সেদিন ব্রেকফ্রাস্টের একটু আগেই দমদম বিমানঘাঁটি থেকে দুজন বিদেশি অতিথিকে নিয়ে মাধব ইন্ডাস্ট্রিজের বিরাট ক্রাইসলার গাড়ি শাজাহান হোটেলের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল।ডক্টররাইটার এবং মিস্টার কুর্টের আকার বিশাল,এবং গুরুত্ব ততধিক।
করবী আজ মুর্শিদাবাদ সিল্কের একটা শাড়ি পরেছেন। মাথার খোঁপা রজনীগন্ধার গোছায় ভরিয়ে দিয়েছেন। কী সুন্দর দেখাচ্ছিল তাকে। অনেকদিন আগে সরস্বতী পুজোর দিন আমার অলকাদিকে এমনি দেখাত। এমনি সহজ অথচ গম্ভীর বেশে অলকাদি গার্লস কলেজের পূজামণ্ডপে যেতেন।
করবী গুহ আমাদের কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। অতিথিদের দেখে ভারতীয় প্রথায় হাতজোড় করে অভ্যর্থনা জানালেন। অনিন্দ্য আমার ঘাড়ে ওঁদের মালপত্তরের দায়িত্ব চাপিয়ে করবী দেবীকে নিয়ে এগিয়ে গেলেন।
পোর্টারের মাথায় সব মালগুলো চাপিয়ে, আমি যখন দুনম্বর সুইটে এসে হাজির হলাম, তখন চমকে যাবার অবস্থা। দুনম্বর সুইটের মেঝেয় করবী কখন আলপনা এঁকে ফেলেছেন। ওঁরা বলছেন, এ-গুলো কী? অনিন্দ্য বলছেন, আমাদের ট্রাডিশনাল পেন্টিং। সম্মানিত অতিথিদের অভ্যর্থনার জন্যে আমাদের গৃহবধুরা এই আলপনা দিয়ে থাকেন। ডক্টর রাইটার বললেন, বাঃ চমৎকার!তারপর তিনি নিজের ক্যামেরা মেঝের উপর ফোকাস করতে আরম্ভ করলেন। ছবি ভোলা শেষ করে রাইটার বললেন, অ্যামেচার ঘরের মেয়েরা এমন আর্ট ওয়ার্ক করতে পারে। কোনো প্রফেশনাল শিল্পী এগুলো করেননি?
অনিন্দ্য বললেন, মোটেই না। অবশ্য মিস্ গুহকে আপনি একজন ট্যালেন্টেড শিল্পী বলতে পারেন।
মিস্টার কুর্ট জুতোর ডগা নাড়তে নাড়তে বললেন, মে আই হ্যাভ এ গ্লাস অফ বিয়ার?অনিন্দ্য বললেন, নিশ্চয়ই! কিন্তু আমাকে নিতান্ত দুঃখের সঙ্গে মনে করিয়ে দিতে হল, আজ ড্রাই ডে।
হোয়াট? অসন্তুষ্ট মিস্টার কুর্ট প্রশ্ন করলেন।
অনিন্দ্য ব্যাপারটা এতক্ষণে বুঝতে পেরে গিয়েছেন। বললেন, আমি অত্যন্ত দুঃখিত। আপনারা খারাপ দিনে কলকাতায় এসে হাজির হয়েছেন। প্রত্যেক সপ্তাহে একদিন আমাদের এই স্টেটে মদ বিক্রি বন্ধ। সেদিন বার এবং রেস্তোরাঁর ম্যানেজাররা সব স্পিরিচুয়াস লিকার তালাবন্ধ করে রাখেন।
মিস্টার কুর্ট এমন কোনো সংবাদ জীবনে শোনেননি। বললেন, ইউ মিন টু সে, একদিন তোমরা পুরোপুরি ড্রাই! ইচ্ছে করে ইন্ডিয়ার নরম্যাল লাইফ একদিনের জন্যে তোমরা পঙ্গু করে দাও? এবং তুমি বলতে চাও, এইভাবে, এই সব লাস্ট সেঞ্চুরির পচে যাওয়া আইডিয়া নিয়ে তোমাদের কান্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভল্যুশনের সূচনা করবে?
এই অশুভ সূচনায় অনিন্দ্য যে বেশ ঘাবড়ে গেলেন, তা তার মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝলাম। কিন্তু তখন কে জানত, আরও অনেক কিছু বাকি রয়েছে।
অনিন্দ্য তাঁর দেশের সব অপরাধ যেন নিজের মাথায় তুলে নিয়ে বিদেশি অতিথিদের সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন। যেন বাংলা দেশকে তার হুকুমেই সপ্তাহে একদিন ড্রাই করে দেওয়া হয়। মাথা নিচু করে বিরক্ত অতিথির কাছে তিনি ক্ষমা প্রার্থনা করলেন।
ডক্টর রাইটার এবার তার বন্ধুকে একটু শান্ত করবার চেষ্টা করলেন। ইংরেজিতেই বললেন, কলকাতা তবু তো মন্দের ভাললা। ভারতের পশ্চিমে, আরব সাগরের তীরে বোম্বাই বলে একটা শহর আছে, সেখানে প্রত্যেক দিনই শুকনো দিন। শুনেছি, এক বোতল বীয়ারের জন্যেও সেখানে তোমাকে পারমিট নিতে হবে।
মিস্টার কুর্ট এবার হতাশ হয়ে গম্ভীর মুখে বসে রইলেন। করবী এই অবস্থা দেখেই বোধহয় ভিতরে চলে গিয়েছিলেন। আমার মনে হল, অনিন্দ্য যাতে তার সামনে বিব্রত বোধ না করেন সেই জন্যেই তিনি সরে গিয়েছেন। কিন্তু আমার ভুল ভাঙল একটু পরেই। করবী একটা নরম রবারের চটি পরে, বেণী দুলিয়ে আবার ড্রইংরুমে এসে ঢুকে অতিথিদের ভারতীয় প্রথায় নমস্কার করলেন।
ওঁরা দুজনেই অবাক হয়ে করবীর মুখের দিকে তাকালেন। ওঁর পিছনে ইতিমধ্যে বেয়ারা এসে দাঁড়িয়েছে। তার হাতে দুটো ডাব। বিদেশি দুজন জীবনে এমন অদ্ভুত ফল দেখেননি। ডক্টর কুর্ট একটু অবাক হয়ে বললেন, কী জিনিস? করবী হেসে বললেন, নেচার আমাদের জন্যে ইন্ডিয়াতে এই ড্রিঙ্কের ব্যবস্থা করেছেন। ডাব।
ড্যাব! নেভার হার্ড অফ ইট! ডক্টর রাইটার বলে উঠলেন। করবী দুটো ডাব ওঁদের দিকে এগিয়ে বললেন, গ্রিন কোকোনাট কি তোমরা এর আগে দেখোনি? ইন্ডিয়ানরা প্রচুর পরিমাণে এই ডাব খেয়ে থাকে। অনিন্দ্য তার অতিথিদের মুখের ভাবের পরিবর্তন দেখে একটু আশ্বস্ত হলেন।
করবী মোহিনী হাসিতে মুখ ভরিয়ে বললেন, এই ডাব ড্রিঙ্ক করাও একটা আর্ট। ইচ্ছে করলে এর জল গ্লাসে ঢেলে আপনাদের দিতে পারতাম। কিন্তু তা আমি চাই না। আমি চাই, আমাদের গ্রামের লোকেরা যেভাবে ড্রিঙ্ক করে আপনারা সেইভাবে খান।
কুর্ট একটু উৎসাহ বোধ করলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, কীভাবে ড্রিঙ্ক করতে হবে বলো? করবী হাসতে হাসতে বললেন, আমাদের গ্রামের লোকরা এমনভাবে ফুটোতে মুখ রেখে খায় যে, একফোঁটা জল গায়ে বা জামায় পড়ে না। কিন্তু সেটা বেশ শক্ত ব্যাপার।
কুর্ট সঙ্গে সঙ্গে করবীর চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন। ডাব মুখ দিয়ে তিনিও যে খেতে পারেন, তা প্রমাণ করবার জন্যেই যেন ডাবটা এক মিনিটের জন্যে করবীর হাতে দিয়ে নিজের কোট খুলে ফেললেন। করবী এবার বললেন, মিস্টার কুর্ট, যথেষ্ট হয়েছে। এইভাবে খেতে গিয়ে তোমার জামায় দাগ হবে, এবং আমাদের দেশের দুর্নাম হবে। আমি তোমাদের জন্যে স্ট্র পাইপের ব্যবস্থা করে রেখেছি।
