করবী সামান্য হেসে বলেছিলেন, তাহলে এখনই যান। যদি পারেন ছাদে ওঠবার আগে একবার দেখা করে যাবেন।
উইলিয়ম ঘোষ আমার জন্যেই কাউন্টারে দাঁড়িয়ে ছটফট করছিল। আমাকে দেখে বেচারা আশ্বস্ত হল। বেরোবার সময় সে লজ্জিত কণ্ঠে বললে, তোমাকে ধন্যবাদ জানাবার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না।
সে তো বুঝলাম। কিন্তু যার জন্যে ডিউটি করছি তিনি কোথায়?উইলিয়ম কানে কানে বললে, তিনি কিছুতেই আমার সঙ্গে বেরোবেন না। আমার জন্যে গ্র্যান্ডের তলায় অপেক্ষা করবেন। এখান থেকে বেরিয়েই ট্যাক্সি ধরব, তারপর পার্ক স্ট্রিটে যাবার পথে তাঁকে তুলে নেব।
আমি বললাম, অতি উত্তম পরিকল্পনা।
হাতমুখ ধুয়ে হোটেল থেকে বেরিয়ে যাবার পথে উইলিয়ম আর একবার কাউন্টারে এসে দাঁড়াল। আমাকে চুপি চুপি বললে, একটা রিকোয়েস্ট-কেউ যেন ঘুণাক্ষরে না জানতে পারে। একবার যদি ব্যাপারটা জিমির কানে ওঠে, তা হলে কী হবে তা নিশ্চয় বুঝতে পারছ।আমি ঘাড় নেড়ে বললাম, সব জানি। এখন আমি তোমার জন্যে একটি আনন্দময় সন্ধ্যা কামনা করছি।
প্রতি কাজেরই একটা নেশা থাকে, হোটেলের কাজে তো বটেই। তাতে মেতে গেলে আর কিছুই মনে থাকে না। কাউন্টারে দাঁড়িয়ে শাজাহানের অতিথিস্রোত নিয়ন্ত্রণ করতে করতে ওদের কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। খেয়াল হল যখন দেখলাম, রোজি আমার দিকে একবার আড়চোখে তাকিয়ে সোজা লিফটের ভিতরে ঢুকে গেল। রোজিকে রাত্রের ফ্লোরেসেন্ট আলোয় আজ যেন অন্যরকম দেখাচ্ছিল।
প্রায় আরও পনেরো মিনিট পরে উইলিয়ম ফিরে এল। বললে,হেকাণ্ডারী, অসংখ্য ধন্যবাদ। এবার আমাকে হাল ধরতে দাও।
তোমার এত দেরি? আমি প্রশ্ন করলাম।
রোজি কিছুতেই একসঙ্গে আসতে দিল না। বললে, আমি ঢোকবার পাক্কা সিকি ঘণ্টা পরে তুমি আবার শাজাহান হোটেলে নাক গলাবে। তাই সেন্ট্রাল অ্যাভির ফুটপাতে দাঁড়িয়ে বিনামূল্যে সান্ধ্য বায়ু সেবন করছিলাম।
উইলিয়মকে কাজ বুঝিয়ে দিয়ে আমি আবার করবীর সুইটের সামনে হাজির হলাম। এমন সময়ে ওঁর সুইটে যাবার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু কথা দিয়েছি, হয়তো আমার জন্যেই জেগে বসে রয়েছেন।
টোকা মারতেই করবী মৃদু কণ্ঠে বললেন, আসুন। ঘরের মধ্যে আলো ও অন্ধকারের মরণ-বাঁচন যুদ্ধ যেন এইমাত্র শেষ হয়ে গিয়েছে। সম্মুখসমরে পরাজিত আলো যেন মুমুর্ষ অবস্থায় টেবিলের এক কোণে ধুকছে। ঘরের আর সবটুকু জুড়ে আঁধারের রাজত্ব। আলোর সেই মৃত্যুপথযাত্রী দেহের সামনে চোখে হাত দিয়ে টেবিলের উপর ঝুকে বসে রয়েছেন করবী গুহ।
আমার সঙ্গে কথা বলবার জন্যেই করবী দেবী বোধহয় আস্তে আস্তে মুখ ঘোরালেন। ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে আমি চমকে উঠলাম। এইকঘণ্টায় করবী একেবারে পাল্টে গিয়েছেন। যাকে দুনম্বর সুইটে রেখে আমি উইলিয়ম ঘোষের ডিউটি দিতে গিয়েছিলাম তিনি যেন আর নেই। এ যেন অন্য কেউ।
দুনম্বর সুইটের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত পরিবেশও আমার নাকের ডগায় কয়েক ফেঁটা ঘাম জমে উঠল। করবী কেন এমনভাবে বসে আছেন?
করবী আমাকে বসতে বললেন না। শুধু আমার দিকে একবার তাকালেন। তার চোখটা এবার ঘরের কোণে রাখা টেলিফোনের দিকে ঘুরে গেল। জিজ্ঞাসা করলাম, কিছু বলবেন? বোধহয় তার কিছু বলবার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় চিন্তায় মত পরিবর্তন করলেন। বললেন, না। একবার ভাবছিলাম ওঁকে ফোন করতে বলব। কিন্তু ভাবছি, ফোন না করাই ভাল।
আমি ফিসফিস করে প্রশ্ন করলাম, আপনার অতিথিরা কোথায়?
করবী বললেন, ওঁরা আবার মিসেস চাকলাদারের বাড়িতে যাবার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু মিসেস চাকলাদার ওঁদের নিতে পারলেন না–কয়েকজন হোমরা-চোমরা সরকারি অফিসার এ-বেলায় আগে থেকে ব্যবস্থা করে রেখেছেন। এঁদের দুজনকে মিসেস চাকলাদার তবুও জায়গা করে দিতে পারতেন; কিন্তু কন্ট্রাক্টর মিস্টার কানোরিয়া রাজি হলেন না। উনি তার অতিথিদের কথা দিয়েছেন, মিসেস চাকলাদারের বাড়িতে তারা ছাড়া বাইরের কেউ উপস্থিত থাকবেন না। যা দিন-কাল পড়েছে। কাগজের রিপোর্টাররা যে-ভাবে লোকের পিছনে লাগছে, হয়তো সার্কুলেশন বাড়াবার জন্যে একতক্তা লিখেই দিলে। অফিসাররা তাই আজকাল অনেক সাবধান হয়ে গিয়েছেন। একটু থেমে করবী গুহ বললেন, তোমাকে একটা কথা হয়তো বলতে হবে। কিন্তু এখন নয়। আজকের মতো আমি নিজেই ম্যানেজ করে নিয়েছি।
করবীর মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে। বললাম, আমার তেমন ভালো লাগছে না। যদি আপনার কোনো উপকারে লাগি তা হলে বলতে দ্বিধা করবেন না। কিন্তু করবী কিছু বললেন না!
ছাদের উপরে আমার আপন বিশ্বে ফিরে এসেছি। ইলেকট্রিক আলোটাও আজ গুড়বেড়িয়া নিভিয়ে দিয়েছে। আকাশে আজ সংখ্যাহীন তারার উজ্জ্বল সমারোহ ড্রাই-ডে-র রাত্রে কোনো অরসিক নভঃলোকবাসী যেন আকাশ-হোটেলে ব্যাংকোয়েটের ব্যবস্থা করেছেন।
ড্রাই-ডে-র রাতে হোটেল কর্মচারীরা তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরে ঘুমিয়ে পড়েন। প্রভাতচন্দ্র গোমেজের চোখে কিন্তু ঘুম নেই। একটা টুল নিয়ে নিজের ঘরের সামনে তিনিবসে আছেন। আমার মনটা ভালোনয়।করবী আমাকে বেশ চিন্তিত করে তুলেছেন; এমন রহস্যময় উদ্বেগের মধ্যে রেখে তিনি বিদায় দিলেন কেন?
অবাক লাগছে আমার। দুনম্বর সুইটের রঙ্গমঞ্চে যেন কোনো নাটক অভিনীত হচ্ছে, আরও অনেকের মতো আমিও তার একজন নীরব দর্শক। শাজাহানের ঘরে ঘরে, রাত্রির অন্ধকারে, লোকচক্ষুর অন্তরালে আরও কত নাটক এমনই ভাবে অভিনীত হচ্ছে কে জানে? কে তাদের খবর রাখে?
