শিবদাস দি গ্রেট কনির বয়স, কনির হাবভাব, কনির বেশবাস থেকে তার সমস্যা সম্বন্ধে কিছুটা আন্দাজ করবার চেষ্টা করলেন। এ-মেয়ে যে বি-টুইল, হ্যান্ডিকাপ বা ইন্ডিয়ান আয়রন সম্বন্ধে খোঁজ করতে আসেনি তা জ্যোতিষ না জেনেও যে কেউ বলে দিতে পারে। তবু শিবদাস কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে চিন্তা করলেন। সেই অবসরে ব্যাগ থেকে একটা দশ টাকার নোট বার করে কনি তাঁর পায়ের গোড়ায় ভক্তিভরে রেখে দিল।
শিবদাস এবার অর্থপূর্ণ হাসিতে মুখ ভরিয়ে বললেন, কোনো চিন্তা নেই, তোমার মনস্কামনা সিদ্ধ হবে। তোমার মন যা চাইছে তাই পাবে। কনির মুখ এবার একশো ওয়াটের বাতিরমতোউজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে যেন এইটুকু জানবার জন্যেই এতটা পথ ভেঙে এখানে হাজির হয়েছে।
শিবদাস দি গ্রেট কনিকে বললেন,তোমার দুটো হাতই সোজা করে আমার সামনে মেলে ধরো।কনি তাই করলে। শিবদাস সেখানে কিছুক্ষণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, আবার কনির মুখের দিকে ফিরে তাকালেন। তারপর বললেন, তুমি মা, অনেক সহ্য করেছ। কিন্তু তোমাকে আরও সহ্য করতে হবে।
কনি সজল চোখেবললে, আরও?কনি ভুলেই গিয়েছে আমি তার পিছনে দাঁড়িয়ে রয়েছি। জ্যোতিষীর আন্দাজে-ছোড়া ঢিল বোধহয় ঠিক জায়গাতেই আঘাত করেছে। কনি যে অনেক সহ্য করেছে, তা তো আমার নিজের চোখেই দেখেছি। কনি বললে, হ্যারির যদি মঙ্গল হয় আমি আরও অনেক সহ্য করতে রাজি আছি, প্রভু।
শিকার তার ফাঁদে পা দিয়েছে বুঝতে পেরে মহাত্মা শিবদাসের মুখ এবার উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি চোখ বন্ধ করে, স্থূল দেহটাকে আমাদের সামনে ফেলে রেখে সূক্ষ্মশরীরে কনির ভবিষ্যৎ সমীক্ষায় পাড়ি দিলেন। কনি অবাক বিস্ময়ে তার দিকে অপলক নয়নে তাকিয়ে রইল। তার দেহ উত্তেজনায় অধীর হয়ে উঠেছে। তবু মুখ ফুটে কিছু বলবার মতো সাহস নেই।
শিবদাস দি গ্রেট এবার চোখ খুলে মৃদু হেসে বললেন, সব বুঝেছি। তোমার কী চাই, আমার আর জানতে বাকি নেই। কিন্তু তবু সেটা তোমার নিজের মুখেই আমি একবার শুনতে চাই। নিজে আব্দার করে মায়ের কাছে চাইলে মা যে খুশি হন।
কনি যা বলবে তা সে কিছুতেই বলতে পারছে না। তার কণ্ঠস্বর জড়িয়ে আসছে। জনপদের চিত্ত-বিনোদিনী যেন অবগুণ্ঠনবতী বালিকা বধূর সলজ্জ-দ্বিধায় আক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু কনি আজ বলবে। যা না বললেও চলত, তাই সে শিবদাস দি গ্রেটের কাছে প্রকাশ করবে।
কিন্তু কনি যা বলল তার জন্যে আমি কেন স্বয়ং শিবদাস দি গ্রেটও প্রস্তুত ছিলেন না।
কনির ঠোঁটটা একবার কেঁপে উঠল। হয়তো আমি না থাকলে তার পক্ষে আরও সুবিধে হত। আস্তে আস্তে সে বললে, প্রভু, আপনারা ইচ্ছা করলে সব পারেন। আমার যা আছে সব আপনার গডের পুজোর জন্যে আমি হাসিমুখে দিয়ে দেব, আপনি হ্যারিকে একটু লম্বা করে দিন। আমি সুখ, সম্পদ, স্বাচ্ছন্দ্য কিছুই চাই না। শুধু হ্যারি যদি সাধারণ হয়ে উঠতে পারে, তা হলে, আমি ধন্য হব। সে বেঁটে হোক, আমার আপত্তি নেই। কিন্তু লোকে যেন তাকে বামন না বলে।
মানুষের এই সংসারে দেখে দেখে হৃদয় আমার অসাড় হয়ে গিয়েছে দুঃখ, যন্ত্রণা, অপমান, অবজ্ঞা আজ আর আমাকে তেমনভাবে অভিভূত করে না। তবু বলতে লজ্জা নেই, হঠাৎ আমার দেহের সমস্ত ললামগুলো বিষাদের বিচিত্র অনুভূতিতে খাড়া হয়ে উঠল। মন বোধহয় কনিকে এতদিনে বুঝতে পারল। নিঃশব্দ কণ্ঠে আমার অন্তরাত্মা যেন বলে উঠল, ও এই জন্যে! ওরে অবুঝ, বোকা মেয়ে, এইজন্যে তুমি আমাকে নিয়ে এখানে ছুটে এসেছ। আমার সময় নষ্ট করেছ। তা বেশ করেছ। আমি মোটেই অসন্তুষ্ট হইনি। যদিও ছেলেমানুষি, যদিও লোকে শুনলে তোমাকে এবং আমাকে দুজনকেই পাগল বলবে,তবুআমি রাজি আছি, তুমি যেখানে যেতে চাইবে—আমার সব কাজ ফেলে তোমাকে সেখানে নিয়ে যেতে প্রস্তুত আছি।
ভূত-ভবিষ্যৎদ্রষ্টা শিবদাসও তার বিস্ময় চেপে রাখতে পারলেন না। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, মেমসায়েব কী বলছেন?
আমি বললাম, হ্যারি বলে ওঁর এক সঙ্গী আছে সে বামন। তার সঙ্গে…
বলতে হবে না। বুঝে নিয়েছি, শিবদাস বললেন। সেই বামনকে বড় করতে হবে। তাকে টেনে হেঁচড়ে প্রমাণ সাইজের করে দিতে হবে।
হ্যাঁ প্রভু। তার জন্যে আপনি যা চাইবেন, তাই দেব।
এমন সুবর্ণ সুযোগ প্রফেসর শিবদাস দি গ্রেট অনেক দিন পাননি। এমন একটি শিকারকে নিজের হাতের গোড়ায় পেয়ে তার মনটা যে বেশ খুশি-খুশি হয়ে উঠেছে, তা তার চোখের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারলাম। মাথা নাড়তে নাড়তে তিনি বললেন, এমন কিছু নতুন ঘটনা নয়। বামন থেকে দৈত্য, দৈত্য থেকে বামন আমাদের দেশে পুরাকালে অনেকবার হয়েছে।
ভদ্রলোক যে এই সরলপ্রাণ মেয়েটির মাথায় একটা বড় কঁঠাল ভাঙবার মতলব ভঁজছেন তা বুঝতে পারলাম। কিন্তু আমি কিছুতেই এই জোচ্চুরি নিজের চোখের সামনে দেখতে পারছিলাম না। আমার হাওয়া যে তার অনুকুলে বইছে না, তা প্রফেসর শিবদাসের সাবধানী দৃষ্টিতে ধরা পড়ে গেল। আমার চোখ এড়িয়ে নিজের মনেই শিবদাস দি গ্রেট বললেন, এর নাম বামনাবতার যজ্ঞ। খুবই দুরূহ এবং শ্রমসাধ্য যজ্ঞ। সাতদিন সাত রাত প্রধান পুরোহিতকে একভাবে হোম করতে হবে।
শিবদাস দি গ্রেট হয়তো এবার খরচের বিরাট ফিরিস্তি দিতেন। কিন্তু আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না। ভদ্রলোক আমার বিরক্ত মুখের দিকে তাকিয়ে একটু ভয় পেয়ে গেলেন। আমাকে একটু বাজিয়ে নেবার জন্যেই যেন প্রশ্ন করলেন, কিছু বলবেন?
