সেদিন কনির মুখেই সুদূর ইংলন্ডের এক মা, ভাই এবং বোনের গল্প শুনেছিলাম। সংসারের কেউ তাদের দেখবার ছিল না। বামন ভাই-ই রেস্তোরাঁয় বয়ের কাজ করেছে। বেঁটে বয় টেবিলের নাগাল পায় না। তাই গেটে কাজ নিতে হয়েছে।বিনয়ে বিগলিত বামনঅতিথিদের স্বাগত সম্ভাষণ জানিয়ে সুইং-ডোরের দরজা খুলে দিয়েছে। অতিথিরা আমোদ পেয়ে হাতে কিছু বকশিস খুঁজে দিয়েছেন। আর এমনি করেই বিধবা মা আর বোনের সংসার চালিয়েছে হ্যারি।
কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই হ্যারি কেমন যেন পাল্টাতে শুরু করেছে। হ্যারি ডিফিকাল্ট হয়ে উঠেছে। মদ খেতে শুরু করেছে। কেউ পারত না। একমাত্র মা ছাড়া, কেউ ওকে সামলাতে পারত না।কত রাত্রে মা ওকে বার থেকে তুলে এনেছেন। কনি লেখাপড়া শেখেনি। তেমন লেখাপড়া শেখবার সুযোগও ছিল না। কিন্তু দাদার কাছে গান শিখেছিল। মেজাজ ভাল থাকলে দাদা গান শেখাত। মাঝে মাঝে রেস্তোরাঁয় মেয়েরা কেমনভাবে নাচে তা দেখিয়েছে। অন্য অনেকে সে নাচ দেখে হা হা করে হেসেছে। কিন্তু কনি কিংবা তার মা কোনোদিন হাসতে পারেননি।
নিজের অজান্তেই কনি একদিন নিজের জন্য নর্তকীর জীবন বেছে নিয়েছে। দাদাকে সে আর চাকরি করতে দেয়নি। বলেছে, তুমি বাড়িতে থাকো। মার সঙ্গে গল্প করো, তাহলেই হবে। হ্যারি রাজি হয়ে গিয়েছে। হাজার হাজার লোকের . যাওয়া আসার পথের ধারে রেস্তোরাঁয় সুইং-ডোরটা ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে তার মোটেই ভাল লাগত না।
মাকে লুকিয়েই হ্যারি কনির কাছে পয়সা চাইত। সেই পয়সা নিয়ে খুব করে মদ গিলত। তারপর মদে চুর হয়ে ভয়ে ভয়ে বাড়ি ফিরে আসত। মা কিছুই বলতেন না। তবু হ্যারি ভয় পেত। মা রাগ করলে, কথা বলা বন্ধ করে দিতেন। কিন্তু গম্ভীরভাবে বাড়ির সব কাজ করে যেতেন। হ্যারি তখন আর চুপ করে থাকতে পারত না। মার হাত ধরে ক্ষমা চাইত। কাঁদতে কাঁদতে বলত, মা, আমি আর কখনও তোমার অবাধ্য হব না।
মা আর নেই। তবু আজও হ্যারি মাকে ভয় করে।কনি চোখের জল মুছতে মুছতে আমাকে বললে। মরবার আগে মা বিছানার পাশে হ্যারি এবং আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। হ্যারিকে বলেছিলেন, তুমি লক্ষ্মী ছেলে হয়ে থাকবে তোকনি যা বলবে তাই শুনবে তো?ছোট্ট ছেলের মতো হ্যারি রাজি হয়েছিল। মা বলেছিলেন, আমি কিন্তু সব দেখতে পাব।মা তারপর আমাকে বলেছিলেন, হ্যারি যদি অবাধ্য হয়, যদি তোর কথামতো না চলে, তা হলে চোখ বন্ধ করে মনে মনে তুই আমার সঙ্গে কথা বলিস।
কনি বললে, আজও যখন ওর সঙ্গে আর পেরে উঠি না, যখন দাদা আমার নেশার ঘোরে পাগল হয়ে ওঠে, তখন ওকে ভয় দেখাই,বলি—মাকে বলে দেব।
আজও মন্ত্রের মতো কাজ হয়। হ্যারি সঙ্গে সঙ্গে ভাল ছেলে হয়ে ওঠে। যেন সে তার জ্ঞান ফিরে পায়। কিন্তু তারপরেই ওর অভিমান হয়। গুম হয়ে বসে থাকে। আমার সঙ্গে কথা বলে না। বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাদতে আরম্ভ করে। তখন দাদাকে আদর করতে আরম্ভ করি। দাদার অভিমান ভাঙাতে আমার অনেক সময় লাগে।বলতে হয়, আমিনা তোমার ছোট বোন? আমি অত বুঝবকী করে? যদি আমার কোনো ভুল হয়ে যায়, তুমিই তো আমাকে বকবে। দরকার হলে, ইউ সুড় বক্স মাই ইয়ারস। দাদা তখন আবার পাল্টে যায়। আমাকে আদর করতে আরম্ভ করে। বলে, ই। দেখি, কে আমার বোনের কান মলে দেয়! কার এতবড় আস্পর্ধা। আমার লক্ষ্মী বোন, আমার সোনা বোন, তোমার চোখ দেখে মনে হচ্ছে তোমার খুব ঘুম পেয়েছে। তুমি এবার ঘুমোতে যাও।
আমি বলি, তুমি না ঘুমোলে, আমি ঘুমোতে যাব না। দাদা হেসে ফেলে। বলে, বেশ বেশ।তারপর আমার দাদা সত্যিই ঘুমিয়ে পড়ে।কনি একটু হাসল।
আর সেই মুহূর্তে কয়েকদিনের আগে গভীর রাত্রে ছাদের উপর কনি এবং ল্যামব্রেটার যে দৃশ্য দেখেছিলাম, তার রহস্য স্বচ্ছ এবং স্পষ্ট হয়ে উঠল।
কনি এতক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়েছে। মাথার চুলগুলো ঠিক করতে করতে সে বললে, হ্যারিকে একলা ফেলে, কোথায় আমি ঘুরে বেড়াই বলো? স্কটল্যান্ডে ওকে রেখে, পৃথিবীর কোথাও গিয়ে আমি শান্তি পাব না। তাই ওকে নাচের সঙ্গী করে নিয়েছি। কিন্তু হ্যারি পারে না। মাঝে মাঝে আমার অবস্থা দেখে সে উন্মাদ হয়ে ওঠে। অথচ বোঝে না, অভিনয় অভিনয়ই। কাঁদতে কাঁদতে কনি বললে, আমার নিজের দাদা, তবুবলবার উপায় নেই। এমন এক প্রফেশনে আমরা জড়িয়ে পড়েছি।
হয়তো আরও কথা হত।কিন্তু ল্যামব্রেটা হঠাৎ কনির ঘরে এসে ঢুকল। তার দিকে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে আমি বেরিয়ে এসেছিলাম।
ল্যামব্রেটার সঙ্গে ছাদে আমার আবার দেখা হয়েছে। নিজের ব্যাগ গোছাতে গোছাতে ছোট্ট ছেলের মতো আমাকে ডেকে ল্যামব্রেটা বলেছে, ওহে ছোকরা, শোনো। হল তো। যেমন আমাদের রাগিয়ে দিলে, এখন মজাটা টের পাচ্ছ তো? আমরা তোমাদের শাহজাহানকে কলা দেখিয়ে চলে যাচ্ছি।ল্যামব্রেটা বলেছিল, মার্ক মাই ওয়ার্ডস। তোমাদের এই পচা শহরে আমরা আর কোনো-দিন ফিরে আসব না।
সত্যিই ওরা কোনোদিন আর কলকাতায় ফিরে আসেনি। কিন্তু কে-ই বা আসে? যৌবনের মরসুমী ফুল হাতে করে কোন পান্থশালার প্রিয়াই আবার ফিরে আসবার সময় পায়? তবু আজও আমার কনির কথা মনে পড়ে যায়। ভোরের আলোয়, দ্বিপ্রহরের নিস্তব্ধতায়, সন্ধ্যার কোলাহলে এবং রাত্রের অন্ধকারে যাকে দেখেছি সে যেন একটা কনি নয়। কনি দি গার্ল, কনি দি মাদার, কনি দি সিস্টার মিলিয়েই যে কনি দিউয়োম্যানের সৃষ্টি, তা ভাবতে আজও আমার কেমন আশ্চর্য লাগে।
