মাইকটাকে যথাস্থানে সরিয়ে দিয়ে, বেয়ারাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে হল থেকে বেরোতে গিয়ে সত্যসুন্দরদার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।
কনি কোথায়? সত্যসুন্দরদা প্রশ্ন করলেন।
বললাম, জানি না, আলো নেভার সঙ্গে সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছে।
সত্যসুন্দরদা বললেন, বেশ গোলমেলে পরিস্থিতিতে পড়া গেল। ম্যানেজার অসন্তুষ্ট হয়েছেন। লাস্ট সিকোয়েন্সের সময় জিমি দাঁড়িয়ে ছিল। সে বোধহয় মার্কোর কাছে লাগিয়েছে।
শুনলাম, ম্যানেজার কনির মনঃসংযোগর অভাব লক্ষ্য করেছেন। জিমির সঙ্গে তার অনেক কথা হয়েছে। জিমি বলেছে, কম্পিটিশনের মার্কেট, একবার বদনাম রটলে আমাদের সর্বনাশ হয়ে যাবে। অন্য হোটেলে তিন তিনটে মেয়ে আগামীকাল থেকে একসঙ্গে নাচতে শুরু করবে। ওরা বলে বেড়াচ্ছে, এক মায়ের তিন মেয়ে। তিন বোন না ছাই। আঠারো বছর বয়সের আগে চুড়িরা কেউ কারুর মুখ দেখেনি। আর এখানে বিজ্ঞাপনের জোরে তিন বোন হয়ে গিয়েছে।
বোসদা বললেন, ম্যানেজার কী করে ল্যামব্রেটার কথা শুনল? তুমি কিছু বলেছ?
আমি?
বোসদা বললেন, ওঁদের ধারণা যত নষ্টের গোড়া ওই বেঁটে সায়েব। ওর জন্যেই কনির নাচ খারাপ হচ্ছে।
আমি বললাম, ও বেচারীর কী দোষ?
একজন পাবলিকই তো কনিকে আঁচড়ে দিয়ে সব গণ্ডগোল করে দিল।
বোসদা বললেন, ম্যানেজার কিছু একটা করবেন। সেইজন্যেই আমাকে ডেকেছিলেন।
কী করবেন? আমি প্রশ্ন করলাম।
বোসদা হাসলেন। বললেন, এত উতলা হচ্ছ কেন? এত বড়ো হোটেল চালাতে হলে ম্যানেজমেন্টকে কত কী করতে হয়।
আমার কেন জানি না ভয় হল, কনির কোনো ক্ষতি হবে। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বোসদা যেন বুঝতে পারলেন। হেসে বললেন, বলেছি না, এর নাম পান্থশালা। কেউ এখানে থাকবে না। কারুর উপর মায়া বাড়িয়ে না।
আমি বোসদার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারলাম না। চোখ দুটো সরিয়ে নিলাম! বোসদা বললেন, দোষ তো কনিরই। হোটেলের চাকরবাকরগুলো পর্যন্ত বামনটাকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করছে। জিমি নিজে বললে, কনি তার বামনের জন্যেও একটা এয়ারকন্ডিশান ঘর দাবি করেছিল।
আমি তখন ওসব শুনতে চাই না। ম্যানেজার ও জিমি কী ফন্দি এঁটেছেন তাই জানতে চাই। কিন্তু জানা হল না। বোসদা কিছু প্রকাশ করতে রাজি হলেন না। আমিও বোসদার মুখচোখের ভাব দেখে আর জোর করতে সাহস করলাম না।
১১. ব্যাপারটা যে আর চাপা নেই
ব্যাপারটা যে আর চাপা নেই, তা পরের দিনই বোঝা গেল। হোটেলের কাজে শ্ৰীমতী করবী গুহের সুইটে গিয়েছিলাম। শ্রীমতী করবী গুহ তখন তার প্রাত্যহিক কর্তব্য সেরে ফেলেছেন। ফুলের দোকানদারের প্রতিনিধি তার অর্ডার নিয়ে গিয়েছেন। ন্যাটাহারিবাবু তারপর সেলাম করে সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। বলেছেন, মা জননী, আজ আপনাকে কোন রংয়ের পর্দার কাপড়, বিছানার চাদর পাঠাব বলুন।
আমার সামনেই করবী দেবী বলছেন, অন্য লোকদের বাড়িতে কত সুন্দর সুন্দর রংয়ের পর্দা দেখি, কত নতুন নতুন রং বেরোচ্ছে। আপনার ভাঁড়ারে সেই সেকেলে রংগুলো পড়ে রয়েছে।
ন্যাটাহারিবাবু সত্যই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। এই প্রশ্নের কোনো উত্তর তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না। মাথা চুলকোতে চুলকোতে বললেন, মা জননী বাড়ি আর এই হোটেল কি এক জিনিস? গেরস্ত যদি নিজের দরজায় থলে টাঙিয়ে রাখে তাহলে তাই দেখেও মানুষের চোখ জুড়িয়ে যাবে।
করবী দেবী তার টানা টানা চোখ দুটো নিয়ে নিত্যহরিবাবুর দিকে কেমন ভাবে তাকালেন। আস্তে আস্তে বললেন, আমাকেও তো এই সুইটটা ভালো করে সাজিয়ে রাখতে হবে। রংয়ের সঙ্গে রং না মিললে এই গেস্ট-হাউসের কী থাকবে বলুন?
নিত্যহরিবাবু উত্তর দিলেন, আমি যতক্ষণ আছি, আপনার কোনো অসুবিধে হবে না। নিত্যহরি যে করে পারে, বোজ আপনার রংয়ের সঙ্গে রং মিলিয়ে যাবে। তবে মা জননী, নিত্যনতুন এই রংয়ের খেলা না দেখালেই নয়?
নিত্যহরিবাবু ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে আমি বললাম, আপনার কোনো অসুবিধে থাকলে ম্যানেজারকে জানাতে পারি। নিত্যহরিবাবু কি আপনার পছন্দমতো চাদর এবং পর্দা দিতে পারছেন না?
করবী দেবী যে এই ভোরবেলায় স্নান সেরে ফেলেছেন, তা তাঁর চুলের দিকে তাকিয়েই বুঝলাম। নিজের চুলগুলো নিয়ে খেলা করতে করতে করবী দেবী বললেন, আপনার কিছু বলবার দরকার নেই। নিত্যহরিবাবু মনে কষ্ট পাবেন। ভারি সুন্দর মানুষটি। কেন জানি না, ওঁকে আমার খুব ভালো লাগে। একেবারে খাটি সোনা। এখানে এতদিন থেকেও নষ্ট হয়ে যাননি।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, মিস্টার পাকড়াশীর অতিথিরা কবে হাজির হচ্ছেন? তাদের জন্যে কোনো স্পেশাল অ্যারেঞ্জমেন্টের দরকার থাকলে আমাদের এখনই বলে দেবেন।
করবী দেবী বললেন, মিস্টার আগরওয়ালা চান, ওঁদের সেবার যেন ত্রুটি হয়। আমি ঠিক করেছি দুজনকে দুটো কেবিন দিয়ে দেব। আর এইটাকে আমার বেডরুম করে নেব। অসুবিধের কোনো কারণ নেই। আগে চার-পাঁচজন গেস্টও একসঙ্গে এখানে থেকে গিয়েছেন।
তারিখের কথায় করবী বললেন, ভালো কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। ওটা জেনে রাখলে কাজের সুবিধে। টেলিফোনটা তুলে নিয়ে করবী বললেন, দাঁড়িয়ে রয়েছেন কেন? বসে পড়ুন।
বসে বসে দেখলাম, করবী দেবীর পা দুটো যেন পদ্মফুলের মতো। তার উপর সোনালি রংয়ের হাল্কা চটি পরেছেন। পায়ের আঙুলগুলো আলতার রংয়ে লাল হয়ে আছে। করবী হেসে বললেন, আপনার সেই সভাপতির কীর্তি জানেন? ফিরে গিয়ে পার্সেল পোস্টে এই চটিদুটো পাঠিয়ে দিয়েছেন। পায়ের মাপটা কখন জোগাড় করলেন কে জানে। আমি বললাম, আপনার পায়ে মানিয়েছেও ভালো।
