কফির কাপে চুমুক দিয়ে করবী দেবী বললেন, এক এক সময় খুব মজা লাগে। জানেন, আগরওয়ালা বলে রঙ্গনাথন একটা শাইলক। ব্যাটাচ্ছেলে সব বোঝে। মার্কেটের ওঠা-নামা ওর নামতার মতো মুখস্থ। এই মালটা যে বাজারে অনেক রয়েছে তা রঙ্গনাথন জানে। তাই আগরওয়ালাকে পিষে যত পারে রস বের করে নেবার চেষ্টা করছে। আগরওয়ালা সুবিধে করতে না পেরে, শেষপর্যন্ত হতাশ হয়ে আমার এখানে পাঠিয়েছে।
করবী গুহ এবার শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে নিলেন। বললেন, এই জন্যেই মনে হয় পৃথিবীতে বেচা এবং কেনার হাঙ্গামাটা না থাকলেই ভাল হত।
আমি প্রশ্ন করলাম, মিস্টার রঙ্গনাথন কী বললেন?
রাজি হয়ে গিয়েছেন। আগরওয়ালার সমস্ত স্টকটাই কিনে নেবার ব্যবস্থা হয়ে গেল। রঙ্গনাথন যাবার সময় কী বললেন জানেন? বললেন, ক্যালক্যাটা, বোম্বে এই কারণেই ফ্লারিশ করছে। বিজনেস এই দুই গ্রেট সিটিতে অনেক সাইন্টিফিক লাইনে রান করছে। ক্যালকাটাওয়ালা এবং বোম্বেওয়ালারা জানে কী করে সেল করতে হয়। এখানকার বিজনেসম্যানরা মুদিখানার দোকান থেকে সেলসম্যানশিপ শেখেনি। রঙ্গনাথনের নেশা হয়েছিল।
রঙ্গনাথনকে আউট করবার জন্যে কী ড্রিঙ্ক আনিয়েছিলেন? জন হেগ? আমি কফির কাপে চুমুক দিয়ে প্রশ্ন করলাম।
করবী দেবী হেসে বললেন, রংয়ের সঙ্গে রং মিলিয়ে যেমন আমি লিনেন ব্যবহার করি, তেমনি যেমন লোক তেমন ড্রিঙ্ক সিলেক্ট করবার চেষ্টা করি। ওঁর জন্যে আনিয়েছিলাম ওল্ড স্মাগলার। ওল্ড স্মাগলারের রঙিন নেশায় ভদ্রলোক বোল্ড আউট হয়ে যাননি। কিন্তু টলমল করছিলেন। সেই অবস্থায় বলেছিলেন, মিস্টার আগরওয়ালা, আপনি একটা ইস্কুল খুলুন। এই ক্যালকাটার বহু বিজনেসম্যান সেল করতে জানে না। তাদের সঙ্গে ডিল করতে গেলে আমার ব্লাড প্রেসার বেড়ে যায়, মনে হয় ঠিক যেন আমার ওয়াইফের সঙ্গে ডীল করছি।
রঙ্গনাথন থেকে আমরা মাধব ইন্ডাস্ট্রিজের অতিথিদের কথায় ফিরে এলাম। করবী গৃহ বললেন, অভ্যর্থনার সব ব্যবস্থা হয়ে গিয়েছে। এখন কেবল ফোন করে ঠিক করে নেওয়া। মিস্টার অনিন্দ্য পাকড়াশীকে আপনি চেনেন নাকি?
বললাম, সামান্য পরিচয় আছে।
আগে থেকেই ওঁকে চিনতেন? করবী দেবী প্রশ্ন করলেন।
না, এইখানেই আলাপ হয়েছিল, আমি উত্তর দিলাম।
আচ্ছা। এই হোটেলে? উনি কি এখানে আসেন? কেমন লোকটি বলুন তো?
আমি বললাম, কেন বলুন তো?
করবী দেবী হেসে বললেন, আছে, প্রয়োজন আছে। ওঁর সঙ্গে আমার বিশেষ দরকার। করবী দেবী এবার ওঁর টেলিফোনটা তুলে ধরলেন।
টেলিফোনে আবার অনিন্দ্য পাকড়াশীর খবর পাওয়া গিয়েছিল। পাকড়াশী জুনিয়র আজকাল অনেক কাজ করছেন। মাধব ইন্ডাস্ট্রিজ নামে শিল্প সাম্রাজ্যের সিংহাসনে তাকে একদিন বসতে হবে। তার জন্যে অনেক শিক্ষার প্রয়োজন। শিক্ষা নয়, অগ্নিপরীক্ষা—একদিন অনিন্দ্য পাকড়াশী নিজেই আমাদের বলেছিলেন।
অনিন্দ্য পাকড়াশীকে আপনারা দেখে থাকবেন। দেশের তরুণতম শিল্পপতিদের তিনি একজন। বিভিন্ন ব্যবসায়িক কনফারেন্সের পর ফিনান্সের উত্তাপে অনেকক্ষণ সেদ্ধ করা তার মুখের যে ছবি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়, তা দেখে আমার নিজেরই বিশ্বাস হয় না এই অনিন্দ্য পাকড়াশীই একদিন আমাদের সঙ্গে সরল প্রাণে গল্প করবার জন্যে সুযোগ খুঁজতেন। লুকিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে আসতেন আমাদেরই এই শাজাহান হোটেলে। বলতেন, সিগারেট খাওয়াও আমার বারণ। মা মোটেই পছন্দ করেন না।অনিন্দ্য বলতেন, আমার বাবার তেমন ইচ্ছে ছিল না। বাবা বলেন, ইন্ডাস্ট্রিতে, ট্রেডে, কমার্সে শান্তি নেই। তার ইচ্ছে ছিল, আমি আরও কয়েক বছর স্বাধীনতার আনন্দ উপভোগ করি; ইতিহাস, ভূগোল, সাহিত্যের দেশে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াই। তারপর রুটিনের ঘানিতে একদিন তো বাঁধা পড়তেই হবে। কিন্তু মা রাজি হলেন না।
একটু থেমে পাকড়াশী জুনিয়র বলেছিলেন, জানেন, আমার ছবি আঁকতে এত ভাল লাগে, অথচ একটুও সময় পাই না। গাড়ি করে যেতে যেতে যখন দেখি গড়ের মাঠেসবুজ ঘাসের উপর বসেবসে কোনো শিল্পী ছবি আঁকছে, তখন আমার মনটা উদাস হয়ে ওঠে। এলিয়ট, অডেন আর পাউন্ডের কবিতা পড়া আমার নেশার মতো ছিল। বাংলাও পড়তাম। জীবনানন্দ দাশ, প্রেমেন্দ্র মিত্র, সমর সেন এঁদের কবিতাও আমার খুব ভাল লাগত। সমর সেন পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে আমার খুব দুঃখ হত। আমাদের দেশের লোকরা সত্যিই এত কষ্ট পায়?জানেন, মাকে, একদিন জিজ্ঞাসাও করেছিলাম।মাতখন ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিলেন। মা বললেন, ওঁরা যে কবি। হয়তো জীবনে ওঁদের যথেষ্ট সুখ আছে, শান্তি আছে, তবুও লেখবার সময় চোখের জল ফেলতে হয়। কাব্যের নিয়মই এই। পৃথিবীতে যারা সামান্য একটু সুখে আছে, স্বাচ্ছন্দ্যে আছে, দারিদ্র্যের আদালতে তাদের অভিযুক্ত না করলে, সাধারণ লোক পয়সা দিয়ে ওঁদের কবিতার বই কিনে পড়বে কেন? ওঁদের সঙ্গে যদি আলাপ হয়, দেখবে এঁরা আমাদেরই মতো সাধারণ জীবন যাপন করছেন।
এই অনিন্দ্যকে আমি চিনতাম। আবার আমার থেকে অনেক বেশি চিনতেন শ্ৰীমতী করবী গুহ।
করবী দেবী একদিন বলেছিলেন, ধনীর দুলাল এখনই পান্থশালা পরিদর্শনে আসছেন! বিদেশি অতিথিদের জন্যে ব্যবস্থা ঠিক আছে কি না দেখবেন। নিজেদের খেয়াল চরিতার্থ করবার জন্যে হুকুম দেবেন হিয়া কামাটি হুয়া ফোঁকো, আর হুঁয়া কা মাটি হিঁয়া ফোঁকো। এঁদের কাছে আমাদের শিখতে হবে কেমন করে অতিথি আপ্যায়ন করতে হয়!
