বোসদা বললেন, বোসো। আমি বসলাম। বললাম, মিসেস পাকড়াশীর জন্যে কোনো স্পেশাল ব্যবস্থা করতে হবে?
না, ও-সবের কিছুই করতে হবে না, বোসদা চিন্তিত হয়ে বললেন। তারপর আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ব্যাপারটা কী? তুমি নিশ্চয়ই জানো। অথচ আমাকে বলোনি। আমি ওঁর মুখের দিকে তাকালাম। বোসদা বললেন, করবী এবং অনিন্দ্যর কথা জিজ্ঞাসা করছি। এরা এতদূর এগোবার সময় পেলে কখন?
মানে? আমি প্রশ্ন করলাম।
তুমি নিশ্চয়ই সব দেখেছ, সুতরাং তোমার কাছে চেপে রেখে লাভ নেই, অনিন্দ্য করবীকে বিয়ে করতে চায়। শাজাহান হোটেলের দুনম্বর সুইটের হোস্টেসের জন্যে মাধব ইন্ডাস্ট্রিজের প্রিন্স-অফ-ওয়েলস পাগল হয়ে উঠেছে।
কেন জানি না, প্রথমেই আমার মনের মধ্যে আনন্দের শব্দহীন উল্লাস শুরু হয়ে গিয়েছিল। অনিন্দ্য এবং করবী! মন্দ কী? সংসারের সব উত্তাপ থেকে করবী নিশ্চয় অনিন্দ্যকে রক্ষা করবেন। আর অনিন্দ্য যদি করবীর শুষ্ক মনের মরুভূমিতে জল সিঞ্চন করে ফসল ফলাতে পারে, তা হলে আমাদের পরিচিত পৃথিবী আরও সুন্দর হয়ে উঠবে।
বোসদা বললেন, বিপদ হলো আমাদের। এমন ফ্যাসাদে কখনও পড়িনি। মিসেস পাকড়াশীর ধারণা অনিন্দ্যকে ব্ল্যাকমেল করার চেষ্টা করছে করবী। তার ছেলেমানুষি, তার সরল নিস্পাপ মনের সুযোগ নিয়ে হয়তো মুহূর্তের কোনো অধঃপতন ঘটিয়েছে এবং এবার সে তা চড়া দামে ভাঙাতে চাইছে।
আমি প্রশ্ন করলাম, এর মধ্যে আমরা আসছি কী করে?
মিসেস পাকড়াশী আমাদের স্নেহ করেন। যে কারণেই হোক এই হোটেলের উপর তাঁর দুর্বলতা আছে। তাছাড়া এখন বিপদে পড়ে এসেছেন। বিপদে পড়লে পরম শত্রুকেও সাহায্য করতে হয়।
সাহায্য? আমি বোসদাকে প্রশ্ন করলাম।
উনি অনুরোধ করছিলেন, আমরা যদি কেউ করবীর সঙ্গে কথা বলি। আমি বলেছি, সেটা মোটেই শোভন নয়, সম্ভবও নয়। উনি এখন নিজেই করবীর সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন।
আমি চুপ করে রইলাম। বোসদা বললেন, আমি বলে ফেলেছি। এই হোটেলে একমাত্র তোমার সঙ্গেই করবী কথাবার্তা বলেন।
কেন, ন্যাটাহারিবাবু তো রয়েছেন, বয়োজ্যেষ্ঠ লোক। আমি নিজেকে বাঁচাবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ফল হল না।পাগল হয়েছ? বোসদা বললেন। ব্যাপারটা তুমি, আমি, মিসেস পাকড়াশী এবং করবী ছাড়া পৃথিবীর আর কেউ যেন না জানতে পারে।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমাকে রাজি হতে হয়েছিল। করবী তখন দুনম্বর সুইটে একলা চুপচাপ বসেছিলেন। তার কোলের উপর একখানা কবিতার বই পড়ে ছিল। পাখির নীড়ের মতো চোখদুটি তুলে বনলতা-সেন-ভঙ্গিতে করবী প্রশ্ন করলেন, এতদিন কোথায় ছিলেন?
হেসে বললাম, কোথায় আর থাকব? শাজাহানের একতলা থেকে ছাদ পর্যন্ত ওঠা-নামা করছি।
করবী বললেন,আমি অনেকদিন পরে একটু শান্তিতে রয়েছি। আমার এখন একজনও অতিথি নেই। পাকড়াশীদের কুপোকাত করতে না পেরে, মনের দুঃখে আগরওয়ালাও এ-দিক মাড়াচ্ছেন না। ফোন করেছিলাম। শুনলাম, ব্লাড-প্রেসার এবং ডায়াবিটিস একই সঙ্গে আক্রমণ করেছে। সুতরাং এখন কয়েকদিন আমি চুপচাপ বসে বসে পরম আনন্দে কবিতা পড়ব, গান গাইব, বাইরে বেড়াতে যাব, যা খুশি তাই করব।
এবার আমাকে নিজের কথায় আসতে হল। আপনার কাছে একটা প্রস্তাব পেশ করব।
প্রস্তাব? করবী দেবী আশ্চর্য হয়ে গেলেন।
হ্যাঁ, কিংবা না করবার স্বাধীনতা আপনার। কিন্তু একটা শর্ত আছে। বিষয়টা কাউকে, এমনকি অনিন্দ্যবাবুকেও বলতে পারবেন না।
অনিন্দ্যর নাম শুনেই করবীর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে উঠল। কোনোরকমে বললেন, আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না, তবে আমি দিব্যি করছি তোমার শর্ত পালন করব।
আমিও তেমন কিছুই জানি না। কিন্তু মিসেস পাকড়াশী আপনার সঙ্গে একবার দেখা করতে চান।
মিসেস পাকড়াশী বলেছিলেন, শাজাহান হোটেলে নয়। অন্য কোথাও ওঁরা দুজন সাক্ষাৎ করবেন। করবী রাজি হননি। হোটেলের বাইরে যেতে তিনি অভ্যস্ত নন, একথা জানিয়ে দিয়েছিলেন। শুনে মিসেস পাকড়াশী টেলিফোনেই খিলখিল করে হেসে উঠেছিলেন। আই সী! এখন আমার বিপদ, তিনি যা বলবেন তাই শুনতে আমি বাধ্য। কিন্তু ব্যাপারটা সে গোপন রাখবে তো?
আপনার প্রতিশ্রুতির কথা মনে আছে তো? করবীকে আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম।
আমরা প্রখ্যাত হোটেলের কুখ্যাত হোস্টেস। মারোয়াড়ির চাকরি করে মা-ভাই-বোনদের প্রতিপালন করি, আমাদের কথার কীই-বা মূল্য থাকতে পারে। করবী দেবী দুঃখিত হয়ে উত্তর দিয়েছিলেন।
মিসেস পাকড়াশীর হোটেলে আসবার সেই দিনটি স্মৃতির পর্দায় আবার যেন দেখতে পাচ্ছি। যে-করবী কত স্বনামধন্যকে অবলীলাক্রমে অভ্যর্থনা জানিয়ে অপরের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করেছেন, তিনি সেদিন কেমন হয়ে গিয়েছিলেন। বললেন, আমার ভাল লাগছে না। কথাবার্তার সময় আপনি থাকবেন।
তা কখনও হয়? আমি বললাম। বরং আমি বাইরে আপনার জন্যে অপেক্ষা করব।
নিজের গাড়িতে নয়, একটা ট্যাক্সিতে চড়ে মাধব ইন্ডাস্ট্রিজের অধিষ্ঠাত্রী দেবী শাজাহান হোটেলে হাজির হয়েছিলেন। ঢোকবার মুখেই, রিপোর্টার মিস্টার বোসের সঙ্গে যে ওঁর দেখা হয়ে যাবে তা তিনি আশা করেননি। মিস্টার বোস বললেন, কী ব্যাপার? পি টি আই-এর খবরে দেখলাম প্যারিসের সমাজসেবা সেমিনারে যাবার কর্মসূচি আপনি শেষ মুহূর্তে পরিবর্তন করলেন?
মিসেস পাকড়াশী মৃদু হাস্য করে উদাসভাবে বললেন, চিন্তা করবেন না মিস্টার বোস। বোম্বাই-এর মিসেস লক্ষ্মীবতী প্যাটেল আমার অনুরোধে শেষ মুহূর্তে ইন্ডিয়ার প্রতিনিধিত্ব করতে রাজি হয়েছেন।
