আমি এখনই সব ঠিক করে দিচ্ছি।
রাত্রের ম্নান আলোকে ঘুম-জড়ানো চোখে দেখলাম, হালকা ফাইবারের ব্যাগ হাতে, ফিকে নীল রংয়ের সিল্কের শাড়ি পরে এক তরুণী ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে রয়েছেন। বোসদা তার ব্যাগটা তুলে নিয়ে বললেন, আসুন।
ভদ্রমহিলা প্রতিবাদ জানালেন। বললেন, সে কী, আপনি আমার ব্যাগ বইবেন, তা কখনও হয় না। বোসদা সে-কথায় কান না দিয়ে বললেন, আসুন।
এবার আমরা বোসদার ঘরের সামনে এলাম বোসদা ব্যাগটা আমার হাতে দিয়ে বললেন, একটু দাঁড়াও, আমি চাবিটা নিয়ে আসি।
ভদ্রমহিলা লজ্জায় যেন নীল হয়ে গিয়েছেন মনে হল। বললেন, কেন আমার ব্যাগ ধরে দাঁড়িয়ে থাকবেন? আমার অত্যন্ত লজ্জা করছে।
