বোসদা বললেন, ব্যাপার কী মিস্টার চ্যাটার্জি?
ফোকলা বললেন, সে সব পরে বলছি। এখন তেষ্টায় গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে। একটু মাল আনিয়ে দেবার ব্যবস্থা করতে পারেন?
বোসদা বললেন, কেন লজ্জা দিচ্ছেন? জানেনই তো অধমদের হাত-পা বাঁধা, লাউজে ড্রিঙ্ক সার্ভ করবার হুকুম নেই।
এ-শ্লা গভরমেন্ট কবে যে ডকে উঠবে! এই শ্লাদের জন্যেই কি আমরা স্বদেশি করেছিলাম। ক্ষুদিরাম, কানাইলাল, বাঘা যতীন, মাস্টারদা কি এদের জন্যেই প্রাণ দিয়েছিলেন? ফোকলা যন্ত্রণায় মুখ বিকৃত করলেন। বোসদা ঈষৎ হেসে নিজের কাজ করতে লাগলেন। ফোকলা চ্যাটার্জি বললেন, শ্লা মাল বিক্রি হচ্ছে তাতে দোষ নেই, কিন্তু খোলা জায়গায় খাওয়া চলবে না, শিবুঠাকুরের দেশে এ কী আইন রে বাপু। আপনাদের জন্যে সত্যি আমার দুঃখ হয়। ভদ্রলোকের ছেলে, এ-লাইনে এসেছেন, অথচ ভবিষ্যৎ অন্ধকার। এই শুনে রাখুন, ব্যাটাচ্ছেলেরা কোনদিন বলল বলে যে, ল্যাভেটরি ছাড়া অন্য কোথাও ড্রিঙ্ক করা চলবে না।
বোসদা বললেন, আপনাদের সঙ্গে অনেকের তো জানাশোনা আছে, তাদের প্রতিবাদ করতে বলুন না।
ফোকলা বললেন, তাহলেই হয়েছে। সব ব্যাটা মালের সাপোর্টে লুকিয়ে গজগজ করে, কিন্তু পাবলিকলি একটা কথা বলবে না। রাস্তায় সব ব্যাটা ঘোমটা দিয়ে ভাটপাড়ার বিধবা সাজবে। এ-ব্যাটারা এমন, যদি গভরমেন্ট কাল হুকুম দেয় তো এরা ল্যাভেটরিতে বসে বসেও ড্রিঙ্ক করে চলে যাবে, তবু একটি রা কাটবে না। একটি লোক পারত, সে আমার দিদি, মাধব পাকড়াশীর ওয়াইফ। কিন্তু দিদি আমার একদম সেকেলে। ড্রিঙ্ক জিনিসটা মোটেই দেখতে পারে না।
বোসদা বললেন, তাই বুঝি?
ফোকলা বললেন, দিনরাত শুধু মহিলা সমিতি, নিরক্ষরতা দূরীকরণ সমিতি, নৈতিক স্বাস্থ্যরক্ষা সমিতি, আর না হয় পুজো নিয়ে পড়ে রয়েছেন। দিদি যদি একবার বলত, লুকিয়ে মদ খাওয়ার থেকে খোলাখুলি মদ খাওয়া ভাল, তা হলে হয়তো গভরমেন্ট একটু কান দিত।
স্যাটা বোস বললেন, আপনার কষ্ট হচ্ছে, বার-এ চলে যান। ফোকলা বললেন, উপায় নেই, মশায়। এক ভদ্রলোকের জন্যে এখানেই দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।
আমি বললাম, আপনি কি মিস্টার আগরওয়ালার কথা বলছেন? তিনি আপনার জন্যে একটা মেসেজ রেখে গিয়েছেন। ফোকলা বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, ওঁর জন্যেই অপেক্ষা করছি। ফোন করেছিলেন আমাকে, অথচ আমি ছিলাম না। বলেছেন, এখনই যেন শাজাহান হোটেলে চলে আসি। সত্যসুন্দরদা বললেন, মিস্টার আগরওয়ালা মিসেস চাকলাদার-এর ওখানে গিয়েছেন।
মিসেস চাকলাদার। ফোকলা হা হা করে হাসতে লাগলেন।কাঙালকে শাকের ক্ষেত দেখাতে নেই, মশায়। এই শর্মা, দিস ফোকলা চ্যাটার্জিই আপনাদের আগরওয়ালাকে মিসেস চাকলাদারের ওখানে নিয়ে গিয়েছিল। মশাই, গেরস্ত বাড়ি শান্তিতে একটু ড্রিঙ্ক করবার সুযোগ ছিল। আমাদের মতো মাতালদের শান্তিনিকেতন। রেট একটু বেশি। ড্রাই ডে-তে মিনিমাম অ্যাডমিশন চার্জ কুড়ি টাকা। তা এরা লেবুকচলিয়ে কচলিয়ে তেতো করে দেবে। আগরওয়ালারা অন্য দিনেও গেস্ট নিয়ে যেতে শুরু করেছে। দুনিয়ার যত কন্ট্রাক্ট, যত লাইসেন্স, সব একজন চাইলে চলবে কী করে? রোজ রোজ যাচ্ছে, কোনদিন কাগজের লোকদের নজরে পড়ে যাবে। মধুচক্র ফাঁস হয়ে যাবে। ফোকলা চ্যাটার্জি ঘড়ির দিকে তাকালেন। বললেন, চিরকাল শুধু পরের বোঝা বয়ে বেড়ালাম। আমার থু দিয়ে এন্টারটেন করিয়ে কলকাতার কত ব্যাটাছেলে বিজনেসে লাল হয়ে গেল। আমার মশাই লাভের মধ্যে হয়েছে খারাপ লিভার। ফ্রি মাল গিলেছি, আর মাঝে মাঝে দুচারশ টাকা পেয়েছি। ক্যাপিটাল নেই যে। থাকলে দেখিয়ে দিতাম। অ্যাদ্দিনে কত বেকার শিক্ষিত ছেলে ফোকলা গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজে চাকরি পেয়ে যেত।
আমি বললাম, মিস্টার আগরওয়ালা আপনার জন্যে ওখানে অপেক্ষা করবেন।
পেটের ছেলে কিছু পড়ে যাচ্ছে না—একটু দাঁড়াক না। ফোকলা চ্যাটার্জি রেগে গিয়ে বললেন। কপালে হাত দিয়ে কী ভাবলেন। তারপর নিবেদন করলেন, কিছু মনে করবেন না, বেঙ্গলি মেয়েগুলো যে গুন্ ফর নাথিং। মেয়েদের সাহায্য না পেলে কোনো জাত বড় হয় না। আমরা কেন, স্বামী বিবেকানন্দ পর্যন্ত বলে গিয়েছেন, নারীজাতিই আমাদের শক্তির উৎস। কিন্তু বাঙালি মেয়েরা একটুও কষ্ট করবে না। মিস্টার রঙ্গনাথনকে তো মনে আছে। ভদ্দরলোকের হাতে লাখ লাখ টাকার কন্ট্রাক্ট। বেঙ্গল সম্বন্ধে ওঁর বেশ শ্রদ্ধা ছিল। খুব ইচ্ছে ছিল, কোনো বাঙালি মেয়ের সঙ্গে একটু বন্ধুত্ব করেন। সব খরচা দিতে রাজি। তা আপনাকে দুঃখের কথা বলব কী, কাউকে রাজি করাতে পারলাম না। হলও তেমনি, মিসেস কাপুর ওঁর সঙ্গে ফ্রেন্ডশিপ করলেন। যে অর্ডারটা আমরা পেতে পারতাম সেটা মিস্টার কাপুর পেয়ে গেলেন। অথচ কাগজ খুলে দেখুন, শুধু দুঃখ আর দুঃখ।
ফোকলা চ্যাটার্জি নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, যাই, ঘুরে আসি। যেতে গিয়ে হঠাৎ ফোকলা চ্যাটার্জি ঘুরে দাঁড়ালেন। অনিন্দ্যকে দেখেছেন?
বোসদা আমার মুখের দিকে তাকালেন। বললাম, আজ্ঞে, উনি জার্মান অতিথিদের দেখতে এসেছেন।
হুঁ, ফোকলা চ্যাটার্জি বললেন। একটু ইতস্তত করে প্রশ্ন করলেন, আচ্ছা, কিছুক্ষণ আগে এখান থেকে কেউ কি অনিন্দ্যকে ফোন করেছিল?
ফোকলা চ্যাটার্জির চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে আমার কেমন ভয় হতে লাগল। বললাম, হ্যাঁ, ডক্টর রাইটার ফোন করেছিলেন।
