আমি গম্ভীরভাবে কাসুন্দের ডায়ালেক্টে বললাম, একটা কথা মনে রাখবেন, আমি শাজাহান হোটেলের কর্মচারী। ভবিষ্যতে আপনি নিশ্চয়ই চান শাজাহান হোটেলের ভিজিটররা এখানে আসুক। এই ভদ্রমহিলা আমাদের সহকর্মী।
কনি আমাদের কথা বুঝতে না পেরে আমার মুখের দিকে তাকালে। আমি ইরেজিতে বললাম, হ্যারির অসুবিধেগুলো ওঁকে বুঝিয়ে দিচ্ছি।কনি বললে, থ্যাংক ইউ। তোমাকে কী করে যে ধন্যবাদ দেব জানি না।
আমি যে কী ধরনের চীজ তা শিবদাস দি গ্রেট বেশ বুঝে গিয়েছেন। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে, তিনি কথার মোড় ফিরিয়ে বললেন, বামনাবতার যজ্ঞ একালে হয়তো একমাত্র আমিই করতে পারি।
কনিঅধীর হয়ে বললে, তাহলেপ্রভু, আপনি ব্যবস্থা করুন। আমি শাজাহান হোটেলে শো বন্ধ করে দিয়ে আপনার এখানে বসে থাকব। হ্যারিকেও হাতে পায়ে ধরে, কোনোরকমে মত করিয়ে এখানে নিয়ে আসবখন।
আমার দিকে তাকিয়ে কনি বললে, আমাদের তো সাপ্তাহিক কন্ট্রাক্ট। প্রত্যেক সপ্তাহে মেয়াদ বাড়িয়ে নিতে হয়, আমি আর বাড়াব না। তুমি গিয়ে মার্কাপোলোকে বুঝিয়ে বোলো।
শিবদাস দি গ্রেট কিন্তু মাথা নাড়তে লাগলেন। চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, এই যজ্ঞের কিন্তু একটু কুফল আছে। হোমের পর বামন লম্বা হবে, প্রমাণ আকারের মানুষের সঙ্গে তার কোনো তফাতই থাকবে না। কিন্তু…
কনি বলতে যাচ্ছিল, কোনো কিন্তু নয়, হ্যারির জীবনের সব দুঃখ শেষ হবে, সে যদি আর একটু বড় হয়ে উঠতে পারে।
শিবদাস দি গ্রেট এবার আমার দিকে বিষাক্ত দৃষ্টিপাত করলেন, তারপর নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই বললেন, যজ্ঞের পর সে কিন্তু বেশিদিন বাঁচবে না। তার পরমায়ু ক্ষয় করেই তাকে আকারে বড় করে তুলতে হবে, ছমাসের বেশি কাউকে এখনও আমি বাঁচতে দেখিনি।
কনির মুখটা এবার নীল হয়ে উঠল। সে ভয়ে শিউরে উঠল। হ্যারি, মাই ডিয়ার হ্যারি, বাঁচবেনা! হয় না। না না, আমি কিছুই চাইনা!কনি নিজের স্কার্টটা সামলে এবার তড়াং করে শিবদাসের সামনে থেকে উঠে পড়ল।
শিবদাস বললেন, ঈশ্বর যাকে যা করতে চেয়েছেন সে তাই হয়েছে। তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করতে গেলে তিনি কুপিত হন।
কনি মন দিয়ে কথা শুনলে।ঝুঁকে পড়ে ভারতীয় প্রথায় তার পাস্পর্শ করলে।
শিবদাস দি গ্রেট একটা বাক্স খুলে ছোট্ট মাদুলি বার করলেন। সর্ব-শান্তি কবচ। বললেন, এক্সটা-পাওয়ারফুল কবচ। আণবিক শক্তিসম্পন্ন। স্নান করে, খালি পায়ে ধারণ কোরো। আর ধারণের দিনে কারণ পান বা অনাচার নিষেধ।
কনি পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে কবচটা নিয়ে বললে, আমি ড্রিঙ্ক করি না। আরও দশটা টাকা শিবদাস দি গ্রেটের হাতে দিয়ে কনি প্রশ্ন করলে, আমি পরলে,হ্যারি শান্তি পাবে তো?
নিশ্চয়ই পাবে। সেইজন্যই তো এই এক্সট্রা-স্পেশাল কবচ, শিবদাস দি গ্রেট শিকার হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বললেন।
সারা পথকনি গম্ভীর হয়ে রইল। একবার কথা বললে না।হ্যারিকে সুস্থ এবং স্বাভাবিক করে তোলার শেষ আশা সে শিবদাস দি গ্রেটের জ্যোতিষ গবেষণাগারে বিসর্জন দিয়ে এসেছে। একবার শুধু সে বললে, এবার বোধহয় আমি শান্তি পাব। তাই না?
হোটেলে ফিরে এসেই দেখলাম কেমন একটা থমথমে ভাব। সত্যসুন্দরদা একমনে কাউন্টারে কাজ করে যাচ্ছেন।কনিকে তিনি দেখেও দেখলেন না। কনি লিফটে উপরে চলে গেল। আমি সত্যসুন্দরদার কাছে ফিরে এলাম।
রোজিটাও ওখানে বসে টাইপ করছিল। একটা চিঠি টাইপ করা শেষ করে সেটা পড়তে পড়তে রোজি বললে,হ্যালো ম্যান, তাহলে সকালটা খুব ফুর্তিতে কাটালে। জলি গুড় টাইম।
আমি উত্তর দিলাম না। রোজি এগিয়ে এসে আমার কানে কানে বললে, পুওর ফেললা, যতই চেষ্টা করো, কিছুই হবে না। কনির বুকের ভিতর যিনি বসে রয়েছেন তার নাম ল্যামব্রেটা। যদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাও তাহলে তোমাকে অনেক বেঁটে হতে হবে!
বোসদা গম্ভীরভাবে বললেন, রোজি, মিস্টার মার্কোপোলো এই চিঠিগুলো সই করবার জন্যে আধঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছেন।
রোজি বুঝলে, স্যাটা বোসের সামনে আমাকে নাস্তানাবুদ করা যাবে না। সুতরাং সে এবার চিঠিগুলো নিয়ে নাচের ভঙ্গিতে স্কার্ট দুলিয়ে জুতোর খটখট আওয়াজ করে কাউন্টার থেকে বেরিয়ে গেল।
সত্যসুন্দরদা বললেন, তোমরা না বেরোলেই পারতে। হ্যারিটা বেশ বিপদ বাধিয়েছে। শুধু চিৎকার করছে। বেয়ারাদের গালাগালি করেছে। বলেছে, যেখান থেকে পারো মদ নিয়ে এসে দাও। গুড়বেড়িয়া বলেছে, ডেরাই ডে। তাও শোনেনি। শেষ পর্যন্ত চরম বোকামি করেছে। জিমির কাছে গিয়েছে। জিমিটা এই সুযোগের জন্যেই অপেক্ষা করছিল। বলেছে, এখনই ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করো, কিছু ব্যবস্থা হবে।ল্যামব্রেটা বোকার মতো সোজা ম্যানেজারের ঘরে গিয়ে নক করেছে। তারপর বুঝতেই পারছ। কোনো ক্যাবারে গার্ল-এর ডান্সিং পার্টনার যে ম্যানেজারের কাছে গিয়ে হল্লা করতে পারে তা মার্কোপোলো সায়েবের জানাই ছিল না।
বোসদা একটু থামলেন। তারপর বললেন, হয়তো কিছু হত না। এদিকে জিমি খবর এনেছে অন্য হোটেলে দশদিন ফ্লোর-শোর সিট বিক্রি হয়ে গিয়েছে। টিকিটের জন্য মারামারি চলছে। আমাদের অথচ তেমন চাহিদা নেই। কয়েকটা অ্যাডভান্স বুকিং ক্যানসেলও হয়েছে।
তাহলে? আমি বোসদার মুখের দিকে তাকালাম।
যত নষ্টের গোড়া তো ওই বামনটা! কনির একমাত্র দোষ বামনটাকে লাই দিয়ে মাথায় তুলে রেখেছে। জিমি প্রথমে যা সাজেশন দিয়েছিল ম্যানেজার তাতে কান দেননি। এখন আবার অনেক কথা হয়েছে বোধহয়। হয়তো কনিকে এখনই ডেকে পাঠাবেন।
