যাঁদের আমি চিনি না, জানি না, তাঁদের জীবননাট্য বিয়োগান্ত না মিলনান্ত, তা নিয়ে আমার চিন্তা নেই। কিন্তু দুনম্বর সুইট? সেখানে এই মুহূর্তে করবীকে কোনো বিয়োগান্ত নাটকের নায়িকা ভাবতে আমার মন অজানা ভয়ে শিউরে উঠল।
প্রভাতচন্দ্র গোমেজ ইশারায় আমাকে ডাকলেন। ওঁর কাছে গিয়ে বললাম, এখনও জেগে রয়েছেন!
প্রভাতচন্দ্র হাসলেন।ঘুম আসে না। রাত্রিটাকে দিনের মতো ব্যবহার করে করে অভ্যাসটা অন্যরকম হয়ে গিয়েছে। ড্রাই-ডের রাত্রিটা তাই তারাদের সঙ্গে ভাব করে কাটিয়ে দিই। বেশ লাগে।
আমি আর একটা টুল নিয়ে তার পাশে বসে পড়লাম। প্রভাতচন্দ্র বললেন, আপনাদের বয়স কম, এখন ঘুমের প্রয়োজন। বয়স বাড়লে আপনাকেও ঘুমের জন্যে সাধ্যসাধনা করতে হবে। আমি নীরবে হাসলাম। বললাম, মিস্টার গোমেজ, আপনি তো এত চিন্তা করেন। রাত্রের নক্ষত্র, ভোরের সোনালি সূর্য তো একান্তে আপনার মনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। বলতে পারেন, আমাদের জীবনে কেন সাসপেন্সের সৃষ্টি হয়েছিল? কেন আমরা অনাগত আশঙ্কায় ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ি?
গোমেজ বললেন, শুনেছি, হিন্দুদের শাস্ত্রে এর উত্তর আছে। কিন্তু আমি অশিক্ষিত খ্রিস্টান বাজনদার, তার খবর রাখি না। আমি আপনাকে গানে উত্তর দিতে পারি। সামান্য ছায়াছবির গান, কিন্তু সেখান থেকেই আমি আমার জীবনদর্শন খুঁজে পেয়েছিলাম–কে সারা সারা।
মানে? আমি প্রশ্ন করলাম।
মানে, গোমেজ এবার মৃদুকণ্ঠে ইংরেজি গান ধরলেন, কে সারা সারা। The future is not ours to see-যা হবার তা হবে। গান শেষ করে গোমেজ বললেন, একজন আমেরিকান ভদ্রলোক এই হোটেলে এসেছিলেন। তিনি আমাকে এই গানের রেকর্ডটা দিয়ে যান। একদিন আপনাকে শুনিয়ে দেব। আমি শিখেছি, ভবিষ্যতের খোঁজ নেওয়া আমাদের কাজ নয়—কে সারা সারা।
গোমজের মুখের দিকে তাকিয়ে আমি সত্যিই আত্মবিশ্বাস ফিরে পেলাম। রাত্রের তারারা যেন গোমজের কণ্ঠের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলছে-কে সারা সারা।
অনিন্দ্য পরের দিন আবার এসেছিলেন। সেদিন ভোরেই তিনি করবীকে একলা পেয়ে বলেছিলেন,যদি আপনি কিছু না মনে করেন, তবে একটি বিশেষ ব্যাপারে আপনার অনুমতি প্রার্থনা করি। করবী বলেছিলেন, আপনাদের বন্ধু মিস্টার আগরওয়ালার আমি হোস্টেস। সুতরাং বলতে গেলে আপনারই স্টাফ আমি। সুতরাং অনুরোধ নয়, হুকুম করুন।
অনিন্দ্য এমন উত্তরের জন্যে প্রস্তুত ছিলেন না। কিন্তু একটু পরেই হেসে বললেন, ও বুঝেছি, আপনি কালকের প্রতিশোধ নিলেন। কিন্তু আমি রাগ করছি না। কালকে এখান থেকে বেরিয়ে গঙ্গার ধারে বেশিক্ষণ বসিনি। সোজা দোকানে চলে গিয়েছিলাম। একলা হোটেলে বন্দি হয়ে থাকেন, তাই ভাবলাম, আমার প্রিয় কবিদের বইগুলো হয়তো আপনাকে আনন্দ দেবে।
এসব কথা করবীই পরে আমাকে বলেছিলেন। ওঁরা দুজনে যখন কথা বলছিলেন, তখন সেখানে অন্য কেউ ছিল না। করবীরও সাহস বেড়ে গিয়েছিল। বইগুলো হাতে নেবার আগে অনিন্দ্যর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলেছিলেন, আপনার প্রিয় কবি যে আমারও প্রিয় কবি হবে, সেটা কেমন করে ধরে নিলেন অনিন্দ্যবাবু?
অনিন্দ্য হেসে বললেন, এর উত্তর জীবনানন্দ বা সমর সেন কেউ দেননি। কিন্তু আমার পক্ষে এর উত্তর দেওয়া খুবই সহজ। স্পেকুলেশন।ব্যবসাদার লোক আমরা, ফাটকায় সিদ্ধহস্ত।করবী বলেছিলেন, বাংলা সাহিত্যের সেবা করলে আপনি সত্যিই অনেক কাজ করতে পারতেন।
দাঁড়ান, এখন এই জার্মান সায়েবদের সেবা করে মাধব ইন্ডাস্ট্রিজ-এর মঙ্গল করি।অনিন্দ্য হাসতে হাসতে উত্তর দিয়েছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে এও বলেছিলেন, তবে জেনে রাখবেন, চিরকাল আমি এমন থাকব না। এই সব হুজুগ থেকে মুক্তি পেয়ে আমিও একদিন নিজের খুশিমতো কবিতা আর ইতিহাস নিয়ে পড়ে থাকব।
সেদিন সকালেই খবর কাগজের প্রথম পৃষ্ঠায় কলকাতায় জার্মান শিল্প প্রতিনিধি এই শিরোনামের বিশিষ্ট অতিথিদের যে সংবাদ ছাপা হয়েছিল, তাতে মাধব ইন্ডাস্ট্রিজের নামও প্রকাশিত হয়েছিল। মাধব পাকড়াশী শারীরিক অসুস্থতার জন্যে যে দমদম বিমানঘাঁটিতে উপস্থিত থাকতে পারেননি এবং অসুস্থ স্বামীর সেবার জন্য শ্রীমতী পাকড়াশীও যে দমদম পর্যন্ত যেতে পারেননি, তাও খবরের কাগজ পড়ে জানা গেল।
কাগজ পড়তে পড়তে করবী যখন অনিন্দ্যর মুখের দিকে তাকিয়েছিলেন, তখন আমিও সেখানে বসে রয়েছি। করবী দেবীই আমাকে জোর করে সেখানে রেখে দিয়েছিলেন। অনিন্দ্য বললেন, আমি জানি না, ওসব মায়ের নিজের পরিকল্পনা—আমাদের পি-আর-ও সেনকে ডেকে নিজেই প্রেসনোট তৈরি করে দিয়েছেন। বাবা বলেছিলেন, তিনি দমদমে যাবেন। কিন্তু মা বললেন, আমাকে সুযোগ দিতেই হবে। সুতরাং ব্যাপারটা বুঝতেই পারছেন—বাবার অসুস্থ হয়ে পড়া ছাড়া উপায় ছিল না।
করবীর ইচ্ছা ছিল আমি দুনম্বর সুইটের ড্রইং রুমে তার সঙ্গে বসে থাকি। কিন্তু আমার অন্য কাজ আছে। দুনম্বর সুইটে আমার স্পেশাল ডিউটি থাকলেও প্রতিদিনের কাজ থেকে একেবারে ছুটি পাইনি।
কাউন্টারে ফিরে এসে কাজ আরম্ভ করেছি। এমন সময় রিপোর্টার মিস্টার বোসের আবির্ভাব ঘটল। মিস্টার বোস বললেন, কেমন আছেন? আপনার গুরুদেব মিস্টার স্যাটা বোসই বা কোথায়? ওই জার্মান পার্টি সম্বন্ধে কিছু নতুন খবর চাই-ই।
আমি বললাম, মাধব ইন্ডাস্ট্রিজের জনসংযোগ অফিসার নিশ্চয়ই তাদের বিজ্ঞপ্তি যথাসময়ে আপনাদের অফিসে পাঠিয়ে দেবেন।
