আমার হাতে কাজ ছিল না। আমার ডিউটি শেষ হয়ে গিয়েছে। আট ঘণ্টা ধরে অতিথিদের হাসিমুখে অভ্যর্থনা এবং বিমর্ষ মুখে বিদায় জানিয়েছি। একটা টি-পার্টির ব্যবস্থা করেছি। এমন চা-চক্র আমাদের এখানে লেগেই আছে। আমাদেরও অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। মাইক ঠিক করে দেওয়া, যিনি পার্টি দিচ্ছেন তার পাশে দাঁড়িয়ে থেকে সাহায্য করা, এ-সব আমাদের প্রতিদিনের রুটিন। এবার একটু বিশ্রাম মন্দ লাগবে না। সুতরাং আর কথা না বাড়িয়ে করবী দেবীর সুইটে এসে হাজির হলাম।
করবী দেবীর তখন সান্ধ্যস্নান শেষ হয়ে গিয়েছে। মূল্যবান এবং দুর্লভ ফরাসি সেন্ট দেহে ছড়িয়ে করবী দেবী একটা রকিং চেয়ারে বসেছিলেন, আমাকে দেখেই তার দোদুল্যমান দেহ থমকে দাঁড়াল। ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হল ওঁর বয়স বুঝতে ভুল করেছিলাম। আগে যা ভেবেছি উনি তত বয়সিনী নন। করবী দেবী বললেন, সমস্ত দিনটা আজ যেভাবে গিয়েছে, তা ভাবতে আমার গা বমি বমি করছে।
আমি ওঁর মুখের দিকে তাকালাম। করবী দেবী বললেন, আপনাদের স্বাধীন ভারতবর্ষে কয়েকটা জিনিস খুব বেড়েছে। কন্ট্রাক্ট, কন্ট্রাক্টর, পারচেজ অফিসার, অ্যাকাউন্টস অফিসার—এঁদের জন্যেই যেন পৃথিবী এখনও সূর্যের চতুর্দিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর মিস্টার আগরওয়ালাকেই বা কী বলব। অতিথি নির্বাচনে তার কোনো রুচি নেই। যারা হোটেলের ভিতর দেখেনি কোনোদিন, যারা কোনদিন ড্রিঙ্কের ড শোনেনি, তাদেরও তিনি দুনম্বর সুইটে নেমন্তন্ন করছেন, তাদেরও তিনি বার-এ ঢোকাচ্ছেন।
করবী দেবী এবার রকিং চেয়ার থেকে উঠে পড়ে, কফি তৈরি করবার জন্য হিটারে জল চড়িয়ে দিলেন। সুইচটা অন করে দিয়ে করবী দেবী একবার ড্রেসিং আয়নায় নিজের দেহটাকে যাচাই করে নিলেন। নিজের রাঙানো ঠোঁটটা আয়নাতে একটু খুঁটিয়ে দেখলেন। মাথার খোঁপায় যে রজনীগন্ধা ফুলগুলো সযত্নে সাজানো ছিল সেগুলো অবহেলাভরে খুলে খুলে টেবিলের উপর রাখতে লাগলেন। তারপর দুঃখ করে বললেন, ছুরি কাঁটা ধরতে জানে না, চা কিংবা সুপ খেতে গিয়ে চো চো করে আওয়াজ করে, খাওয়ার শেষে বিশ্রী শব্দ করে ভেঁকুর তোলে, এমন সব লোকদের আগরওয়ালা স্যার স্যার করেন। আশ্চর্য!
আমি কোনো উত্তর না-দিয়ে কফির অপেক্ষায় বসে রইলাম। করবী দেবী বললেন, আবার এক-একজন ম্যানারে দুরস্ত। কিন্তু কি ধাতু দিয়ে যে ভগবান ওঁদের তৈরি করেছেন তা আজও বুঝতে পারি না। আমি গম্ভীরভাবে বললাম, যে-দিন আমরা এই ধাতুর রহস্য বুঝতে পারব, সেদিন শাজাহান হোটেল আমাদের কাছে অসহ্য হয়ে উঠবে। সেদিন হয়তো মিস্টার আগরওয়ালা আপনাকে ধরে রাখতে পারবেন না।
করবী দেবী বললেন, যদি অদৃশ্য কোনো ফুটো দিয়ে দিন কয়েকের জন্য আমার এই ঘরের দিকে নজর রাখেন তবে মানুষ সম্বন্ধে আপনার কিছুই জানতে বাকি থাকবে না। আমার যদি লেখার ক্ষমতা থাকত, তা হলে এতদিন আরও একখানা মহাভারত তৈরি হয়ে যেত।
করবী দেবী বললেন, অথচ ছোটবেলায় ভাবতাম মানুষ কত মহৎ। মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতাম, প্রত্যেক মানুষের মধ্যেইঈশ্বর বিরাজ করছেন। এখন কী ধারণা হয়েছে জানেন? হিটারের সুইচটা বন্ধ করে দিতে দিতে করবী দেবী প্রশ্ন করলেন।
বললাম, আপনি হয়তো ভাবছেন মানুষ খারাপ হয়ে যাচ্ছে।করবী দেবী হেসে ফেললেন।
বললেন, আমার এখন ধারণা প্রত্যেক মানুষের মধ্যে ঈশ্বর থাকুন–থাকুন, একজন ঘাঘু পারচেজ অফিসার নিশ্চয়ই আছেন। তিনি সংসারের সব কিছু পারচেজ দাম না দিয়ে করতে চান। শুধু স্যাম্পেল আর নমুনা ব্যবহার করে করেই জীবনটা কাটিয়ে দেবার বুদ্ধিতে এঁরা অদ্বিতীয়।
করবী দেবী এখনও হাসছেন। কফির কাপে চামচ নাড়তে নাড়তে বললেন, আজ যে ভদ্রলোককে মিস্টার আগরওয়ালা এনেছিলেন, তিনি বেশি কথা বলেন না। মদ খাবার লোভও আছে, অথচ মাতাল হবার ভয় আছে। মদও খেলেন। তারপর এখন অন্য এক হোটেলে ক্যাবারে দেখতে গিয়েছেন, মিস্টার আগরওয়ালা ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। কারণ ভদ্রলোক দক্ষিণদেশ থেকে মাঝে মাঝে আসেন, আর প্রচুর মাল কিনে নিয়ে যান। তা তোমাকে মাল গছাবার জন্য ওঁরা খাওয়াচ্ছেন, খাও, গেস্টরুমে নিয়ে এসেছেন থাক, কিন্তু তাই বলে ভণিতাগুলো! বিশ্বাস করবেন না, ভদ্রলোক ড্রিঙ্কের মধ্যেই একবার জুতো খুলে আহ্নিকটা সেরে নিলেন। মিস্টার আগরওয়ালা তাকে সন্তুষ্ট করবার জন্যে বললেন, মিস্টার রঙ্গনাথন, আপনার কাছে এইটাই শেখবার। যেখানেই থাকুন গড়কে কিছুতেই ভুলতে পারেন না।রঙ্গনাথনের তখন নেশা ধরেছে। আহ্নিকে বসবার আগে পর্যন্ত ক্যাবারে মেয়েদের নাচ সম্বন্ধে খবরাখবর নিচ্ছিলেন। আগরওয়ালার কথা শুনে বললেন, আমার ওয়াইফের ভয়ে অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। ফিয়ারফুল লেডি। সন্ধেবেলায় পুজো না করলে আমাকে খেতে দেবে না ।
রঙ্গনাথনের নাম শুনে আমি একটু অবাক হলাম। মনে পড়ে গেল, মিস্টার ফোকলা চ্যাটার্জি একবার মমতাজ রেস্তোরাঁয় ওর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন। করবী দেবী বললেন, ফোকলার সঙ্গে ওর সম্পর্ক শেষ হয়ে গিয়েছে। মাদ্রাজ থেকে ফিরে এসে মিস্টার রঙ্গনাথন এখন মিস্টার আগরওয়ালার স্কন্ধে ভর করেছেন। মিস্টার আগরওয়ালা আমাকে টেলিফোনে মনে করিয়ে দিলেন রঙ্গনাথন বড় শক্ত বাদাম, কিছুতেই ভাঙতে চায় না। মাঝে মাঝে ওকে শুধু কজার কথা মনে করিয়ে দিতে হবে। এক লক্ষ কজার অর্ডার ওর হাতে রয়েছে। তাছাড়া এই অর্ডারটা বাগাতে পারলে রিপিট অর্ডার আসতে বাধ্য।
