অনিন্দ্য ম্লান হেসে বলেছিলেন, এখন বাবার নজর ইলেকট্রিক্যাল এবং মেকানিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে। অনিন্দ্য হয়তো আরও কথা বলতেন। কিন্তু করবী হঠাৎ লাউঞ্জে হাজির হলেন। পাকড়াশীকে বললেন, আপনি বেশ লোক তো। আমি নিজের বেডরুমে একবার ঢুকেছি, আর বলা নেই কওয়া নেই আপনি বেরিয়ে এসেছেন! অপ্রতিভ অনিন্দ্য বললেন, আপনারও তো একটু বিশ্রাম দরকার।
আমার? এই সকাল বেলায়?করবী যেন আশ্চর্য হয়ে গেলেন। বললেন, কষ্ট করে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবার কোনো প্রয়োজন নেই। নিজের ঘর মনে করে সব সময়েই আপনি ওখানে বসে থাকতে পারেন।
অনিন্দ্য এর উত্তরে যা বলেছিলেন, তা যে করবীকে এমনভাবে আঘাত দেবে বুঝতে পারিনি। অনিন্দ্য বলেছিলেন, এইজন্যেই হোস্টেস হিসেবে আপনার এত সুনাম। করবী গম্ভীর হয়ে গিয়েছিলেন। ওঁর টানা টানা চোখ দুটো ধীরে ধীরে ওপরের দিকে তুলে বলেছিলেন,হোস্টেস বলেই বুঝি আপনাকে ভিতরে বসতে বললাম?
অনিন্দ্য বুঝতে পারেননি। কিন্তু আমি ওঁর মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পেরেছিলাম, করবী দুঃখিত হয়েছেন। সওদাগরী প্রতিষ্ঠানের সদাহাস্যময়ী অভ্যর্থনাকারিণী মুহূর্তের জন্যে ভুলে গিয়েছেন যে, তিনি ডিউটিতে রয়েছেন। কিন্তু কাজের কথা মনে পড়তে অন-ডিউটি মেয়েদের বেশিক্ষণ সময় লাগে না। করবী বললেন, আপনার অতিথিরা প্রস্তুত। এঁদের নিয়ে এখন নিশ্চয়ই বেরোচ্ছেন। কিন্তু লাঞ্চের সময় ফিরবেন কি?
অনিন্দ্য বলেছিলেন, লাঞ্চের প্রয়োজন নেই। বাবাও ক্লাবে আসবেন, সেখানে নিয়ে যাব।
ওঁরা চলে গেলে বোসদা আমাকে বলেছিলেন, আগেকার দিনে রাজারা আসতেন; এখন বাণিজ্য প্রতিনিধিরা আসেন। খাতির এঁদের রাজাদের থেকেও বেশি। কারণ এঁদের ব্যাগের ভিতর সাত রাজার ধন এক মানিক সেই নো-হাউ আছে।
আমি বোসদার মুখের দিকে তাকাতে, তিনি হাসতে আরম্ভ করলেন। বুঝলে না? হাউ মাউ খাঁউ-এর নো হাউ! আলিবাবার রত্নশালার চাবিকাঠি। গতর আর বুদ্ধি খাটিয়ে এই চাবি তৈরি করে নেবার মতো উদ্যম আমাদের নেই। তাই ধার করে, অন্য লোকের চাবি নিয়ে দরজা খোলবার চেষ্টা করছি আমরা। আমি বোসদার মুখের দিকে আবার তাকালাম। বোসদা বললেন, ভয় নেই। শাজাহান হোটেলের পক্ষে ভালো। সব ঘর বোঝাই হয়ে থাকবে। আমরা আবার রেট বাড়িয়ে দিতে পারব। বেলি-ডান্সারদের পিছনে আরও টাকা ঢালতে পারব।
একটু থেমে বোসদা বলেছিলেন, মনে থাকে যেন, পুলিস রিপোর্টগুলো আজই পাঠিয়ে দিলে ভালো হয়।
বিকেলের দিকে অনিন্দ্য তাঁর অতিথিদের নিয়ে ফিরে এসেছিলেন। কোনো বাড়ি থেকে বোধহয় ওঁদের প্রচুর মদ খাইয়ে এনেছিলেন। ফলে ওঁদের দাঁড়িয়ে বা বসে থাকার মতো অবস্থা ছিল না। ওঁরা টলতে টলতে কোনোরকমে নিজেদের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লেন।
পুলিস রিপোর্টের ফর্মগুলো নিয়ে আলোচনার জন্যে আমিও করবীর সুইটে হাজির হয়েছিলাম।
করবী প্রশ্ন করলেন, কেমন কাজকর্ম হল?অনিন্দ্য বললেন, খুব। এখান থেকে অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে আধ ঘণ্টা পরেই মিসেস চাকলাদারের ফ্ল্যাট। আমি জানতাম না,কলকাতায় এমন অনেক গৃহস্থবাড়ি আছে যা ড্রাই-ডে-তে হঠাৎ বার-এ পরিবর্তিত হয়। সেখান থেকে এঁরা এই উঠলেন। আমি জানতাম না। আমার মামা ফোকলা চ্যাটার্জি খবর দিলেন। উনিই মিসেস চাকলাদারকে ফোনে জানিয়ে দিলেন। উনি আবার অজানা পার্টিকে আপ্যায়ন করেন না।
করবী আর কোনো কথা বললেন না। অনিন্দ্য এবার নিজের মনেই বললেন, আপনাকে বলতে সাহস হচ্ছে না। একটু চা খাওয়াবেন?
আমি বললাম, এতে লজ্জার কী আছে? এখনই বেয়ারাকে দিয়ে আনিয়ে দিচ্ছি। করবী বাধা দিলেন।হোটেলের মধ্যেও যে ঘর থাকে, এবং সেখানে যে ঘরোয়া চা পাওয়া যায় তা আজ প্রমাণ করে দিই।
করবী চা করে অনিন্দ্যকে দিয়েছিলেন। সেই চা শেষ করতে করতে তারা যে অনেক গল্প করেছিলেন, তা আমি পরে শুনেছিলাম। সে-সব আমার শোনবার কথা নয়, কিন্তু একদিন এই নাটকের সবটুকুই আমাকে শুনতে হয়েছিল।
চা-এর শেষেকরবী বলেছিলেন, আপনার অতিথিদের সঙ্গে দেখা করবেন না?
অনিন্দ্য বলেছিলেন, এখন আমি গাড়ি নিয়ে নদীর ধারে চলে যাব। বাবা এবং মা জানবেন, ছেলে সায়েবদের সঙ্গে ঘুরছে। আমি ততক্ষণ দিনের কলকাতা কেমন করে রাতের মোহিনী-মায়া ধারণ করে তাই দেখব। আলোর গয়না পরা এই কলকাতাকে কে যেন সারা দিন সযত্নে বাক্সের মধ্যে লুকিয়ে রাখে। করবী বলেছিলেন, এত গয়নার কথা কোথা থেকে শিখলেন?
কেন, বিয়ে করিনি বলে গয়নার কথা জানব না?
এ সব কথা করবী নিজেই আমাকে বলেছিলেন। আমার শোনবার কথা নয়, কিন্তু তিনি নিজেই বোধহয় কাউকে বলবার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন।
করবী হঠাৎ যেন আনন্দে ঝলমল করছিলেন। গম্ভীর প্রকৃতির মহিলা বলেই তাঁকে জানতাম। কিন্তু এখন তিনি অনেক কথা বলতে চাইছেন। আমাকে বলেছিলেন, বসুন এখনই কোথায় যাবেন?
আমি বলেছিলাম, এখন একবার কাউন্টারে গিয়ে বসতে হবে, উইলিয়ম ঘোষকে কথা দিয়েছি।
উইলিয়মের ডিউটির সময় আপনি বসতে যাবেন কেন?
বিশেষ করে রিকোয়েস্ট করেছে। তাই দু-ঘণ্টা ওর হয়ে ডিউটি দেব কথা দিয়েছি। আমি বললাম।
এর বেশি আমার কিছু বলবার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু করবীর জেরাতে তাও মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল। উইলিয়ম আজ রোজিকে নিয়ে ডিনারে যাচ্ছে। অনেক দিনের সাধ্যসাধনায় এই পরমাশ্চর্য সুযোগ পেয়েছে। শাজাহান হোটেলের দুই কর্মী চৌরঙ্গীর কোনো রেস্তোরাঁয় গিয়ে রাতের ডিনার সেরে আসবে।শাজাহানে ওরা দুজনেই ফ্রি খেতে পারত। তবু বেচারা উইলিয়ম পকেট থেকে পয়সা খরচ করতে রাজি হয়েছে।
