কনির চোখে মুখে এখন ট্যুরিস্টসুলভ চঞ্চলতা। ছেলেমানুষিতে সে যেন পরিপূর্ণ হয়ে রয়েছে; অথচ অচেনা অজানা জায়গার ভীতিও সম্পূর্ণ কাটেনি। এইরকম দুজন আমেরিকান কুমারীর গল্প হবস সায়েবের কাছে শুনেছিলাম। বাবার সঙ্গে তারা ওয়ার্ল্ড ট্যুরে বেরিয়েছিল। ভদ্রলোকের বোম্বাইতে কিছু কাজ ছিল। তাকে সেখানে রেখে দুই বোন একা একা রাজধানী দিল্লি দেখবার জন্যে বেরিয়ে পড়েছিল। সেখানে তারা নাকি মেডেনস্ হোটেলে উঠেছিল। ট্যুরিস্টমেজাজে জিনিসপত্র কিনতে কিনতে দিল্লিতে তারা সব টাকা খরচ করে ফেলে। অনন্যোপায় হয়ে তারা বাবাকে এক্সপ্রেস টেলিগ্রাম পাঠালে, কিন্তু টেলিগ্রাম পেয়ে বাবার চক্ষু চড়কগাছ। তার কুমারী কন্যাদ্বয় লিখেছে—All money spent. Can stay maidens no longer
চিত্তরঞ্জন অ্যাভিন ধরে হাঁটতে হাঁটতে কনি ও আমি চৌরঙ্গীতে এসে পড়লাম। জিজ্ঞাসা করলাম, এবার কোথায় যাবেন? ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, মিউজিয়াম, চিড়িয়াখানা, না লাটসায়েবের বাড়ি?
কনি ও-সব নামে কোনো আগ্রহই দেখালে না। নিজের ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে এবার যে স্লিপটা বের করে সে আমার হাতে দিলে, তাতে আমার চক্ষু চড়কগাছ। সেই কাগজের টুকরোতে শহরতলির এক অখ্যাত গলির নাম লেখা আছে। এইখানে আপনি যেতে চান? আমি কনির মুখের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম।
হ্যাঁ, ওইখানেই যেতে হবে। না হলে কি আমি কলকাতার সৌন্দর্য দেখবার জন্যে বেড়াতে বেরিয়েছি ভাবছ?
একটা ট্যাক্সি ডাকলাম। ট্যাক্সিতে চড়ে কনি অনেক কষ্টে উচ্চারণ করে বললে, আমি সেই গ্রেট ম্যানের সঙ্গে দেখা করতে চাই—প্রফেসর শিবদাস দেবশর্মা। দি গ্রেট। যাঁর রিসার্চ সেন্টার থেকে প্রথম ঘোষণা করা হয়েছিল, লর্ড কারজন কোনদিন ইংলন্ডের প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। জঙ্গীলাট লর্ড কিচেনার কর্তৃক উচ্চপ্রশংসিত হয়েও যিনি কিচেনারকে জানাতে দ্বিধা করেননি যে, জাহাজড়ুবিতে তাঁর মৃত্যু হবে।
কনি প্রফেসর শিবদাস দি গ্রেটের গৌরবময় ইতিহাস কণ্ঠস্থ করে রেখেছে। এঁর কয়েকটি চাঞ্চল্যকর ভবিষ্যদ্বাণীর মধ্যে রয়েছে—রবীন্দ্রনাথের নাইট উপাধি ত্যাগ, লর্ড ব্রেবোর্নের অকালমৃত্যু, জার্মানির অধঃপতন, গোয়েরিঙের আত্মহত্যা, সুভাষচন্দ্রের ভারত ত্যাগ ও বিদেশিনী বিবাহ এবং সর্বোপরি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা লাভ। প্রফেসর শিবদাস কিন্তু এও জানিয়েছিলেন যে, অদূর ভবিষ্যতে ভারত কমনওয়েলথের আওতা থেকে মুক্তি পাবে না।
কনি ব্যাগ থেকে একটা ছাপানো কাগজ বার করেছিল। তার এক কোণে লেখা-প্রাইভেট অ্যান্ড কনফিডেন্সিয়াল। সেখান থেকেই জানলাম এই মহাপুরুষ পাবলিসিটিতে বিশ্বাস করেন না। এবং কোনোরূপ পারিশ্রমিক গ্রহণ করাকে মহাপাপ বলে মনে করেন।
প্রফেসর শিবদাসই গোপনে মহাদেব দেশাই মারফত কস্তুরবাকে জানিয়েছিলেন যে, তার স্বামীর একটি ভয়াবহ ফঁাড়া আছে। কিন্তু তার চিন্তার কোনো কারণ নেই। স্বামীর কোলে মাথা রেখেই এই সতী রমণী ইহলীলা সংবরণ করতে পারবেন। অষ্টম এডোয়ার্ডকে এক্সপ্রেস চিঠি মারফত শিবদাস দি গ্রেট যে কবচ ধারণের উপদেশ দিয়েছিলেন, তা যদি তিনি ধারণ করতেন, তা হলে ইংলন্ডের রাজপরিবারের ইতিহাস নিশ্চয়ই অন্যভাবে লেখা হত। এই আণবিক শক্তিসম্পন্ন কবচ প্রস্তুতের জন্য যাগ-যজ্ঞে যে তিয়াত্তর টাকা চার আনা খরচ হয়, তার থেকে এক আনা বেশি নেওয়াকে শিবদাস দি গ্রেট গোমাংস ভক্ষণ পাপের সমান বলে মনে করেন।
কনিকে ফিরে যেতে বলেছিলাম। কিন্তু সে শুনলে না।
শহরের প্রান্তে এক কানাগলিতে শিবদাসের গবেষণাগার। আমরা যখন সেখানে হাজির হলাম, তখন তিনি ঘরের মধ্যে গানি ব্যাগ, হেসিয়ান, উলপ্যাক সম্বন্ধে ক্লায়েন্টদের উপদেশ দিচ্ছিলেন।
শিবদাসের সহকারী একটু পরেই আমাদের ভিতরে নিয়ে গেলেন।
ঘরের মধ্যে ঢুকতেই, শিবদাস দি গ্রেট পৈতে বার করে কনিকে আশীর্বাদ করলেন। কনি বাইরে জুতো খুলে রেখে এসেছিল। নাইলনের মোজা সমেত পা দুটো যেন লীলায়িত ভঙ্গিতে দরজার কাছ থেকে পণ্ডিতের দিকে এগিয়ে গেল। নিজের স্কাটা সামলে নিয়ে, কনি পা মুড়ে একটা আসনের উপর বসে পড়ল। ওর স্নিগ্ধ, ভক্তিন মুখের দিকে তাকিয়ে কে বলবে, কনি আমাদেরই ঘরের কেউ নয়। আমাদের মা, মাসিমা, দিদি স্কার্ট পরলে হয়তো এমনি করেই দেবতার মন্দিরে নিজেদের পূজা নিবেদন করতে আসতেন।
শিবদাস দি গ্রেট এবার তার ধূর্ত অনুসন্ধানী চোখে কনিকে যাচাই করবার চেষ্টা করতে লাগলেন। তিনি কনির মাথায় হাত রাখলেন। চোখ বুজে কিসের যেন ধ্যান করতে লাগলেন। তারপর তার পূর্ববঙ্গীয় উচ্চারণে ইংরেজিতে বললেন, মাদার, মাদার, নো ফিয়ার। শিবদাস উইল সেভ ইউ।
কনি কিছু বুঝতে না পেরে, আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকালে। আমি এতক্ষণ খালি পায়ে পিছনে দাঁড়িয়ে ছিলাম; বললাম, উনি বলছেন, ভয় পেয়ো না। চিন্তা কোরো না।
কনি কোনো কথা বলতে পারলে না। সে কেবল পরম নির্ভয়ে শিবদাসের হাতটা জড়িয়ে ধরলে। তার চোখে হঠাৎ অশ্রুর মেঘ জমতে শুরু করলে।
শিবদাস দি গ্রেট-এর বৈশিষ্ট্য তিনি প্রথমে কোনো প্রশ্ন করেন না। আগন্তুকের মুখ দেখেই তিনি তার ভূত এবং ভবিষ্যৎ নির্ণয় করেন। কিন্তু ওইখানেই যত মুশকিল। ওই প্রথম বাণীতেই তো ভক্তদের মন জয় করতে হবে। অথচ কাজটা যে বিপজ্জনক তাতে সন্দেহ নেই।
