প্রভাতচন্দ্রের কথার মধ্যে এমন এক বিষণ্ণ ঝংকার আছে যা আমার মতো বেসুরো মানুষকেও সহজে আকৃষ্ট করে। প্রভাতচন্দ্র বললেন, তিনি সঙ্গীতের সেক্সপিয়র; তার নাম বীঠোফেন। আমার যদি সামর্থ্য থাকত, আমার যদি তেমন একটা রেকর্ড লাইব্রেরি থাকত, তাহলে আজ এই মুহূর্তে আপনাকে শোনাতাম বীঠোফেনের নাইনথ সিমফনি—the most gigantic instrumental work extant.
আমি বললাম, ঈশ্বরের আশীর্বাদে একদিন আপনার যেন সব হয়।
তার আশীর্বাদ, তাঁর বিচার? প্রভাতচন্দ্র গোমেজ প্রসন্ন হাসিতে মুখ ভরিয়ে ফেললেন। তাহলে হান্ডেল এবং বা কি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন? তাহলে কি বীঠোফেন কালা হয়ে যান? মানব সভ্যতার এই সুদীর্ঘ ইতিহাসে আর একজনও বীঠোফেন সৃষ্টি হয়নি। যদি আপনি পৃথিবীর মধুরতম সিমফনি শুনতে চান তাহলে বীঠোফেন যে নটি রেখে গিয়েছেন তাই আপনাকে শুনতে হবে; যদি আপনার এমন পিয়ানো ফোর্ট সোনাটা শোনবার লোভ থাকে যার কোনো তুলনা নেই, তাহলে বীঠোফেনের বত্রিশটার মধ্যেই একটা পছন্দ করতে হবে। আর স্ট্রিং কোয়ার্টেট? সেখানেও আপনার ভরসা তাঁর সতেরোটি রচনা। আর অতি সাধারণ উপায়ে যদি অসাধারণ শব্দঝংকার সৃষ্টির রহস্য আপনি আবিষ্কার করতে চান, তাহলে ঘরের মধ্যে তালা দিয়ে নির্জনে বসে বসে আপনাকে হান্ডেলের পুজো করতে হবে। একবারে তিনি হয়তো আপনাকে অনুগ্রহ করবেন না। কিন্তু আপনাকে হতাশ হলে চলবে না। ধৈর্য ধরে বসে থাকতে হবে। তারপর একদিন এমনই কোনো অন্ধকার এবং আলোর মিলন মুহূর্তে আপনি বুঝতে পারবেন বীঠোফেন কেন বলেছিলেন–Go and learn of Handel how to achieve great effects with simple means.
প্রভাতচন্দ্র হঠাৎ চুপ করে গেলেন। তার পারিপার্শ্বিককে সম্পূর্ণ ভুলে তিনি আবার পূর্বদিগন্তের দিকে তার জিজ্ঞাসু দৃষ্টিকে সরিয়ে নিলেন। সহজ পথে অসাধারণকে পাবার গোপন মন্ত্রটি যেন ওই আকাশের এক কোণে কোথাও অদৃশ্য কালিতে লেখা রয়েছে।
আমি আর কোনো কথা না বলেই, ঘরে ফিরে এসে তাড়াতাড়ি প্রস্তুত হয়ে নিয়েছি। হোটেলের সবাই তখনও গভীর ঘুমে ড়ুবে রয়েছে। কিন্তু আমার কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। করবী দেবীরও। তিনি এতক্ষণে নিশ্চয়ই বিছানা ছেড়ে উঠে পড়েছেন। মার্কোপোলোর সঙ্গে তার এবং আগরওয়ালার কথা হয়েছে। কদিন আমাকে বিশেষ অতিথিদের জন্যে বিশেষ ডিউটি দিতে হবে।
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমার কিন্তু শুধু প্রভাতচন্দ্রের কথা মনে হচ্ছিল। সহজ পথে মহানকে পাবার জন্যেই যেন আমরা সবাই কাঙালের মতো রাস্তায় পাতা পেতে বসে আছি।
করবী দেবীর ঘরে টোকা মারতেই, তিনি দরজা খুলে দিলেন। তাঁর অতিথিশালা তখন অতিথি অভ্যর্থনার জন্যে প্রায় প্রস্তুত। ঘরের কোণে এবং টেবিলে কেমন সুন্দর ফুলের গুচ্ছ সাজিয়ে দিয়েছেন করবী দেবী। রংয়ের সঙ্গে রং মিলেছে। করবী বললেন, এক এক সময় ভাবি, ইনটিরিয়র ডেকরেটরের কাজ করব। কেমন দেখছেন? বললাম, চমৎকার করবী বললেন, বেচারা ন্যাটাহারিবাবুকে কাল খুব খাটিয়েছি। যে রংয়ের পর্দা এনে দেখান তাই আমার পছন্দ হয় না।
শেষে ন্যাটাহারিবাবু নিবেদন করলেন, মা জননী, যদি অপরাধ না নেন, তা হলে একটা কথা বলি। আমি তো লাটসায়েবের বিছানাও করেছি। রয়েল ফ্যামিলির মেম্বাররা যখন ইন্ডিয়ায় এসেছেন, তখনও বিছানা বালিশের জন্যে এই ন্যাটাহারি ভট্টচায্যিকেই ডাকতে হয়েছে। এই অধমের হাতে তৈরি বিছানাতেই শুয়ে লর্ড রিডিং এমন সুখ পেয়েছিলেন যে, ঘুম থেকে উঠতে এক ঘণ্টা দেরি করেছিলেন। সকালের সমস্ত প্রোগ্রাম একঘণ্টা পিছিয়ে দিতে হয়েছিল। আর এমনই অদৃষ্ট আমার যে, এখন দুটো জার্মান সায়েবের জন্যে ঘর সাজাবার পর্দা পছন্দ করাতে পারছি না। করবী তখন বলেছিলেন, এই সব ব্যবস্থার উপর একজন ভদ্রলোকের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে—খারাপ কিছু ঘটলে তাঁর বাবার কাছে তিনি ছোট হয়ে যাবেন।
ন্যাটাহারিবাবু তখন কান থেকে পেন্সিলটা খুলে বলেছিলেন, ব্যাপার যদি এতই গুরুতর হয়, তাহলে মা জননী একটা কথা বলি। ঘরের পর্দা, টেবিলের কাপড়ের জন্যে মাথা ঘামিয়ে কোনো লাভ নেই। সমস্ত নজরটা বিছানার উপর দিন। ফর্টি ইয়ার লিনেনের কাজ করে যে অভিজ্ঞতা পেয়েছি, তাতে বলছি, বিছানাটা হোটেলের সবচেয়ে ইম্পর্টান্ট আইটেম। বিছানাটা যদি ভালো পায়, খারাপ খাবার হলেও লোকে কিছু বলবে না। বিছানা এমনভাবে করতে হবে, যাতে সবাই ভাবে সে নিজের চেনা বিছানাতেই শুয়ে আছে। দোষ দিতে পারেন না, মা জননী। লাইফের সবচেয়ে ইম্পর্টান্ট সেন্টার এই বিছানা। এই বিছানাতেই আমরা হাসি, এই বিছানাতেই শুয়ে শুয়ে আমরা কাঁদি, এই বিছানাতেই আমাদের জন্ম, এই বিছানাতেই আমাদের মৃত্যু। অথচ মা লক্ষ্মী, আজকালকার আপনারা এ-দিকটা একেবারেই নজর দেন না। ন্যাটাহারি যখন থাকবে না তখন এই হোটেলের যে কী হবে!
ন্যাটাহারিবাবু তারপর তার যত রংয়ের পর্দা আছে, তার এক একটা নমুনা মাথায় করে করবীর ঘরে হাজির হয়েছিলেন। এবং তার মধ্যে থেকেই তিনি একটা পছন্দ করেছেন।কেমন দেখছেন?করবী আমাকে এক কাপ চা দিয়ে আবার প্রশ্ন করলেন। আমার মাথায় তখনও হান্ডেল ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বললাম, সহজ অথচ সুন্দর হয়েছে।করবী হাসলেন।সব সৌন্দর্যের রহস্যই তোওই। এই যে অনিন্দ্য পাকড়াশী। ওঁর জন্যেই বা আমরা দুজনে এত পরিশ্রম করছি কেন? উনি সহজ অথচ সুন্দর বলে, তাই না?
