মিস্টার বোস বললেন, সে তো অন্য কথা। ক্যালকাটার যে-গৌরব আপনি প্যারিসে গিয়ে বাড়িয়ে দিতেন, তার তো কোনো ক্ষতিপূরণ হবে না।
মিসেস পাকড়াশী বললেন, আপনাদের প্রতি এবং ভালবাসার জোরেই তো এতদিন দাঁড়িয়ে রয়েছি। প্রার্থনা করুন, আমার শরীরটা যেন তাড়াতাড়ি ভাল হয়ে ওঠে।
রিপোর্টারকে বিদায় করে, চিন্তিত মুখে মিসেস পাকড়াশী আমাকে প্রশ্ন করলেন, দুনম্বর সুইটের অসভ্য মেয়েটি আছে তো?
মাত্র দশ মিনিট কিংবা বোধহয় তাও নয়। দুনম্বর সুইটের দরজা খুলে মিসেস পাকড়াশী আবার বেরিয়ে এলেন। সত্যসুন্দরদা তাকে হোটেলের বাইরে একটা গাড়িতে তুলে দিয়ে এলেন। ফিরে এসে বোসদা বললেন, করবীকে বোলো, মিসেস পাকড়াশীর কথা না শুনলে তাকে কষ্ট পেতে হবে। ভদ্রমহিলা আমাকে জানিয়ে দিতে বললেন।
করবী আমার জন্যেই অপেক্ষা করছিলেন। এই বিশাল জগতে করবী একা, আপনজন বলতে তার কেউ নেই। পুরুষের একাকিত্ব মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু এই বিদেশি পরিবেশে করবীর অবস্থা দেখে আমার মন খারাপ হয়ে উঠল। বেশ তো ছিলেন, কেন শুধু শুধু এই অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে জড়িয়ে পড়লেন? আর উপদেশ নেবার লোক পেলেন না তিনি? শাজাহান হোটেলের কনিষ্ঠতম কেরানি জীবনের বৃহত্তম সমস্যায় করবীকে কী পরামর্শ দেবে?
করবী আমার দিকে একবার তাকালেন, তারপর আর নিজেকে চেপে রাখতে পারলেন না। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন, এ আমার কী হলো?
কোনো অনুরাগজর্জরিতা আত্মীয়বন্ধু-বিহীনা মহিলার নিরাশ হৃদয়ের কান্না কখনও শুনেছেন কি? দুঃখজর্জরিত আমাদের এই সংসারে এমন কিছু দুর্লভ দৃশ্য নয় সেটি। আমি অনেকবার শুনেছি, এবং অবাক হয়ে আবিষ্কার করেছি, তারা সম্পূর্ণ এক। দীর্ঘশ্বাস এবং অভিযোগ মেশানো সেই কান্নার বর্ণনা দেবার মতো ক্ষমতা আমার নেই। একমাত্র কোনো বেঠোফেন, মোৎসার্ট বা ভাগনার সুরের মূৰ্ছনায় তার রূপ দিতে পারতেন; কোনো শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ বা ডিকেন্স হয়তো কানে শুনলে কলমে তার বর্ণনা দিতে পারতেন। সে আমার সাধ্যের অতীত।
শাজাহান হোটেলের দুনম্বর সুইটের দেওয়ালের ইটগুলো যেন সভয়ে প্রতিধ্বনি তুলল, এ আমার কী হল?
কী হল? তুমি ভালবেসেছিলে, সবার অগোচরে তুমি এক সুদর্শন নিৰ্মলপ্রাণ যুবককে তোমার মন দিয়েছিলে। তুমি আন্দাজ করেছিলে সেও হয়তো তোমার প্রতি সামান্য অনুরক্ত, অন্তত তার মনের কোথাও তোমার জন্যে সামান্য কোমল স্থান আছে। কিন্তু কেবল সেই পর্যন্ত। তারপর? তারপর যে এতদুর এগিয়েছে, তা তো জানা ছিল না। অনিন্দ্য যে বাড়িতে বলেছে সে এগিয়ে যেতে মনস্থির করেছে, তা তো সে নিজেও বলেনি। মিসেস পাকড়াশীই অজান্তে করবী গুহকে সেই পরম আশ্চর্য, পরম প্রিয়, পরম মধুর সংবাদটি দিয়ে গেলেন!
সাবধান। পাকড়াশী গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজের সামান্যতম ক্ষতিও আমি সহ্য করব না। অনিন্দ্যর বয়স কম, সে বোঝে না। ছিঃ, তাই বলে তুমি! তুমি না মেয়েমানুষ? তোমার অন্তর বলে কোনো জিনিস নেই? মিসেস পাকড়াশী প্রশ্ন করেছিলেন।
মিসেস পাকড়াশী বলেছিলেন, কেন যে জার্মানদের এখানে রাখার ব্যবস্থা হয়েছিল। এখন কত টাকা হলে ছাড়বে বলো?
করবী গুহ ফ্যালফ্যাল করে মিসেস পাকড়াশীর দিকে তাকিয়েছিলেন। অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করেছিলেন, টাকা?
হ্যাঁ হ্যাঁ। যার জন্যে আমার এই অশান্তির সৃষ্টি করেছ। যার জন্যে আমার প্যারিস যাওয়া হলো না। মিসেস পাকড়াশী উত্তর দিয়েছিলেন।
মিসেস পাকড়াশী উঠে পড়েছিলেন। বলেছিলেন, মনে থাকে যেন তুমি কথা দিয়েছ, অনিন্দ্য এসবের কিছুই জানবে না। আর যেহেতু আমি নিজেই তোমার দরজায় এসেছি, সেই জন্যে টাকার অঙ্কটা বাড়িও না। একটু ভেবে দেখো। আমি আবার খবর নেব।
করবী গুহ বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। অনিন্দ্য পাকড়াশী অন্তত তার কথা চিন্তা করেছেন। সব গাম্ভীর্য হারিয়ে ছেলেমানুষের মতো করবী গুহ সেদিন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করেছিলেন। কই, আমাকে তো এখনও বলেননি? আমার সঙ্গে একবার পরামর্শ করা উচিত ছিল না? আমি যে রাজি হব, সেকথা তিনি ধরে নিলেন কেমন করে?
হয়তো আপনার চোখেই তা ধরা পড়ে গিয়েছিল। আমি বলেছিলাম।
ওঁর চোখেও আমি তা দেখেছিলাম, কিন্তু সাহস হয়নি।করবীতখন কেবল অনিন্দ্যর কথাই ভাবছেন, মিসেস পাকড়াশীর সাবধানবাণী তাঁর মাথাতেই আসছে না।
আমি কোনো উপদেশ দিতে পারিনি। পাকড়াশীদের ক্ষমতার কথা আমার জানা আছে। অনাগত ভবিষ্যতে করবীকে কিসের সঙ্গে যে পরিচিত হতে হবে কে জানে। আমি ঘর থেকে সোজা ছাদে চলে গিয়েছিলাম। গোমেজের ঘরে গ্রামোফোন বাজছে। সেখানে তখন সুরের শিশুরা খেলা শুরু করে দিয়েছে। গোমেজের ঘর থেকে কলহাস্যে বেরিয়ে পড়ে মানব সমুদ্রের উপকূলে তারা যেন ছোটাছুটি করছে। এমন সময় গোমেজ যে ঘরে শুয়ে থাকতে পারেন আশা করিনি।
আমাকে দেখে বললেন, শরীরটা অসুস্থ, বাজাতে যেতে পারিনি।প্রায়ই বমি আসছে। তাই শুয়ে শুয়ে মোসার্টের ভায়োলিন কনসার্টো শুনছি। প্রকৃত ভায়োলিন কনসার্টো তিনি মাত্র পাঁচটি রচনা করে গেছেন। গায়ে হাত দিয়ে দেখলাম জ্বরে প্রভাতচন্দ্রের দেহ পুড়ে যাচ্ছে। কিন্তু তার খেয়াল নেই। শুয়ে শুয়েই বলতে লাগলেন, পাঁচটাই সালসবুর্গে সৃষ্টি, ১৭৭৫ সালে। পৃথিবীর কেউ বিশ্বাস করবে যে, একজন ঊনিশ বছরের ছেলে এই ভায়োলিন কনসার্টো রচনা করেছেন?
