করবী খিলখিল করে হেসে উঠলেন। অত বুঝি না। তবে সবাই যাঁকে মাথায় করে রেখেছিল, তাকে যে পায়ের তলায় রাখতে পারছি, এতেই আমার আনন্দ। জানেন, নেশার ঘোরে মাননীয় অতিথি সেই রাত্রে আমার পা জড়িয়ে ধরেছিলেন।
টেলিফোনে কথা শেষ করে করবী আমাকে জানালেন, কর্তাকে পেলাম। তিনি ফ্যাক্টরিতে গিয়েছেন। প্রথমে গৃহিণী ধরলেন; পরে পাকড়াশী জুনিয়র। কেউ কিছুই খবর রাখেন না। তবে পুত্র পাকড়াশী অনুগ্রহ করে আমাকে ফোনে জানিয়ে দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
আমি বললাম, খবরটা পেলে আমাদেরও একটু জানিয়ে দেবেন। আমি এবার চলে আসছিলাম। করবী দেবী বললেন, উঠছেন কেন? একটু ওভালটিন খেয়ে যান। আমি তার মুখের দিকে তাকালাম। এই হোটলে কেউ কখনও আমাকে এমন আন্তরিকভাবে কিছু খেতে বলেনি। করবী বললেন, থাকি হোটেলে বটে, কিন্তু এরই মধ্যে ছোট্ট সংসার পেতে বসেছি। আমার নিজের রান্নাবান্নার কিছু সরঞ্জাম জোগাড় করে রেখেছি। আপনাদের হোটেলের কফি আমার সব সময় ভালো লাগে না। তখন হিটার জ্বেলে আমি নিজেই চা কফি বা ওভালটিন করে নিই।
দেখলাম হিটারে করবী একটু আগেই জল চড়িয়ে দিয়েছেন। আমি বললুম, এর থেকে প্রমাণ হয় না যে, শাজাহান হোটেলের কফি খারাপ। এর থেকে এইটুকুই প্রমাণ হয় যে মাঝে মাঝে রান্নার সুযোগ না পেলে বাঙালি মেয়েদের ভাত হজম হয় না!
করবী হেসে ফেললেন। বললেন, তা যা বলেছেন। আমার মাঝে মাঝে খুব রাঁধতে ইচ্ছে করে।
ওভালটিনের কাপে চুমুক দিতে দিতে করবী দেবী কনির কথা তুললেন।
আপনি তো ওদের সঙ্গে ঘোরেন। ব্যাপারটা কী?
তাঁর প্রশ্নের অর্থ ঠিক বুঝতে না পেরে বললাম, আমি ওঁদের সঙ্গে ঘুরতে যাব কেন? তবে আমি মিস্টার ল্যামব্রেটার পাশের ঘরে থাকি, এই পর্যন্ত।
এবং সেই ঘরেই কনি দি উয়োম্যান সারাক্ষণ পড়ে থাকেন! করবী এবার অর্থপূর্ণ ইঙ্গিত করলেন। আমি বললাম, হাজার হোক ওঁর সহশিল্পী। একসঙ্গে বিশ্বপরিক্রমায় বেরিয়েছেন। করবী বললেন, কিন্তু তার মানেই কি একটা বামনের কথায় উঠতে-বসতে হবে?
কী বলছেন আপনি? আমি প্রতিবাদ করলাম।
শো-তে বামন তার কৃপ্রাপ্রার্থী, করুণাভিখারি। বাইরে ঠিক উল্টো। কনি বামনের সেবাদাসী। তার বদমেজাজের বিরুদ্ধেও কথা বলবার সাহস রাখে মেয়েটা।
আমি বললাম, তাতে কী এসে যায়? শো-তে ওঁরা কী করছেন সেইটাই আমাদের ভাববার কথা।
শো নিয়ে ভাববেন আপনাদের কাস্টমাররা, করবী বললেন। শোয়ের বাইরে তারা যা করে, তা নিয়ে আলোচনা করব আমরা। কারণ আমরাও এই হোটেলে থাকি।
উত্তর দেবার কিছুই খুঁজে পেলাম না। ওদের জীবন নিয়ে আমরা কেন যে এমন কৌতূহলী হয়ে উঠছি, তা বুঝতে পারি না। করবী বললেন, এটাও এক ধরনের বিলাস। ক্যাবারে নর্তকীর তো অর্থের চিন্তা নেই। কিছুক্ষণের আনন্দের জন্যে রাজা-মহারাজা, ধনী এবং ধনীপুত্ররা নর্তকীর পায়ের তলায় ডালি দিয়ে যায়। সুতরাং অবসরের একটা বিলাস না থাকলে খারাপ লাগে। কেউ বাঁদর পোষে, আবার কেউ বামনকে লাই দিয়ে মাথায় তোলে।
বললাম, বেচারা যে বামন, তার জন্যে আপনার কষ্ট হয় না?
করবী বললেন, ওরা দেখছি আপনার মনেও প্রভাব বিস্তার করেছে। এটা বোঝেন না কেন যে, বামন বলেই লোকটা করে খাচ্ছে। আপনার মতো লম্বা হলে কেউ ওকে কনির সঙ্গে স্টেজে অ্যাপিয়ার হতে দিত? এ লাইনে আমি অনেকদিন রয়েছি। একটা কথা জেনে রেখে দিন—ভিক্ষে এবং এন্টারটেনমেন্টের জগতে বিকলাঙ্গ, বীভৎসদর্শনের অনেক সুযোগ। এদের জোগাড় করবার জন্যে শিল্পীরা অনেক দাম দেয়।করবী দেবী একটু থামলেন। তারপর বললেন, দাও দাও, তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু মাথায় তুলো না। তাতে যে-হোটেলে তুমি নাচছ, তাদের ক্ষতি, আর নিজেরও সর্বনাশ।
করবী দেবীকে নমস্কার করে এবার কাউন্টারে এলাম। এবং সেখানকার কাজকর্ম শেষ করে উপরে উঠে গেলাম। কনিকে ছাদের উপরেই দেখতে পেলাম। সে মুখ শুকনো করে বসে আছে মনে হল। রৌদ্রে পিঠ দিয়ে সে একমনে সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে যাচ্ছে। আমাকে দেখে কনি সিগারেটে আর একটা লম্বা টান দিলে। তারপর সেটা ছুড়ে একে কোণে ফেলে দিয়ে বললে, গুড মর্নিং।
জানি আজকের সকালটা কনির পক্ষে তেমন গুড নয়। তবু অভিবাদন ফেরত দিয়ে বললাম গুড মর্নিং। কনি এবার উঠে দাঁড়াল। উঁকি মেরে ল্যামব্রেটার ঘরের দিকে তাকিয়ে একবার দেখে নিল সে ওকে দেখছে কিনা। কোনো কথা না-বলে কনি এবার সোজা আমার ঘরের মধ্যে এসে ঢুকল।
জামাকাপড় পালটিয়ে এবার একটু হাত-পা ছড়িয়ে বসব ভেবেছিলাম, কিন্তু কনির জন্যে তা হবার উপায় নেই। কনি একটা চেয়ারের উপরে বসে জিজ্ঞাসা করলে, তোমার ডিউটি কি শেষ হয়ে গেল? বললাম, এখনকার মতো ছুটি। আবার সন্ধ্যাবেলায় যা হয় হবে।
কনি এবার একটু সঙ্কোচবোধ করতে লাগল, আমাকে ওর যেন কিছু বলবার আছে, অথচ বলতে পারছে না।কিছু বলবেন? তাকে প্রশ্ন করলাম। কনি উত্তর দিল, যদি তোমার খুব অসুবিধে না হয়, তাহলে তোমার সঙ্গে একটু বেরোতাম।
কনি কলকাতার কিছুই জানে না। তাছাড়া তাদের মতো মেয়ের একলা বেরিয়ে পড়াও নিরাপদ নয়। তাই ইচ্ছে না থাকলেও রাজি হয়ে গেলাম।
কলকাতা ঘুরে বেড়াবার জন্যে প্রসাধন শেষ করে কনি যখন তার ঘর থেকে বেরিয়ে এল, তখন তাকে দেখে কে বলবে, ভোরের এই মেয়েটিই রাত্রের কনি দি উয়োম্যান। হ্যাট, কালো চশমা ও হাঁটু পর্যন্ত টাইট স্কার্ট পরা এই মেয়েটিকে দেখলে মনে হবে কোনো ইউরোপীয় ট্যুরিস্ট ললনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া সবেমাত্র চুকিয়ে বাবার সঙ্গে বিশ্বভ্রমণে বেরিয়েছে।
