এই বৃহৎ পৃথিবীর কোন প্রান্তে আজ কনি তার ভাইকে নিয়ে দিন কাটাচ্ছে কে জানে! কোনো প্রখ্যাত হোটেলে এখন নিশ্চয়ই তার স্থান হবে না।
কোনো অবসন্ন সন্ধ্যায় কোনো অখ্যাত পানশালায় চৌরঙ্গীর প্রবাসী পাঠক যদি কোনো বিগতযৌবনা নর্তকীকে কোনো বামনের সঙ্গে নাচতে দেখেন, তবে একবার তাকে জিজ্ঞাসা করবেন তার নাম কনি কি না। যদি সত্যিই সে কনি হয় তবে অনুগ্রহ করে আমাকে একটা চিঠি লিখবেন।
আমি বড় সুখী হব। আমি সত্যিই আনন্দিত হব।
১২. কনি চলে যাওয়ার পর
কনি চলে যাওয়ার পরও শাজাহান হোটেলের দৈনন্দিন জীবনে কোনো পরিবর্তন আসেনি। এই হোটেলে প্রতিদিন যারা আসে এবং চলে যায়, কনি তো তাদেরই একজন। কত মানুষই তো পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে হাজির হচ্ছেন। আগন্তুকরা কদিনই বা থাকেন। কেউ এক সপ্তাহ, কেউ তিনদিন, কেউ বা মাত্র একদিন। কয়েক ঘণ্টা থাকেন এমন অতিথিরও অভাব নেই। একভাবেই চলেছে। ওয়েলকাম এবং ফেয়ারওয়েল, রিসেপশন এবং গুড্রাই, সাদর অভ্যর্থনা ও বিদায় অভিনন্দন যেন গায়ে গায়ে, হাতে হাত দিয়ে জড়াজড়ি করে শাজাহান হোটেলে বসে রয়েছে। আসার মধ্যে তবু সামান্য প্রত্যাশা আছে, কিন্তু যাওয়ার মধ্যে কিছুই নেই। কেউ সেদিকে নজর দেয় না।
বোসদা বলেছেন, গড়ে তিন দিন থাকেন আমাদের অতিথিরা। এঁদের মধ্যে কেউ যদি পনেরো দিন থাকেন তা হলে মনে হয় যেন যুগযুগান্ত ধরে তিনি আমাদের মধ্যে রয়েছেন। আর দুএকজন, যারা এখানেই মাসিক হারে থাকেন, তারা তো আমাদেরই একজন হয়ে যান।
কিন্তু তিনি তো আর অতিথি নন। যাদের জীবন হোটেল অতিথিদের কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে সে তো তাদেরই একজন। সে যদি আমাদেরই দলে হয় তবে তার বিদায় নিশ্চয়ই আমাদের হৃদয়হীন জীবনেও ছাপ রেখে যাবে। কিন্তু কিছুই হয়নি।
বোসদা ছাদে বসে দাড়ি কামাতে কামাতে আমাকে বলেছিলেন, আমরা হোটেলের লোকরা বড় উদাসী। কিন্তু আমাদের থেকেও অনাসক্ত এই বাড়িটা। কনি কেন, কাউকে মনে রাখে না, আমাদেরও মনে রাখবে না, দেখে নিও। এই যে আমরা বছরের পর বছর সুখে-দুঃখে ভোর থেকে গভীর রাত্রি পর্যন্ত নীরবে পান্থশালায় বিলাসী পথিকদের সেবা করে গেলাম, ইতিহাসের এই উদাসী প্রাসাদ তাও মনে রাখবে না। আমরা যখন থাকব না, তখও সে নতুন রং এবং নতুন চুনসুরকির স্নো পাউডার মেখে কলকাতার এই রাজপথে বিদেশিদের মনোরঞ্জনের জন্য আপন মনেই দাঁড়িয়ে থাকবে। একবারও আমাদের কথা মনে পড়বে না।
আমার মনটা বোসদার কথায় কেমন বিষণ্ণ হয়ে উঠেছিল। বোসদা বলেছিলেন, নিজের কথাটাই শুধু ভাবলে চলবে কেন? এই অনুরাগহীন নির্লিপ্ততার আর একটা দিক। এই যে আমরা এখন কাজ করছি, আমাদেরও আগে এমনি করেই তো আরও অনেকে শাজাহান হোটেলের সেবা করে গিয়েছেন। আরও অনেক নিত্যহরিবাবু বালিশ বগলে এক ঘর থেকে আরেক ঘরে ছোটাছুটি করেছেন, আরও অনেক স্যাটা বোস দিনের পর দিন রাতের পর রাত কাউন্টারে দাঁড়িয়ে অতিথিদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের খবরাখবর নিয়েছেন। আরও অনেক কনি তাদের শুভ্র নগ্নদেহের লীলায়িত নৃত্যভঙ্গিতে প্রমোদ-কক্ষকে মোহময় করে তুলেছে, আরও অনেক প্রভাতচন্দ্র গোমেজ তাদের শব্দ-যন্ত্রে নিস্তব্ধ রাত্রিকে মুখর করে তুলেছে। কিন্তু কেউ তাদের মনে রাখেনি। মনে রাখবার কথাও নয়।
ভাবছ কাব্য করছি, তাই না? বোসদা হেসে বলেছিলেন, হবস সায়েব তো তোমাকে অত ভালোবাসেন। পুরনো কলকাতা সম্বন্ধে তো ওঁর অত আগ্রহ, সেকালের সঙ্গে একালের একটা যোগৃসত্ৰ উনিই তো রক্ষে করেছেন, উনিও বলেন-টু-ডে অ্যান্ড টুমরো; আজ আর আগামী কাল; এই নিয়েই আমাদের হোটেল। বিগতযৌবনা ইয়েস্টারডের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। গতকাল সম্বন্ধে আমাদের একটুও মাথাব্যথা নেই।
বোসদা দাড়ি কামানো শেষ করে ব্লেডটা তোয়ালেতে মুছতে মুছতে বলেছিলেন, আমার যে সাহিত্য আসে না। মাতৃভাষায় দখল থাকলে মনের ভাব কত সুন্দরভাবে প্রকাশ করতে পারতাম। সোজা বাংলায় বলতে গেলে আমাদের গুড মর্নিং শুরু হয় টু-ডে দিয়ে। দিনের শেষে রাত্রের অন্ধকারে টু-ডের তলানিটুকু যখন ডাইনিং হল-এ পড়ে থাকে, তখন আমরা টুমরোর জন্যে পরিকল্পনা করতে বসি। টু-ডেটাই যে কখন ইয়েস্টারডে হয়ে জীবনের বোঁটা থেকে ঝরে পড়ে তার খোঁজই রাখি না।
শুধু শাজাহান হোটেলের কর্মচারী কেন, শাজাহানের পৃষ্ঠপোষকরাও ইয়েস্টারডের খবরাখবর নিতে ভালোবাসেন না। খবরের কাগজে নতুন নর্তকী আসছে, তার বিজ্ঞাপন পড়েই তারা আবার খোঁজখবর করতে লাগলেন। কনি যে কোথায় গেল তা কেউ একবার ভুলেও জিজ্ঞাসা করলেন না। এবার মধ্য এশিয়া থেকে আর-এক নর্তকী আসছেন।
আমাদের বিজ্ঞাপন পড়েই ফোন আসতে শুরু করেছে। হ্যালো, শাজাহান হোটেল? হ্যাঁ মশায়, এতদিনে তাহলে আপনাদের সুমতি হল। এতদিনে একটা বেলি-ডান্সার আনাচ্ছেন! আমি বলেছি, হ্যাঁ, আপনারা আনন্দ পাবেন।
ফোনের দিক থেকে উত্তর এসেছে, দেখবেন মশায়, জেনুইন বেলি-ডান্সার তো? যা ভেজালের যুগ পড়েছে, কিছুই বিশ্বাস নেই। আমি ভদ্রলোকের কথার অর্থ বুঝতে পারছিলাম না। পাশেই বোসদা দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি আমার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে নিলেন। বললেন, হ্যাঁ স্যার, এটা শাজাহান হোটেল। এটা কলকাতার সস্তা রেস্তোরাঁনয় যে, রাজাবাজারের জিনিস ইজিপ্সিয়ান বলে চালিয়ে দেব।
