এবার কী বলুন তো? করবী আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন।
অনভিজ্ঞের মতো আমি বলেছিলাম, এবার শাজাহান হোটেল ছেড়ে নিউ আলিপুর।
করবী আমার কাঁধে হাত রেখেছিলেন। আপনি থেকে হঠাৎ তুমি হয়ে গেলাম। আমাকে তোমরা একেবারে ভুলে যাবে। তোমরা কোনোদিন তো আমাকে শাজাহান হোটেলের সহকর্মী বলে মনে করোনি।
আপনি নিজেই ভুলে যাবেন।ডিনারবা ব্যাংকোয়েটে কোনোদিন শাজাহান হোটেলে এলেও আপনি একবারও কাউন্টারের দিকে তাকাবেন না, বিশিষ্ট অতিথিদের সঙ্গে সোজা হ-এ চলে যাবেন। আমরা কিন্তু তখনও রসিদ কাটব, বিল তৈরি করব, খাতায় লেখালেখি করব, টেলিফোন ধরব, স্টুয়ার্ডের বকুনি খাব। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমারও ভেরিকোজ ভেনগুলো হয়তো ফুলে উঠবে।
তোমার এ-চাকরি ভাল লাগে না? করবী বলেছিলেন।
মোটেই না। একটা দশটা-পাঁচটার চাকরি কোথাও করে দেবেন তো?তখন কত বড় বড় চাকরি তো আপনার হাতে থাকবে।
সব দেব। আমার জন্যে এত করেছ তুমি, আর এইটুকু করব না!
আমি বলেছিলাম, গুড নাইট।
করবী বলেছিলেন, গুড নাইট!
ফিরে এসে বিছানায় শুয়ে সামান্য কিছুক্ষণ হয়তো ঘুমিয়েছিলাম। রাত্রি অনেক হয়েছে। হঠাৎ গুড়বেড়িয়া দরজায় ধাক্কা দিলে। দুনম্বর সুইটের মেমসায়েব আমাকে ডাকছেন।
চোখে একটু জল দিয়ে আবার নেমে গেলাম। দেখলাম, করবী যেন কেমন হয়ে গিয়েছেন। তার সমস্ত দেহটা থরথর করে কাঁপছে।
নিজের মাথাটা চেপে ধরে করবী গুহ বললেন, একি করলাম আমি। আমাকে বাঁচাও ভাই।হিস্টিরিয়া রোগীর মতোকরবীর চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
শান্ত করবার চেষ্টা করে বললাম, ছিঃ, এমন করতে নেই।কী হয়েছে বলুন? একটু আগেও তো আপনাকে দেখে গেলাম। তখন তো কিছুই বললেন না।
ভয়ার্ত শিশুর মতো করবী বললেন, ভেবেছিলাম, কাউকে বলব না, যে যাই বলুক, অনিন্দ্যকে আমি ছাড়তে পারব না। জীবনে কিছুই তো পাইনি; একজন যদি আমাকে ভালবাসা দেয়, কেন আমি নেব না?
করবী এবার একটু থামলেন। তারপর বললেন, মিসেস পাকড়াশীর অত চিন্তা কেন? আমি কি ওঁর ছেলেকে যত্ন করব না, না তাকে ভালবাসব না? আমাকে সামনে রেখে কোনো অদৃশ্য আদালতে করবী যেন সওয়াল করলেন। করবীকে শান্ত করবার চেষ্টা করে বললাম, হঠাৎ এই কথা ভাবছেন কেন?
ভাবব না! অনিন্দ্যর মা যখন আমার ঘর থেকে শুকনো মুখে চলে গেলেন, তখন আপনি তাকে দেখেননি, তেজপাতার মতো তার দেহটা কাপছে। আমি বলেছিলাম, আপনি আর কোনো বাধা দেবেন না তো? উনি বলেছিলেন, না। আরও বলেছিলেন, হয়তো খোকার চেয়ে তোমার বয়স একটু বেশি। তবু কিছু বলবনা।তারপর ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিলেন তিনি। মিনতি জানিয়ে বলেছিলেন, আমার ছবির নেগেটিভটা বিয়ের আগে ছিড়ে ফেলবে তো? আমার হাতটা চেপে ধরে বলেছিলেন, কাউকে বলবে না তো?
আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। করবী দেবী কাঁদ কাঁদ হয়ে বললেন, এমনভাবে বিয়ে করবার কথা তো ছিল না। শাশুড়িকে ভয় দেখিয়ে, তার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অনিন্দ্যর মতো ছেলের গলায় মালা দেবার কথা তো ছিল না।
করবী এবার খামের মধ্যে হাত দিয়ে দেখলেন ছবি আছে কি না। তারপর কী ভেবে আমার সামনেই সমস্ত খামটা কুটি কুটি করে ছিড়ে ফেললেন। তারপর অকস্মাৎ নিজের সর্বস্ব হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। বললেন, অসম্ভব! আমার শ্বশুর, আমার শাশুড়ি, তারা গুরুজন। এমনভাবে, নোংরা পথে আমি অনিন্দ্যর বাড়িতে উঠতে পারব না। আমার পাপ হবে, অনিন্দ্যর অমঙ্গল হবে।
চোখের জল মুছে করবী এবার সহজ হবার চেষ্টা করলেন। বললেন, মাথা গোলমাল হয়ে যাচ্ছিল। এখানে আমার কেউ যে আপনজন নেই। তাই তোমাকে ডেকে পাঠিয়েছিলুম।
ঘৃণা ও গ্লানি করবীর মনে কোন সর্বনাশা চিন্তার জন্ম দিয়েছে তখনও বুঝতে পারিনি। পরের দিন একটু দেরিতে ঘুম ভেঙেছিল আমার। তখন হোটেলে শোরগোল পড়ে গিয়েছে। দুনম্বর সুইটে করবীর প্রাণহীন দেহ তখন পুলিস দরজা ভেঙে উদ্ধার করেছে।
ন্যাটাহারিবাবু বললেন, মা জননী আমার এক শিশি ঘুমের ওষুধ একসঙ্গে খেয়ে ফেলেছে।
করবীর মৃতদেহ যখন হোটেল থেকে বার করে মর্গে পাঠানো হয়েছিল, তখনও আমি যাইনি।
ন্যাটাহারিবাবু ফিরে এসে বললেন, একবার গুম্বাই করে এলেন না? আমি মশাই সবচেয়ে ভাল চাদরটা পুলিসের গাড়িতে দিয়ে দিয়েছি। মা জননী আমার কেন যে হোটেলে এসেছিল! সেই প্রথম যেদিন ওঁকে দেখেছিলুম, সেদিনই আমি সবাইকে বলেছিলুম, এ তো হোটেলের মেয়ে নয়, এ আমার মা জননী। তখন আমার কথায় কান দেওয়া হয়নি। এখন বোঝো। নিজের মনেই বকবক করতে করতে ন্যাটাহারিবাবু বেরিয়ে গেলেন।
১৩. পুরনো দিনের স্মৃতিরা
শুনেছি, নিভৃত মধুর ভাবনার অবসরে পুরনো দিনের স্মৃতিরা ভিড় জমায়। একান্তে মধু ভাবনায় ড়ুবে থাকার মতো সচ্ছল অবসর আমার নেই, তবুও সময়ে-অসময়ে এবং কারণে-অকারণে শাজাহান হোটেলের বেদনাবিধুর স্মৃতির মেঘগুলো আজও আমার হৃদয়ের আকাশকে মেঘাচ্ছন্ন করে তোলে। কেন এমন হয়, কেমন করে হয় তা জানি না, জানবার মতো কৌতূহলও আমার নেই। তবে এইটুকু এতদিনে বুঝেছি যে, শাজাহান হোটেলকে না দেখলে পৃথিবীর পাঠশালায় আমার শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যেত। মানুষের মনের গহনে যে গোপন মানুষটি লুকিয়ে রয়েছে তাকে যদি চিনতে হয় তবে পথের ধারে পান্থশালায় নেমে আসতে হবেই।
যেদিন পরা বিস্ময়ে ধর্মাধিকরণের অভাবনীয় রহস্যময় রাজপুরীতে প্রবেশ করেছিলাম, সেদিন অন্ধকার পথের নিশানা দেবার জন্য আমার পাশে এক অভিজ্ঞ জীবনদরদী ছিলেন। সেদিন কোনো কিছুই আমাকে খুঁজে বার করতে হয়নি; যা আমার জানবার প্রয়োজন, যেমনভাবে তা দেখাবার প্রয়োজন তা সেই পরমস্নেহশীল বিদেশি নিজেই ব্যবস্থা করেছিলেন। শাজাহানের সরাইখানায় অসংখ্যর ভিড় থেকে অসাধারণকে খুঁজে বার করে আমাকে দেখাবার জন্যে কেউ নেই। তবু এই আশ্চর্য ঐশ্বর্যময় ভুবন পথপ্রদর্শকহীন এক সামান্য কর্মচারীকে বহু মণিমাণিক্য উপহার দিয়েছে। কল্পনার রঙে যে পরমপ্রতিভাবান শিল্পী সাহিত্যের পটে নব নব চরিত্রের সৃষ্টি করেন, তিনি আমার নমস্য। কিন্তু আমি অভিজ্ঞতার ক্রীতদাস। আমার স্মৃতির কারাগারে বন্দি পুরুষ ও নারীর দল সুযোগ পেলেই বাইরে বেরিয়ে আসতে চায়, তাদের মুক্তি দাবি করে, আমি স্বাধীন মনে কল্পনার সৃষ্টিকে প্রশ্রয় দেবার সুযোগ পাই না।
