ঝলমলে টি-শার্ট আর কাঠকয়লা রংয়ের ট্রপিক্যাল ট্রাউজার পরে এবং একটা টেনিস র্যাকেট হাতে নাচাতে নাচাতে অনিন্দ্য পাকড়াশী একটু পরেই নিউ আলিপুর থেকে এসে হাজির হলেন। করবী দেবী অনিন্দ্যকে অভ্যর্থনা জানালেন। বললেন, খাতায় কলমে যদিও সুইট, আসলে এটা হোটেলের একটা উইং। বেশ কয়েকজন গেস্টকে আমি অ্যাকোমোডেট করতে পারি।
অ্যাকোমোডেট নয়, আশ্রয় বলুন। অনিন্দ্য হেসে উত্তর দিলেন। ঘরের ব্যবস্থাগুলো খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে বললেন, বিশ্বাস করবেন, আমি কখনও হোটেলে থাকিনি! মা মোটেই পছন্দ করেন না। এই কবছর তো বোম্বাই ব্রাঞ্চে ছিলাম, তা সহজেই হোটেলে থাকতে পারতাম। মা কিন্তু মাসিমার ওখানে ব্যবস্থা করে দিলেন। মেসোমশাই ওখানকার এজেন্ট। ওঁর আন্ডারেই আমার চাকরি।
অনিন্দ্য ছো্টোছেলের মতো হেসে বললেন, যারা আসছেন এঁরা জার্মানির এক বিরাট কারখানার মালিক। এঁদের সঙ্গে আমাদের আলোচনা চলছে। বাবা সব দায়িত্ব আমার ঘাড়ে চাপিয়ে বসে আছেন। এখন কোথাও পান থেকে চুন খসলে, আমাকেই তার জন্যে দায়ী হতে হবে। সুতরাং কী করি বলুন? এ-সবের আমি কী বুঝি? বাবার কাছে আমার যাতে মুখ রক্ষে হয়, সে ব্যবস্থা আপনাদেরই করতে হবে।
অনিন্দ্য কিছুই দেখলেন না। আমাদের ঘাড়ে সব দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে তিনি নিশ্চিন্ত হলেন। করবী দেবীর রকিং চেয়ারে বসে পড়ে অনিন্দ্য বললেন, সামনের কয়েকটা দিন আমার কাটলে হয়। মা বলেছিলেন, বাবার তখন তেমন অবস্থা ভাল নয়। এক বিলিতি কোম্পানির এজেন্সি পাবার জন্যে বাবাকে নাকি পর পর তিনদিন লাঞ্চ ড্রপ করতে হয়েছিল।আমার ভাগ্যে আবার দেখা যাক কী আছে; কিন্তু লাঞ্চ ড্রপ করতে আমার মোটেই ভাল লাগে না।
করবী গম্ভীরভাবে বললেন, এখন দিনকাল পালটিয়েছে। অনিন্দ্য বললেন, ঠিক বলেছেন। মাকে আমি কথাটা শুনিয়ে রাখব। কাল ভোরে আমি এবোডড্রামে যাব, সেখান থেকে এখানে আসব, ওঁদের সঙ্গে আঠার মতো লেগেও থাকব। তারপর যা-হয় তা হবে।
আমি উত্তর দিলাম, এর পরে আপনার মায়ের আর কিছু বলবার থাকবে। তবে আগে থেকে আপনার বক্তব্যটা জানিয়ে রাখা মন্দ নয়! অনিন্দ্য পাকড়াশী আমার সঙ্গে একমত হতে পারলেন না। বললেন, আমার মাকে আপনি চেনেন না। মা ভাববেন, কাজলের আমার কাজে মন বসেনি। ও-হরি আপনাদের বলাই হয়নি, কাজল আমার ডাক নাম। প্রেসিডেন্সি কলেজে আমার বন্ধুরা আমাকে কাজলা দিদি বলে রাগাত। দেখা হলেই দূর থেকে চিৎকার করত-বাঁশবাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই, মাগো, আমার শোলোক বলা কাজলা দিদি কই। করবী গম্ভীর হয়ে রইলেন। আমি কিন্তু হাসি চেপে রাখতে পারলাম না। প্রশ্ন করলাম, আপনি বুঝি খুব শ্লোক আওড়াতেন?
মোটেই নয়। মাঝে মাঝে শুধু কোটেশন দিতাম। কবিতায় উত্তর দিতে আমার খুব ভালো লাগত। এখন কিন্তু আমি কাঠ হয়ে যাচ্ছি। বাবার হোটেলে থাকা এক জিনিস, কিন্তু বাবার আপিসে চাকরি—রিগারাস ইমপ্রিজমেন্ট। মায়ের ইচ্ছে ছিল, আমি আরও কিছুদিন বাইরে থাকি। বাইরে কাজ করলে ট্রেনিং ভালো হয়, মায়ের ধারণা। না হলে, নিজের পেটের ছেলেকে কে আর বাইরে রাখতে চায়, বলুন। বাবা আগে দুএকবার আমাকে নিয়ে আসবার কথা তুলেছেন, মা মত দেননি। এবার, বাবা প্রায় জোর করলেন। বাবার ধারণা, মাধব ইন্ডাস্ট্রিজের ঘরানা শিখে নেবার সময় এসেছে। বড় বড় ইন্ডাস্ট্রিজের এখন দুটি প্রবল শত্রু জানেন তো। কথাটা কিছু আমার নিজের নয়। আমার বাবা প্রায়ই বলেন—পাবলিক সেকটর আর করোনারি থ্রম্বসিস।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অনিন্দ্য বললেন, এবার উঠি। মায়ের অর্ডার, ক্লাবে গিয়ে একটু টেনিস খেলতে হবে।
আজও মনে পড়ে, সেদিন অনিন্দ্য বিদায় নেবার পর, আমরা দুজন অনেকক্ষণ নির্বাক হয়ে বসেছিলাম। নাম কাজল, কিন্তু আসলে যেন শুভ্র। অনিন্দ্য আমাদের হোটেলের এই অশুচি পরিবেশে যেন স্নিগ্ধশুচিতার পাউডার ছড়িয়ে দিয়ে গেলেন। করবীও চুপ করে থাকতে পারলেন না। আস্তে আস্তে বললেন, চমৎকার। এমন ছেলেকে মিসেস পাকড়াশী কেমন করে যে বছরের পর বছর বাইরে রেখেছিলেন!
ভাবী রাজার মায়ের মতো, ভাবী ম্যানেজিং ডিরেক্টরদের মাকেও অনেক স্বার্থ ত্যাগ করতে হয়। আমি উত্তর দিলাম।
করবী নিজের অজান্তেই বলে উঠলেন, আশা করি তাই যেন হয়।
সেদিন আমি মনে মনে আনন্দিত হয়েছিলাম। যাক, কিছু ভালও দেখলাম। হোটেল মানে তো শুধু খারাপ নয়। এখানে অনেক ভালোও আসে।
পরের দিন ভোরে আমি উঠে পড়েছিলাম। তখন রাতের অন্ধকার কাটেনি। ছাদের উপর নিশ্চল পাথরের মতো একটা লোক তখনও বসেছিলেন। তার নাম প্রভাতচন্দ্র গোমেজ। ওই ভোরবেলাতেই প্রভাতচন্দ্র গোমেজ যে ব্রাহমের প্রদর্শিত পথে কালো তিক্ত কফি নিজে হাতে তৈরি করে পান করেছেন, তা তাঁর পাশে শূন্য কাপটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। এখন ছাদের কোণে ওইভাবে কিসের অপেক্ষায় বসে আছেন কে জানে?
প্রভাতচন্দ্র আমাকে দেখতে পেলেন, ইশারায় কাছে ডাকলেন। বললেন, আমার জীবনে এই একটাই বিলাসিতা আছে। সূর্যের জন্য পূর্বদিগন্তে তাকিয়ে থেকে আমি নুতন চিন্তার খোরাক পাই।
বললাম, আপনার ঠান্ডা লেগে যেতে পারে। শুধু একটা গেঞ্জি পরে বসে আছেন। প্রভাতচন্দ্র গোমেজ আমার কথায় যেন কান দিলেন না। নিজের মনেই বললেন, ঠান্ডা লেগে এখান থেকে আমি বিদায় নিলে পৃথিবী একটুও গরিব হবে না। অনেকদিন আগে একজন মানুষ ঠান্ডাকে অবহেলা করে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। সেদিন কিন্তু পৃথিবী সত্যিই গরিব হয়ে গিয়েছিল। আজও সে ক্ষতি পূরণ হয়নি।
