সিওর? ফোকলা প্রশ্ন করলেন।
আমার এখান থেকেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে করেছিলেন। আমি উত্তর দিলাম।
আই সি। ফোকলা উত্তর দিলেন। আমার যেন মনে হল কেউ বাঙলায় কথা বলছে।
আমি উত্তর দেবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিলাম। কোনোরকমে বললাম, ঠিকই ধরেছেন। প্রথমে আমি কথা বলেছিলাম। ডক্টর রাইটার আমাকেই সংযোগ করে দিতে বললেন। ফোকলা চ্যাটার্জি উত্তর দিলেন, আচ্ছা। . ফোকলা চ্যাটার্জি চলে যেতে আমি আশ্বস্ত হলাম। আর কিছুক্ষণ প্রশ্ন করলেই
আমি কী যে বলে ফেলতাম কে জানে।
বোসদা এবার আমার মুখের দিকে তাকালেন। আমার মুখের ভাব থেকেই তিনি সব বুঝে নিলেন। তিনি জানেন, ডক্টর রাইটার বিকেল থেকে একবারও কাউন্টারে আসেননি। তবু তিনি আমাকে কোনো প্রশ্ন করলেন না! আমি এবার কাউন্টার ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম। ঠিক সেই সময়েই বোসদা খাতার মধ্যে চোখ রেখে আস্তে আস্তে বললেন, হোটেলজগতের গুরুদেবরা লিখে গিয়েছেন—বৎস, তোমার এবং তোমার অতিথির মধ্যে একটা কাউন্টার রয়েছে, একথা সর্বদা মনে রাখবে। নিজের গণ্ডির বাইরে গিয়ে সীতা রাবণের হাতে পড়েছিলেন।
সেই রাত্রে করবীর সঙ্গে দেখা করেছিলাম। ভেবেছিলাম ফোকলা চ্যাটার্জির কথা তাঁকে বলব। কিন্তু পারলাম না। দেখলাম, তিনি চুপচাপ বসে আছেন। আমাকে দেখে বললেন, এতক্ষণে নিশ্চিন্ত হয়েছি। অনিন্দ্যবাবুচলেগিয়েছেন, এবং ওঁরাও ঘুমিয়ে পড়েছেন। এখন আগরওয়ালা এলেও আর কিছু ক্ষতি করতে পারবে না। করবীর কাছেই শুনলাম, অনিন্দ্য এমনভাবে ডেকে পাঠাতে অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। করবী উত্তর দিতে পারেননি। শুধু বলেছিলেন, আপনাকে প্রয়োজন আছে। এঁদের দুজনকে সামলানো আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠত।
আমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে করবী ঘেমে উঠছিলেন।আবার আসবেন উনি কাল সকালে। ওঁকে কিছুতেই ছাড়া হবে না। আমার কেমন ভয় ভয় করছে।
বোসদার সাবধানবাণী তখনও আমার কানে বাজছিল। হোটেলে চাকরি করতে এসে, আমি জড়িয়ে পড়তে রাজি নই। তবু আমাদের চোখের সামনে আগরওয়ালা পাকড়াশীদের সর্বনাশ করবেন তা কিছুতেই সহ্য করতে পারছিলাম না।
আমাদের জানবার কথা নয়। কিন্তু কিছুদিন পরে জানতে পেরেছিলাম, পাকড়াশী বাণিজ্য সাম্রাজ্য বাইরে থেকে যতটা মনে হত ততটা শক্তিশালী ছিল না। এই জার্মান সহযোগিতা না পেলে হয়তো তাদের প্রাসাদের ভিত নড়ে উঠত। করবী তখন আনন্দে চোখের জল ফেলছিলেন। অনিন্দ্য জানে না, কিন্তু তাকে সর্বদা কাছে কাছে রেখে, আগরওয়ালার হাত থেকে তিনি পাকড়াশীদের রক্ষে করতে পেরেছিলেন।
কাগজে সেদিন ছবি বেরিয়েছিল। জার্মান সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতার চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করছেন মাধব পাকড়াশী। তার বাঁদিকে শ্রীঅনিন্দ্য পাকড়াশীকে দেখা যাচ্ছে।
এই ছবিটার দিকে তাকিয়েই করবী আনন্দের অশ্রু বিসর্জন করেছিলেন।
এইখানেই শেষ হতে পারত। শাজাহান হোটেল এবং করবীর জীবন থেকে অনিন্দ্য পাকড়াশী এইখানেই সরে যেতে পারতেন। অন্তত সেইটাই স্বাভাবিক হত। কিন্তু, সবার অলক্ষ্যে আমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যে এমন ঘটনা ঘটবে তা কারুর হিসাবের মধ্যে ছিল না।
আমি কেবল অনিন্দ্যর ব্যবহারে আশ্চর্য হয়েছিলাম। করবীর সজাগ দৃষ্টির বাইরে থাকলে, মাধব ইন্ডাস্ট্রিজের পরিবর্তে যাঁর ছবি কাগজে বের হত তার নাম মিস্টার আগরওয়ালা। কিন্তু কই, অনিন্দ্য তো একবারও মনের সেই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে গেলেন না? আর সব থেকে আশ্চর্যের বিষয়, করবীও সে জন্যে একটুও দুঃখিত হলেন না। ভেবেছিলাম, তিনি হয়তো আমার সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করবেন, অন্তত আমার কাছে মনের দুঃখ প্রকাশ করতে দ্বিধা করবেন না। কিন্তু কই?
আসলে তখনও আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি। বুঝলাম, যেদিন সন্ধের একটু পরেই কালো চশমায় চোখ দুটো ঢেকে, সিল্কের শাড়ি পরে এবং সাদা ভ্যানিটি ব্যাগ হাতে মিসেস পাকড়াশী হোটেলে এসে ঢুকলেন। অনেকদিনতাকে হোটেলে আসতে দেখিনি। হয়তো জার্মান অতিথিদের উপস্থিতির জন্যই তার আসা সম্ভব হয়নি। এখন তারা বিদায় নিয়েছেন। পুত্র অনিন্দ্যকে নিয়ে মাধব পাকড়াশী হয়তো বোম্বাই কিংবা দিল্লিতে রওনা হয়েছেন। আর সৌভাগ্যক্রমে আমাদের এক নম্বর সুইটও খালি রয়েছে।
মিসেস পাকড়াশী কাউন্টারে আমাকে দেখে বোধহয় একটু হতাশ হলেন। বললেন, মিস্টার বোস কোথায়?
ওঁর ডিউটি শেষ হয়েছে। এখন নিজের ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছেন। আমার দ্বারা যদি আপনার কোনো কাজ হয়।
মিসেস পাকড়াশী বললেন, ওঁর সঙ্গেই দেখা করতে চাই।
বোসদাকে ডেকে নিয়ে এলাম। বিছানা থেকে উঠতে উঠতে বোসদা বললেন, কখন ঘর চান জেনে নিলেই পারতে। আমাকে আবার ভোলা কেন? বললাম, আপনার কাস্টমার। আমাদের সঙ্গে লেনদেন করতে চান না।
বোসদাকে দেখেই মিসেস পাকড়াশী কাউন্টার থেকে এগিয়ে এলেন। একটু দূরে দাঁড়িয়ে ওঁরা দুজনে কীসব কথাবার্তা বললেন। তারপর কাউন্টারে ফিরে এসেই আমাকে বললেন, এক নম্বর সুইটের চাবিটা দাও তো।চাবি হাতে করে ওঁরা দুজনেই উপরে উঠে গেলেন।
ঘড়ির কাঁটা ধীরে ধীরে ঘুরে যাচ্ছে, আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি, অথচ ওঁদের দুজনের কারুরই দেখা নেই। প্রায় এক ঘণ্টা পরে মাথায় ঘোমটা টেনে দিয়ে আহত সপিণীর মতো ফোস ফোস করতে করতে মিসেস পাকড়াশী হোটেল থেকে বেরিয়ে গেলেন। উনি চলে যেতেই বেয়ারার হাতে স্লিপ দিয়ে বোসদা আমাকে ডেকে পাঠালেন।
