বোসদার সন্দেহ যে অমূলক নয় তা একটু পরে রোজি ফিরে আসতেই বোঝা গেল। রোজি খিলখিল করে হাসতে হাসতে বললে, ফল ফলেছে। স্বয়ং মার্কোপোলো দি ম্যান এবার কনি দি উহোম্যানকে ডেকে পাঠিয়েছেন। আমাকে ঘর থেকে ইনি বের করে দিলেন। আমারই হয়েছে মুশকিল। তোমাদের কাছে দাঁড়ালে, তোমরা বলো ম্যানেজার ডাকছে। ম্যানেজারের কাছে গেলে তিনি বলেন, কাউন্টারে বোসকে হেল্প করোগে যাও। তোমরা কেউ আমাকে পছন্দ করো না।
আমি বললাম, অনেক কাজ হয়েছে, এবার একটু বিশ্রাম নাও।
রোজি বললে, বেশ। কাউন্টারের ভিতরে ঢুকে পড়ে সে ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটা চকোলেট বের করে চুষতে লাগল।
বোসদা বললেন, রোজি, তুমি এত চকোলেট ভালবাসো কেন?
রোজি বললে, আমার গায়ের রং আর চকোলেটের রং এক বলে!
আমি দেখলাম রোজি রেগে উঠছে। বোসদাকে বললাম, আমি হলে যাই।
বোসদা বললেন, হ্যাঁ, যাও। মেয়েটার কী হল দেখা দরকার। হাজার হোক বিদেশ বিভূঁই। আমিও যেতাম। কিন্তু হেভি প্রেসার।
চলে যাও বলা সত্ত্বেও চলে যেতে পারলাম না। কনির ভাগ্যাকাশে যে মেঘ জমা হয়েছে তা কোনদিকে যাবে তা জানবার জন্যে মনটা তখন উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে। বোসদা বোধহয় আমার মনের অবস্থাটা বুঝলেন। খাতা লিখতে লিখতে বললেন, এখন আর চেপে রাখবার কোনো মানে হয় না। ওঁরা ঠিক করেছেন, ল্যামব্রেটাকে নাচতে দেবেন না। কনিকে একাই আসরে হাজির হতে হবে। ল্যামব্রেটার সঙ্গে ওঁদের কোনো কন্ট্রাক্ট নেই। ওকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফেরত পাঠিয়ে দিতে হবে।
চমকে উঠে আমি বোসদার মুখের দিকে তাকালাম। বোসদা কিন্তু মোটেই অবাক হলেন না। কাজ করতে করতেই বললেন, কাউকে দোষ দিতে পারো তুমি। কনিকে দেখবার জন্যেই লোকে পয়সা দিচ্ছে-ল্যামব্রেটার নাচ নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না।
নিজের মনেই লিফটের সামনে এসে দাঁড়িয়েছি। তারপর কী ভেবে লিফটে চড়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে আরম্ভ করেছি।
ড্রাই-ডের সেই বিষণ্ণ মধ্যাহ্নে কনির ঘরে আচমকা অমনভাবে ঢুকে পড়াটা নিশ্চয়ই আমার উচিত হয়নি। ভব্যতার ব্যাকরণে অভ্যস্ত আজকে আমি নিশ্চয়ই তেমন দুঃসাহস দেখাতে পারতাম না। কিন্তু অনভিজ্ঞ আমি সেদিন পেরেছিলাম। কনিকে ম্যানেজমেন্ট কী বলেছে তা জানবার জন্যে মনটা ছটফট করছিল।
আজ আমার কোনো দুঃখ নেই। সেদিন কনির ঘরে হঠাৎ ঢুকে পড়ে আমার কোনো ক্ষতিই হয়নি। বরং লাভ হয়েছিল। প্রচুর লাভ। পৃথিবীর দুর্লভ বিত্তবানদের মধ্যে আমি নিজেকে একজন বলে মনে করি। মানুষের মনের জগতে যারা জগৎ শেঠ, মেডিসি, রথচাইল্ড, নিজাম, টাটা কিংবা বিড়লা হয়ে বসে আছেন, আমি যেন তাদেরই একজন।
ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। চিবুকে হাত দিয়ে পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে কনি বসে আছে। তার পোষমানা চুলগুলো মুখের উপরে এসে পড়েছে। কনি আমাকে দেখেও কোনো কথা বলছে না। যেন রেনেশাঁসযুগের কোনো দক্ষ ভাস্করের প্রস্তরকন্যা এই মৃত্যুমুখর জাদুঘরে কাচের শো-কেসের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে।
আমি সব বুঝতে পারলাম। নিজের বুদ্ধিতে নিজেই অবাক হয়ে গেলাম। এমন বুঝবার ক্ষমতা যদি ইস্কুলে পড়বার সময় থাকত তাহলে এতদিনে আমার জীবনের ইতিহাস হয়তো অন্যভাবে রচিত হত। লেখাপড়া শিখে কোট প্যান্ট পরে বড় চাকরি করতে পারতাম। শাজাহান হোটেলের ত্রিসীমানায় নিশ্চয় আমাকে আজ দেখা যেত না।
বুঝেছি। অথচ কী বলব আমি? বলতে হল না কিছু। কে যেন আমার সঙ্গে পরামর্শ না করেই আমাকে দিয়ে বলিয়ে নিলে, আই অ্যাম স্যরি। বিশ্বাস করা আমি দুঃখিত।
কনি বললে, আমিও যাচ্ছি। হ্যারিকে একলা ফেলে রেখে আমার পক্ষে কিছুই করা সম্ভব নয়। আমি শুধু একটা অনুরোধ করেছি। আই হ্যাঁ আড় ফর ওয়ান ফেভার। হ্যারি যেন এর কিছুই না জানতে পারে। ওকে বলব, আমার সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে। রাগ করে আমিই চুক্তি বাতিল করে দিয়েছি। আমি হোপ, ওরা ওদের কথা রাখবে। ওরা হ্যারির জীবনকে নিশ্চয়ই সর্বনাশের পথে ঠেলে দেবে না।ও চেষ্টা করছে। ও সব শক্তি দিয়ে নিজের খর্বতার ঊর্ধ্বে উঠবার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। বিশ্বাস করো, ও পারছে না। যদি এ-সব কথা ওর কানে যায়, চিরদিনের জন্যে ও হেরে যাবে।
কনি একটু থামল। ওরা ভেবেছে, আমি বোধহয় পাগল হয়ে গিয়েছি। তোমাদের জিমি এমনভাবে হাসল যে, আমার সমস্ত গা রি-রি করে উঠেছিল। ফর এ ডোয়ার! একটা বামনের জন্যে আমি নাকি আমার ভবিষ্যৎ জলাঞ্জলি দিচ্ছি। কিন্তু, ওরা জানে না। ওদের দোষ নেই।
কী বলছে কনি? কনির কথার অর্থ কী? কনির হাতের মধ্যে যে ছোট্ট একটা ফটো ছিল, তা এতক্ষণ আমার নজরে পড়েনি। আমাকে দেখেই কনি বোধহয় আড়াল করে রেখেছিল। এখন কনির আর কোনো লজ্জা নেই। অন্তত আমার কাছে তার কিছুই লুকোবার নেই। আমারই সামনে সে একমনে ছবিটা দেখতে লাগল। আমিও দেখলাম। লবণাম্বুর অপর পারে, সমুদ্র ও পর্বতে ঘেরা স্কটলান্ডের কোনো অখ্যাত শহরতলির কোনো অখ্যাত মহিলার ম্লান ছবি। তার কোলে এক নবজাত শিশু। তার পাশে আর একটি ছেলে। সাত-আট বছর বয়স হবে।
কনি বললে, চিনতে পারো? কেমন করে চিনব আমি? কনি সজল নয়ন বললে, আমার মা। তারপর একটু দ্বিধা করে, কোনোরকমে বললে, হ্যারির মা।
অ্যাঁ!
হ্যাঁ। আমি কোলে রয়েছি।হ্যারি, আমার ব্রাদারহ্যারি, মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তখন? তখন কেউ কি জানত হ্যারি আর বড় হবে না! কনি এবার নিজেকে সংযত রাখতে পারলেনা। কান্নার বন্যা এসেক্যাবারে নর্তকীর রহস্যময় ব্যক্তিত্বকে যেন কোথায় ভাসিয়ে নিয়ে গেল। কনি বললে, হ্যারি বড় হয়নি। কিন্তু আমাদের জন্যে অনেক করেছে।
