ডক্টর রাইটার বললেন, আমাকে একটা পাইপ দাও। যে-বিষয়ে অভিজ্ঞতা নেই, সে-বিষয়ে তোমাদের কাছ থেকে নো হাউ নিতে আমার মোটেই আপত্তি নেই। মিস্টার কুর্ট বললেন, হে ভারতীয় সুন্দরী, আমরা জার্মান—অত্যন্ত গোঁয়ার। মাথায় যখন খেয়াল চেপেছে তখন আমি ট্রাই করবই।
করবী বললেন, হে বিদেশি পুরুষ, তোমার প্রশংসার জন্যে ধন্যবাদ; কিন্তু তোমার গোঁয়ার্তুমির জন্যে আমার বকুনি রইল।
কুর্ট এবার ভারতীয় প্রথায় ডাব খেতে গিয়ে গণ্ডগোল বাধিয়ে বসলেন। প্রথমে এক ঝলক জল এসে তার জামা-কাপড় ভিজিয়ে দিল। তারপর ভদ্রলোক বিষম খেয়ে কাশতে লাগলেন।করবী তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে কুর্টের হাত থেকে ডাবটা কেড়ে নিলেন। কুর্ট তখন কাশছেন এবং কাশতে কাশতে হাসছেন। করবী বলছেন, আর নয়, অনেক হয়েছে। শেষে হয়তো রটে যাবে, ইন্ডিয়াতে আপনাদের মেরে ফেলবার ফন্দি আঁটা হয়েছিল।
কুর্ট এতক্ষণে সামলে নিয়েছেন। ভিজে জামার দিকে তাকিয়ে তিনি নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। একটু লজ্জিত হয়েই বললেন, মিস গুহ, আমি সত্যিই দুঃখিত। ঘরে ঢুকেই প্রথমে ড্রিঙ্কের জন্যে মাথা গরম করা উচিত হয়নি। ডক্টর রাইটার গম্ভীরভাবে বললেন, তোমার দুর্ব্যবহারের জন্যে ইতিমধ্যেই যথেষ্ট শাস্তি পেয়েছ। হয়তো মিস ওহ আরও শাস্তির ব্যবস্থা করছেন।
সবাই একসঙ্গে হেসে উঠল। এবার কুর্ট এবং রাইটার বিশ্রামের জন্যে নিজেদের ঘরে গিয়ে ঢুকলেন।
ওঁরা চলে যেতেই অনিন্দ্য যেভাবে করবী গুহের দিকে কৃতজ্ঞ নয়নে তাকিয়ে ছিলেন তা আজও আমি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। আমারই সামনে অনিন্দ্য বলেছিলেন, সত্যি, আপনার তুলনা নেই। প্রথমেই আমাদের সম্পর্কটা একেবারে নষ্ট হয়ে যেতে বসেছিল। আপনি কী আশ্চর্যভাবে অবস্থার মোড় ফিরিয়ে দিলেন।
করবী মুহূর্তের জন্য লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠলেন। শাড়ির খুঁটটা আঙুলে জড়াতে জড়াতে বললেন, আপনি কি এখন কিছু খাবেন? ওঁদের তো তৈরি হতে সময় লাগবে। অনিন্দ্য বলেছি, রাজি আছি, এক শর্তে। ওঁরা নিজেদের ঘরে বিশ্রাম করুন। আমরা চলুন মমতাজে গিয়ে কিছু খেয়ে নিই।
করবী একটু লজ্জা পেলেন। কিন্তু জোর করে না বলতে পারলেন না। অনিন্দ্য আমাকে বললেন, আপনিও চলুন। খেতে খেতে আড্ডা দেওয়া যাবে।আমি বলেছিলুম, ধন্যবাদ। কিন্তু এখন আমার কাজ আছে।
অনিন্দ্য হয়তো সরল মনেই আমার কথা বিশ্বাস করতেন। কিন্তু করবী দেবী সব ফাঁস করে দিলেন। বললেন, না, ওঁর খাবার অসুবিধে আছে। হোটেলের কর্মচারী তো। গেস্টদের সঙ্গে একসঙ্গে চেয়ারে বসে খাবে কী?
অনিন্দ্য বললেন, হোটেলের স্টাফ তো কী হয়েছে? উনি তো আমার গেস্ট।
করবী বললেন, তা হয় না। গেস্টদের সঙ্গে অতটা মেশামেশি ম্যানেজমেন্ট পছন্দ করে না।
অনিন্দ্য তাঁর তখনকার ছেলেমানুষি নিয়ে বলেছিলেন, তা কিছুতেই হয় না। আমি এখনই ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলছি।
যে-অনিন্দ্য সেদিন সামান্য একজন হোটেল কর্মচারীর অপমানে বিচলিত হয়ে প্রতিবাদ করতে গিয়েছিলেন, তিনি আজ কোথায় হারিয়ে গিয়েছেন কে জানে! আজ তার বক্তৃতা পড়লে মনে হয়, মানুষ সম্বন্ধে সব শ্রদ্ধা তিনি হারিয়ে ফেলেছেন। তার এখন ধারণা, পৃথিবীর সাধারণ মানুষরা যেন মাধব ইন্ডাস্ট্রিকে ঠকাবার জন্যে সর্বক্ষণ ষড়যন্ত্র করছে। তারা শুধু শিল্পপতিদের কাছে মাইনে নেয়, টিফিন খায়, ওভারটাইম পায়, বোনাস আদায় করে, কিন্তু প্রতিদানে কিছুই দিতে চায় না। গবর্নমেন্টের প্রশ্রয় পেয়ে, এবং ক্যুনিস্টদের উস্কানিতে সমস্ত কান্ট্রি যেন ইন্ডাস্ট্রিকে ধ্বংস করবার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছে।
এই অনিন্দ্যই হোটেলে বসে বসে একদিন করবী এবং আমাকে বই বের করে শুনিয়েছিলেন–
মানুষেরা বারবার পৃথিবীর আয়ুতে জন্মেছে
নব-নব ইতিহাস-সৈকতে ভিড়েছে,
তবুও কোথায় সে অনির্বচনীয়
স্বপ্নের সফলতা-নবনীতা–
শুভ্র মানবিকতার ভোর?
করবী বলেছিলেন, দাঁড়ান, আপনার মাকে টেলিফোন করে বলে দেব। কাজে মন না দিয়ে ছেলে ব্যাগে করে কবিতার বই নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।অনিন্দ্য বলেছিলেন, আপনাকে আমি বাছাই-করা কবিতার বই দিয়ে যাব। তারপর দেখব আপনি কেমন না কবিতার ভক্ত হয়ে ওঠেন।
কাজের অছিলায় আমি বেরিয়ে এসেছি।ওঁরা দুজনে সোজা মমতাজ-এ চলে গিয়েছেন, ব্রেকফাস্টের জন্যে।
ব্রেকফাস্ট শেষ করে ওঁরা দুজন আবার সুইটে ফিরে গিয়েছেন। একটু পরেই অনিন্দ্য বেরিয়ে এসে আমাদের কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়েছেন। বলেছেন, ওঁরা দুজনেই এখন নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছেন। একটু পরে যা হোক করা যাবে। এখন আমাকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সময় কাটাতে হবে।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এর পর কত সময়ই তো অনিন্দ্য নষ্ট করেছেন। আমরা কাউন্টারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাজ করে গিয়েছি, উনি চুপচাপ দেখে গিয়েছেন। মাঝে মাঝে বলেছেন, সত্যি, অদ্ভুত চাকরি আপনাদের। কত রকমের মানুষকে দেখবার সুযোগ পান আপনারা। এখন বুঝছি, ইংরেজি উপন্যাসে হোটেল থাকলে তা কেন সহজে জমে যায়।
সত্যসুন্দরদা বলেছিলেন, মিস্টার পাকড়াশী, একটা নতুন হোটেল করুন না। সম্পূর্ণ ভারতীয় কায়দায় এমন হোটেল, যার কোনো তুলনা থাকবে না। সেখানে ক্যাবারের বদলে দেশি নাচ হবে, ভারতীয় সঙ্গীতের জনপ্রিয় শিল্পীরা অতিথিদের সঙ্গীতে আপ্যায়িত করবেন। বড় বড় শিল্পীদের অনেকেই তো আমাদের হোটেলে এসে ওঠেন, তাদের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি, তারা সাহায্য করতে প্রস্তুত।
