সেই বিজ্ঞপ্তির উপর নির্ভর করে কাগজ চালাতে পারলে মালিকরা আর আমাদের মতো রিপোর্টারদের মাইনে দিয়ে রাখতেন না। বনস্পতি নয়, আসল ঘি চাই আমি। এখন সেই নির্ভেজাল খবরের উৎসব কোথায় বলে দিন।
আমি চুপকরে রইলাম। মিস্টার বোস কিন্তু নীরবহলেন না। তিনি যে অনেক খবর রাখেন তা পরের কথা থেকে বুঝলাম। মিস্টার বোস প্রশ্ন করলেন, আপনাদের ডিলাক্স সুইটের মিস গুহ যদি ইচ্ছে করেন আমাকে খবর দিয়ে বড়লোক করে দিতে পারেন।
বললাম, ওঁর ঘরে এখন বাইরের লোক আছে। যদি একটু পরে আসেন। কোনো আপত্তি নেই। আমি ততক্ষণ এসপ্ল্যানেডে রেলের পাবলিসিটি অফিসে একটু ঢুঁ মেরে আসি।
মিস্টার বোস যেতেই করবীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছিলাম।বিখ্যাত হবার এই সুযোগ। সংবাদপত্র প্রতিনিধি আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান। করবী বললেন, ব্যাপারটা ঠিক বুঝছি না, আপনি সুইটে চলে আসুন।
ওখানে অনিন্দ্য তখনও বসে রয়েছেন। আমার কথা শুনে করবী বললেন, হোস্টেসদের সব সময় নেপথ্যে থাকতে হয়। প্রেসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন অনিন্দ্যবাবু।
কাগজের নাম শুনেই অনিন্দ্য একটু ঘাবড়ে গেলেন। বললেন, পি-আর-ওকে সামনে না রেখে বাবা কিংবা মা কেউ কাগজের লোকদের সঙ্গে কথা বলেন না। আমার ভয় লাগছে।
করবী দেবী বললেন, ভয়ের কিছুই নেই। আমি তো থাকব।
মিস্টার বোসকে করবী কিন্তু দুনম্বর সুইটে আসবার অনুমতি দেননি। যে কয়েকজন তোক সোজা দুনম্বর সুইটে এসে ঢুকতে পারেন, তাঁদের সংখ্যা হাতে গোনা যায়। লাউঞ্জের এক কোণে মিস্টার বোসের সঙ্গে ওঁরা দুজন সাক্ষাৎ করেছিলেন। আমাকে ডেকে করবী বলেছিলেন, প্লিজ, আমাদের জন্য একটু চায়ের ব্যবস্থা করুন না।
চায়ের অর্ডার দিয়ে আমি কাউন্টারে ফিরে আসতে আসতে শুনেছিলাম, করবী বলছেন, মিস্টার পাকড়াশী নতুন ইন্ডাস্ট্রিতে আসছেন। বাংলা দেশকে তিনি ভালোবাসেন। এই ভারত-জার্মান শিল্পসহযোগিতার উপর আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ অনেকখানি নির্ভর করছে।
অনিন্দ্য বললেন, আপনারা যদি এই অতিথিদের সম্বন্ধে ভালো করে লেখেন, আমাদের সুবিধা হয়। বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের এই কারখানা চালু হলে আমরা অনেক বেকার যুবককে চাকরি দিতে পারব—সেই সব বেকার যুবক, যাদের দুঃখের কথা আপনারা কাগজে লিখে থাকেন।
যথাসাধ্য সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মিস্টার বোস সেদিন বিদায় নিয়েছিলেন। পরের দিন তিনি সত্যিই তার কথামতো কাজ করেছিলেন। কলকাতার অন্যতম প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক পত্রিকার মাধব ইন্ডাস্ট্রিজের মুখপাত্র শ্রীঅনিন্দ্য পাকড়াশীর সঙ্গে বিশেষ প্রতিনিধির সাক্ষাৎকারের সুদীর্ঘ বিবরণ ডবল কলম শিরোনামায় প্রকাশিত হয়েছিল।
সেই কাগজ হাতে অনিন্দ্য প্রায় লাফাতে লাফাতে শাজাহান হোটেলে এসে হাজির হয়েছিলেন। করবীকে উচ্ছ্বসিতভাবে বলেছিলেন, বাবা এবং মা দুজনেই অবাক হয়ে গিয়েছেন। ওঁরা ভাবছেন, খোকা কী করে এমন পাবলিসিটি করলে। আমি সঙ্গে সঙ্গে চলে এসেছি এখানে। কেন জানেন? যে মহিলার দূরদর্শিতায় এই প্রচার সম্ভব হয়েছে, তাকে।
আপনার ধন্যবাদ জানাতে, তাই তো? করবী অনিন্দ্যর মুখ থেকে কথাটি ছিনিয়ে নিয়ে নিজেই শেষ করে দিলেন।
অনিন্দ্য হেসে বললেন, আমাকে এতই অন্তঃসারশূন্য ভাবছেন কেন? অন্তরের কৃতজ্ঞতা এবং অভিনন্দন জানাবার ইচ্ছে আমাদের হয় না?
করবী চুপ করে গেলেন। অনিন্দ্য জিজ্ঞাসা করলেন, আমার অতিথিরা নিশ্চয় আপনাকে খুবই কষ্ট দিচ্ছে!
মোটেই নয়। আমাকে যে সব দেশি ভি-আই-পিদের সেবা করতে হয়, সে তুলনায় এঁরা ডেমি-গড। বার-এ গিয়ে ড্রিঙ্ক করেন, ক্যাবারে নাচ দেখেন, তারপর নিজেরাই ঘরে এসে শুয়ে পড়েন। নিজের খেয়ালে নিজেরা থাকেন, আমাকে বড় একটা জ্বালাতন করেন না।
অনিন্দ্য বললেন, এখন তাদের দেখছি না কেন?
হল্-এ ব্রেকফাস্ট করছেন। করবী বললেন।
অনিন্দ্য খুশি মেজাজে বললেন, যাক, আমি আর চিন্তা করি না। এ কদিন সব সময় এঁদের কথাই ভাবতে হচ্ছিল। আজ থেকে নরম্যাল হয়ে যাবার চেষ্টা করব। তারপর যেদিন ওঁরা আমাদের সঙ্গে এগ্রিমেন্টে সই করবেন, সেদিন থেকে আমি তো মুক্তবিহঙ্গ।
সারা দিনের কাজ শেষ করে সবেমাত্র নিজের ঘরে এসে চুপচাপ বিছানায় শুয়েছিলাম। এমন সময় দরজায় টোকা মেরে করবী যে আমার ঘরে ঢুকবেন, তা আমার স্বপ্নেরও অগোচর ছিল।
করবী আমার ঘরের চেয়ারে এসে বসলেন। দেখলাম দুশ্চিন্তায় তার মুখ কালো হয়ে উঠেছে। কী ব্যাপার? আমি প্রশ্ন করলাম। আমাকে ডেকে পাঠালেই পারতেন।
করবী তখনও হাঁপাচ্ছেন। না, নিজেই চলে এলাম। আমার ঘরে বসে আপনার সঙ্গে কথা বলা চলত না। আমি কিছু বুঝতে পারছি না। আমার কী করা উচিত বলুন তো?
করবীর দেহ কাঁপছে মনে হল। কোনোরকমে বললেন, সেদিন বুঝতে পারিনি। সন্দেহ হয়েছিল অবশ্য। কিন্তু তখন ভেবেছিলাম, মিস্টার পাকড়াশীর জন্যে মিস্টার আগরওয়ালা আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
করবীর কাছেই শুনলাম, দুনম্বর সুইটের মালিক মিস্টার আগরওয়ালা তাকে ফোনে ডেকেছিলেন। বলেছিলেন, খুবই গোপন—টপ সিক্রেট। রাইটার এবং কুর্টের উপর একটু নজর রাখতে হবে। ওঁদের মনের অবস্থা কেমন বুঝছ?
করবী বলেছিলেন, বিজনেস ব্যাপারে ওঁদের সঙ্গে কথা বলিনি।
বলতে হবে; না-হলে সুন্দরী হোস্টেস রেখে আমার কী লাভ হল? আগরওয়ালা উত্তর দিয়েছিলেন।
