ভদ্রলোক বোধহয় একটু অসন্তুষ্ট হলেন। বললেন, আমাদের কী দোষ মশায়? ঠকে ঠকে আমরা শিখেছি। জেনুইন বেলি-ডান্সার বলে টিকিট কিনে দেখি প্যাকিং বাক্সর মতো চৌকো মেয়ে নাচছে। বডির কোনো মুভমেন্ট নেই। জানেন, একটা জেনুইন বেলি-ডান্সারের পেটের মাল প্রতি মিনিটে কতবার মুভ করে? বোসদা বিরক্ত হয়ে টেলিফোন নামিয়ে রাখলেন। কিন্তু টেলিফোন নামিয়ে রাখলেই মুক্তি পাওয়া যায় না। চোখ বন্ধ করে থেকে বেচারাহরিণ যেমন ভেবেছিল শিকারির হাত থেকে ছাড়া পাবে, আমরাও তেমনি মাঝে মাঝে ভাবি টেলিফোন ছেড়ে দিলেই রক্ষা পাওয়া যাবে।
একটু পরেই আবার টেলিফোনটা বেজে উঠল। বোসদা বললেন, আমি আর ধরছি না, তুমি ম্যানেজ করো। শাজাহান হোটেলে এতদিন চাকরি করে কেমন ওস্তাদ হয়েছ দেখি।
টেলিফোন তুলেই বুঝলাম, সেই পুরনো ভদ্রলোক। কিন্তু আমার ভাগ্য ভাল। উনি বললেন, ব্যাপার কী মশাই? হঠাৎ কথা বলতে বলতে লাইন কেটে গেল। বললাম, ভেরি স্যরি। মাঝে মাঝে কেন যে এমন হয়। ভদ্রলোক বললেন, টেলিফোনে কমপ্লেন করে দিন।
আমি সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা অবলম্বনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বললাম, তা হলে স্যার, আপনি কবে আসছেন?
ভদ্রলোক উত্তর দিলেন, আগামী কালের জন্য দুটো চেয়ার রেখে দিন।
আমি বললাম, আমাদের নতুন নিয়ম স্যার, টেলিফোনে টেবিল রিজার্ভ ফাস্ট উইকে সম্ভব নয়। কাউকে পাঠিয়ে টিকিটটা কাটিয়ে নিয়ে যাবেন।
ভদ্রলোক আমার ইঙ্গিতের অর্থ বুঝলেন। বললেন, হেভি ডিমান্ড বুঝি? তা তো হবেই। জেনুইন বেলি-ডান্সার হলে ক্যালকাটার লোকরা অ্যাপ্রিসিয়েট করবেই।
টেলিফোনটা নামিয়ে রাখতেই বোসদা বললেন, হবে। চেষ্টা করলে এ-লাইনে তুমি টিকে থাকতে পারবে।
আমরা তো চেষ্টা করেও টিকে থাকতে পারছি না। কে বোসদার কথার সূত্র ধরেই মন্তব্য করলেন। চেয়ে দেখি বুশ-শার্টপরা এক ভদ্রলোক। একটা সিগারেট ধরিয়ে ভদ্রলোক হাসছেন।
আরে কী সৌভাগ্য! অনেকদিন অধমদের মনে করেননি, কী ব্যাপার? বোসদা ভদ্রলোককে প্রচুর খাতির করে বললেন।মনে করেও কী হবে? যা কৃপণ মানুষ আপনারা। হাজার সাধ্যসাধনা করেও আপনার হাত দিয়ে জল গলবে না। কিছুতেই মুখ খোলেন না। বোসদার দিকে একটা সিগারেট এগিয়ে দিয়ে ভদ্রলোক বললেন। বোসদা সিগারেটটা ধরাতে ধরাতে বললেন, গরিবকে এবং শাজাহান হোটেলকে যদি মারতে চান, তাহলে মারুন। আপনার যা ইচ্ছে হয় তাই বলুন। তবে একটা কথা অনুগ্রহ করে মনে রাখবেন, এই দাসানুদাস আপনাদের সেবার জন্যে সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে।ভদ্রলোকউফুল্ল হয়ে বললেন, যাক, আপনার শাজাহানী বিনয় ছাড়ুন। কোনো ইন্টারেস্টিং মাল এসেছে নাকি?
আমি একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। কোনো গোপন রহস্য আছে নাকি? কিসের জন্যে বোসদা এত আগ্রহের সঙ্গে কথা বলছেন, লেনদেনই বা কিসের? বোসদা একটু চিন্তা করলেন। তারপর পেন্সিলটা কানে খুঁজে বললেন, না, এখন একটাও ইন্টারেস্টিং কেস নেই। কাল বোধহয় আসছে।
ভদ্রলোক হাসতে হাসতে বললেন, না, মিস্টার বোস, আমি প্রফেশন্যাল লোক। আপনার বেলি-ডালার লায়লা-তে ইন্টারেস্টেড নাই। বোসদা হাসতে হাসতে বললেন, না না, ওসব নয়। আমরা কি আর মানুষ চিনি না? আপনি যাতে ইন্টারেস্টেড, এমন কিছুই কাল আসছেন।
ভদ্রলোক এবার চলে গেলেন। বোসদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, কী, অমন বোকার মতো চেয়ে আছ কেন? ভদ্রলোককে খাতির করবে। উনিও আমার মতো মিস্টার এস বোস। খবরের কাগজের নামকরা রিপোর্টার। মাঝে মাঝে খবরের খোঁজে আসেন। যেমন সুন্দর চেহারা, তেমন সুন্দর ব্যবহার। এখান থেকেই কত খবর জোগাড় করে নিয়ে গিয়েছেন। আমাদের চোখের সামনেই খবরগুলো ঘটেছে অথচ বুঝতে পারিনি। পরের দিন মিস্টার বোসের রিপোর্ট পড়ে অবাক হয়ে গিয়েছি। মিস্টার বোস বলেন, ইন্ডিয়ার আট আনা খবর তো এখন এয়ারপোর্ট এবং হোটেলে তৈরি হচ্ছে। ভদ্রলোক কাল হয়তো আবার আসতে পারেন। যদি আসেন সাহায্য কোরো।
কী সাহায্য করব?আমার মনে ছিল না। কিন্তু দেখলাম সত্যসুন্দরদার মনে আছে। তিনি বললেন, কেন, কালই না পাকড়াশীদের অতিথিরা করবী দেবীর গেস্টরুম এসে হাজির হচ্ছেন!
পাকড়াশীদের অতিথির কথা আবার মনে পড়ে গেল। কলকাতায় তাদের দিনপঞ্জীর বিবরণ করবী দেবীর অনেক আগেই পাঠিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। নতুন আগন্তুকদের আবির্ভাব প্রতীক্ষায় শ্রীমতী করবী গুহ নিশ্চয়ই তার গেস্টহাউস যথাযথভাবে সাজিয়ে ফেলেছেন।
তদন্তের জন্যে টেলিফোনে দুনম্বর সুইটকে ডাকলাম। করবী দেবী টেলিফোনে ধরলেন।কে? শংকরবাবু? বা আপনি তো বেশ লোক। এক ঘর থেকে আর এক ঘরে টেলিফোনে করছেন। তবু আসবেন না।
বললাম, আপনারই তো খবর দেবার কথা ছিল। তা ছাড়া এখন আপনার কোনো অতিথি থাকতে পারেন। করবী দেবী বললেন, কবে যে মুক্তি হবে জানি না।কবে পৃথিবী থেকে বিজনেস ট্রানজাকসন উঠে যাবে বলতে পারেন? বললাম, হঠাৎ এ-সব প্রশ্ন করছেন কেন? বিজনেস ট্রানজাকসন, সাংস্কৃতিক সফর, আন্তর্জাতিক সম্মেলন এ-সব যদি উঠে যায়, তাহলে আমাদের তো আবার পথে দাঁড়াতে হবে।
করবী দেবী বললেন, হয়তো আপনাদের চাকরি থাকবে না। কিন্তু শান্তি পাবেন। আমার দুএকটা অতিথির নমুনা যদি দেখতেন।
আজকাল আমার সাহস বেড়ে গিয়েছে। বললাম, কেন, আপনার তো সিলেকটেড গেস্ট। আমাদের মতো সার্বজনীন পুজোর নৈবেদ্য তো আপনাকে সাজাতে হচ্ছে না। করবী দেবী বললেন, গেস্টরুমে চলে আসুন। তখন আপনার সঙ্গে কথা হবে।
