আমি বললাম, আপনি উত্তেজিত হবেন না, একটু বিশ্রাম নিন।
শোনো, ফিসফিস করে গোমেজ বললেন। যদি বসুন্ধরার গোপনতম বেদনাকে আবিষ্কার করতে চাও, তবে কান পেতে মোসার্টের ভায়োলিন কনসার্টো শোনো।
রেকর্ডের গান শোনবার সেদিন আমার প্রয়োজন ছিল না। আমি কান পেতে দুনম্বর সুইটে একটু আগেই হৃদয়ের বেদনাময় কান্না শুনে এসেছি।
ন্যাটাহারিবাবু পরের দিন জিজ্ঞাসা করেছিলেন,কী ব্যাপার, মশাই?দুনম্বর সুইটের মা জননী আমার আজ আর লিনেন পছন্দ করলেন না, ফুলওয়ালাকেও বকুনি দিলেন না।
বললাম, জানি না। ন্যাটাহারিবাবু মাথা নাড়লেন। উহু, ভাল লাগছে না আমার। শাজাহান হোটেলে এত বছর কাটিয়ে আমি এখন সব আগে থেকে বুঝতে পারি। বিশ্বাস করবেন না, কিন্তু আমি গন্ধ পাই।
ফোকলা চ্যাটার্জির সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, আগরওয়ালার গেস্ট হাউসের অফিসারটি মেয়েমানুষ না কেউটে সাপ? কাউকে মানে না। খোদ আগরওয়ালার স্লিপ নিয়ে এক ভদ্রলোকের জন্যে এসেছিলাম। সোজা ভাগিয়ে দিল। ইন্ডিয়ান ফার্মদের মশায় এই মুশকিল ডিসিপ্লিন বলে কিছুই নেই। আমেরিকায়, বিলেতে এমন তো কত গেস্ট হাউস আছে। সেখানকার কোনো কল গার্ল এমন সাহস করবে?
সত্যসুন্দরদা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কিছু বুঝছ?
বলেছিলাম, কেউ বোধহয় কিছু বুঝতে পারছে না।
করবীও কিছু বুঝতে পারছিলেন না। চুলগুলো আঁচড়াবার সময় পর্যন্ত তিনি পাননি আমাকে ঘরের মধ্যে পেয়ে করবী ছেলেমানুষের মতো প্রশ্ন করলেন—কেউ যদি আমাকে ভালবাসে এবং আমি যদি তাকে ভালবাসি, তাহলে তাকে বিয়ে করবার মধ্যে অন্যায় কী? আমি চুপ করে রইলাম। করবী নিজের মনেই বললেন, কে কী বলবে, তাতে আমাদের কী এসে যায়?আবার পর মুহুর্তেই তিনি স্তিমিত হয়ে এলেন।লোকে খারাপ বলবে। আগরওয়ালার হোস্টেসকে বিয়ে করেছে পাকড়াশী সাম্রাজ্যের রাজপুত্র।
একটু ভাবলেন করবী গুহ। লোকেরা যা খুশি ভাবুক, কী বলেন? আর অনিন্দ্যর মা, তিনি কেন আমাদের ব্যক্তিগত ব্যাপারে মাথা গলাচ্ছেন? তার ছেলেকে সুখী করবার দায়িত্ব, সে তত আমি নিচ্ছি। চুপকরে আছেন কেন, কথা বলুন,করবী এবার অভিযোগ করলেন। আমার মুখে এখনও কথা নেই। করবী বললেন, কারুর কথা শুনব না আমি। আমরা এগিয়ে যাব।
এই প্রগম্ভ করবীর সঙ্গে কি আমার এতদিনের পরিচয় ছিল?
আবার দেখা হয়েছে। মিস্টার আগরওয়ালার গেস্ট হাউসে অতিথিদের যাতায়াত বন্ধ। আমাকে দেখেই করবী মৃদু হাসলেন। শুনেছেন, মিসেস পাকড়াশী আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন। আগরওয়ালাকে বলে আমার চাকরি যাবার ব্যবস্থা করাতে পারেন জানিয়েছেন এবং আরও অনেক কিছু করতে পারেন। এবার হাসিতে ভেঙে পড়লেন করবী। বললেন, আপনিই আমাকে বিপদে ফেলেছেন। না-হলে আমি সব ঠিক করে ফেলতে পারতাম।
হ্যাঁ, আপনিই তো আমাকে দিয়ে দিব্যি করিয়ে নিয়েছেন অনিন্দ্যকে এ-ব্যাপারে কিছু বলতে পারব না।
দিব্যি ভাঙুন না, আমার কী?
তা কখনও হয়? অনিন্দ্যর যে তাতে ক্ষতি হবে। করবী গম্ভীরভাবে বললেন। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখ দেখতে দেখতে করবী বললেন, ভয় দেখালেই আমার মাথার ঠিক থাকে না। ছোটোবেলা থেকে কেউ আমাকে ভয় দেখিয়ে জব্দ করতে পারেনি। অনিন্দ্য এসেছিল, আমাকে জিজ্ঞাসা করলে, এত মন খারাপ কেন? আমি কিছুই বলতে পারলাম না।
ভয় দেখিয়েছিলেন মিসেস পাকড়াশী, সত্যি কথা। কিন্তু সেই রাত্রে তাঁকে নিজেই সত্যসুন্দরদার কাছে আসতে হল। মুখ শুকিয়ে কালি। করবী টেলিফোনে শাসিয়েছে তার হাতেও জিনিস আছে। তার হাতেও এমন আণবিক বোমা আছে, যা মিসেস পাকড়াশীর সোনার সংসার মুহুর্তে খুঁড়ো করে দেবে।
মিসেস পাকড়াশী আর যেন সেই গরবিনী মহিলা নেই। করবীর আণবিক বোমায় তিনি যেন ইতিমধ্যেই চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গিয়েছেন। মিসেস পাকড়াশীও সেদিন ভাগ্যকে ধিক্কার দিয়েছিলেন। শাজাহান হোটেলের এক নম্বর সুইট ভূত হয়ে তাকে মাঝে মাঝে কেন টেনে এনেছিল। মিসেস পাকড়াশী বলেছিলেন, কাউকে কোনোদিন আর বিশ্বাস করা চলবে না।
বোসদা পাথরের মতো নির্বাক হয়ে বসেছিলেন। কোনো উত্তর দিতে পারেননি।
সেই রাত্রে করবী গুহ আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। খুশিতে ঝলমল করছেন তিনি।
মিসেস পাকড়াশী একটু আগেই তার ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছেন জানি। করবীর হাতে একটা ছবির খাম। নিজেই বললেন, রাজি হয়েছেন! রাজি না–হয়ে উপায় ছিল না। স্বামী, ছেলে, মেয়ে, জামাই; সংসার এদের কাছে না হলে মুখ দেখাবেন কী করে? বলেছিলেন, তিনি আর কোনো বাধা দেবেন না। প্রথমে ওঁর একটু সন্দেহ ছিল, ভেবেছিলেন আমার হাতে কোনো প্রমাণ নেই। তারপর দেখালাম। করবী এবার খামটা নাড়ালেন! আপনাকেও দেখাতে পারব না। এক নম্বর সুইটের ঘরের ভিতরে তোলা ছবির নেগেটিভ।
মিসেস পাকড়াশী প্রথমে চমকে উঠলেন। বিশ্বাস করতে পারছিলেন না, তার গোপন অভিসারের অমন সর্বনাশা দলিল কী করে করবীর হাতে এল। ভয়ে ভয়ে করবীকে জিজ্ঞাসাও করেছিলেন, ও লর্ড, এ-সব কোথা থেকে এল?
সোজাসুজি উত্তর না-দিয়ে করবী বলেছিলেন, পাঁচজনের হাতে ঘোরার চেয়ে একজনের কাছে থাকাই কি ভাল নয়?
আমি বললাম, সত্যি, কোথা থেকে পেলেন? বন্ধ ঘরের ভিতরকার এমন ছবি যে কেউ তুলে রাখতে পারে তা আমার জানা ছিল না।
করবী বললেন, এই হোটেলেরই কেউ আমাকে দিয়েছে। না-হলে পেলাম কেমন করে? মিসেস পাকড়াশী আমাকে ভালবাসেন না বলে কেউ কি আমার জন্যে চিন্তা করে না? করবী এবার খিলখিল করে হেসে উঠলেন। রাজি হয়েছেন। ভুলেও তিনি আর আমার পথে বাধা দেবেন না।
