আর ওঁকে? পাকড়াশী-জুনিয়রের দিকে ইঙ্গিত করে আমি প্রশ্ন করলাম। বোসদা বললেন, মিস্টার চ্যাটার্জি, এরা ইয়ংম্যান। জীবনটা এখন এদের কাছে স্পার্কলিং রাইন ওয়াইনের মতো। আপনার অনুমতি নিয়ে মিস্টার পাকড়াশীকে স্পার্কলিং রেড হক দিই। ওয়ান্ডারফুল জিনিস। আমার জন্ম-বছরে বোতলে ভরা হয়েছিল।
ওয়ান্ডারফুল, ওয়ান্ডারফুল! এইজন্যেই স্যাটা বোসকে না-হলে আমার চলে না। শাজাহান হোটেল মাইনাস স্যাটা বোস ইজিকলটু মাধব ইন্ডাস্ট্রিজ মাইনাস মাধব, হ্যামলেট মাইনাস প্রিন্স অফ ডেনমার্ক, বাংলা সাহিত্য মাইনাস রবি ঠাকুর, রামকৃষ্ণ মিশন মাইনাস বিবেকানন্দ, অ্যান্ড লাস্ট বাট নট দি লিস্ট ফোকলা চ্যাটার্জি মাইনাস ড্রিঙ্ক। হা-হা করে হাসছেন ফোকলা চ্যাটার্জি কিন্তু হাসতে হাসতেই যেন তিনি কেমন হয়ে পড়লেন। স্যাটাদাকে বললেন, ড্রিঙ্ক ছাড়া আমি থাকতে পারি না মশাই। কিছুতেই পারি না। বেলা পড়লেই, সন্ধ্যার আবছা অন্ধকার যেমনি কলকাতাকে ঘোমটা পরিয়ে দেয়, অমনি আমি যেন কেমন হয়ে যাই। কিছুতেই নিজেকে আটকে রাখতে পারি না। বেলা যে পড়ে এল জলকে চল, পুরনো সুরে কে যেন আমাকে ডাকতে আরম্ভ করে।
ফোকলা চ্যাটার্জির এই আকস্মিক পরিবর্তনে শুধু আমি নয়, পাকড়াশী জুনিয়রও ভয় পেয়ে গেল। সে বললে, মামা! মামা তখন সত্যসুন্দরদার হাতটা ধরে বলছেন, আমার কেন এমন হয় বলতে পারেন? বেগ, বয়রা, অর স্টিল, প্রতিদিন আমাকে মাল টানতেই হবে।
বোসদা বললেন, মিস্টার চ্যাটার্জি, বিচলিত হবেন না। কিন্তু ফোকলা চ্যাটার্জির চোখ দুটো তখন সজল হয়ে উঠেছে। কালো পাথরের অনুর্বর বুকে হঠাৎ যেন শ্বেত পদ্মের কুঁড়ি ফুটতে শুরু করেছে। ফোকলা চ্যাটার্জি নিজেকে সামলাবার আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে বললেন, আমি মানুষ না মশাই। আমি জানোয়ার। আমি একটা মস্কো মিউল। না-হলে, নিজের ভাগনেকে নিয়ে কেউ ড্রিঙ্ক করতে আসে? জানেন, ওর নাম আমিই দিয়েছিলাম। সারা জীবন ধরে নিন্দের বোঝা বয়ে বয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। তাই দিদি যখন চিঠি লিখে পাঠালে, ভাগনের একটা নাম দিয়ে দিও, তখন আমার মাথায় একটা নামই এসেছিল—অনিন্দ্য। অনিন্দ্য পাকড়াশীর মুখের দিকে ফোকলা চ্যাটার্জি পরম স্নেহভরে তাকিয়ে রইলেন। তার হাতটা নিজের হাতের মধ্যে, টেনে নিয়ে বললেন, এখনো ফ্রেশ রয়েছে।
বোসদা মিস্টার চ্যাটার্জির ড্রিঙ্কগুলো আনবার জন্যে বেয়ারাকে বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ফোকলা চ্যাটার্জি বারণ করলেন। গোপনে নিজের মনের মধ্যে ওই কুৎসিতদর্শন লোকটা যেন কিসের হিসেব করছেন। কেন যে ওঁর মনের মধ্যে এই সব চিন্তা জট পাকিয়ে বসল তাও বোঝা যাচ্ছে না। বোসদাকে তিনি বললেন, একটু দাঁড়ান। ভেবে নিই। হঠাৎ ফোকলা চ্যাটার্জি উঠে। দাঁড়ালেন। পকেট থেকে পুরনো বিলগুলোর টাকা বের করে টেবিলের উপর রেখে বললেন, অনিন্দ্য, চলে আয়।
মন্ত্রমুগ্ধের মতো অনিন্দ্য পাকড়াশীও উঠে পড়ল। মদের নেশায় ফোকলা চ্যাটার্জি কি একেবারে বাহ্যজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন? এই সামান্য কয়েকটা পেগে বোন্ড আউট হবার ছেলে তো ফোকলা চ্যাটার্জি নন। এই তো কয়েক মুহূর্ত আগেও তিনি উইকেটের চারদিকে পিটিয়ে খেলার পরামর্শ দিচ্ছিলেন। বোসদা বললেন, মিস্টার চ্যাটার্জি, ক্যাবারের শেষ অঙ্ক দেখবেন না?
ফোকলা চ্যাটার্জি বিষণ্ণভাবে অসম্মতি জানালেন। আস্তে আস্তে বললেন, আই অ্যাম স্যরি, স্যাটা। অনিন্দ্যকে এখানে আনা আমার কিছুতেই উচিত হয়নি।
আমাদের বিস্মিত ও অভিভূত করে ফোকলা চ্যাটার্জি নিজের ভাগনের হাত ধরে যখন অসমাপ্ত আনন্দসভা থেকে বিদায় নিলেন, মমতাজের আলোগুলো তখন আবার নিভতে আরম্ভ করেছে। বেয়ারারা তখন শেষবারের মতো দ্রুতগতিতে ভদ্রমহোদয়দের টেবিলে ড্রিঙ্ক পৌঁছে দেবার চেষ্টা করছে।
আবার নাচ শুরু হল। রঙিন আলোর মেলায় মেয়েমানুষ কনির ফানুস নৃত্য। সারা অঙ্গে ফানুস বেঁধে কনি যেন প্যারাসুটবাহিনী হয়ে স্টেজের উপর এসে নামল।
স্টেজে নামবার আগে কনিকে প্রশ্ন করেছিলাম, তোমার হাত কেমন? কনি বলেছিল, আমার ও-সব মনে থাকে না। হ্যারিই ওতে উত্তেজিত হয়ে ওঠে। কনি আরও বলেছিল, এখন স্টেজে যাবার মুখে আমাকে ওইসব অপ্রীতিকর ঘটনার কথা মনে করিয়ে দিও না। ওতে আমার মুড নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
আমি আর মনে করিয়ে দিইনি। কনিও এবার অতিথিদের সম্মুখে উপস্থিত হবার জন্যে প্রস্তুত হয়ে নিল। আশ্চর্য! যে এতক্ষণ এমন বিষণ্ণ গাম্ভীর্যে নিজেকে পরিপূর্ণ রেখেছিল সে-ই যে নিমেষের মধ্যে এমন চটুল লাস্যময়ী হয়ে উঠতে পারে, তা নিজের চোখে না দেখলে কিছুতেই বিশ্বাস করতাম না।
উপস্থিত অতিথিরা উল্লসিত হয়ে উঠলেন। চিৎকার উঠল। সিটি বাজল। প্রতিদিন যা হয়, যুগ যুগ ধরে শাজাহান প্রমোদকক্ষে যা হয়ে আসছে, তারই পুনরাবৃত্তি হল। তবু কেন জানি না, বেশ বুঝতে পারলাম, কোথায় যেন ছন্দপতন ঘটেছে। গত রাত্রে যে ফনি নেচেছে, সে যেন আজ এখানে উপস্থিত নেই। তার নৃত্যে প্রাগৈতিহাসিক উদ্দামতার অভাব ছিল না, তার নয়নে বিষাক্ত সপিণীর ভয়াবহতাও ছিল। তবু পান্থশালার নর্তকী আজ ক্লান্ত, তার মুড সত্যিই নষ্ট হয়ে গিয়েছে।
আজও দর্শকরা ফানুস ফাটালেন। সর্বজাতির কামনা-কলুষিত উল্লাস যেন একদেহে মমতাজের এই ঐতিহাসিক কক্ষে লীন হয়ে গেল। তবু সংক্ষিপ্ত। বিষণ্ণ নর্তকী আজ অনেক আগেই দর্শকদের শিকারীচোখকে ফাঁকি দিয়ে অন্ধকারের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। আবার আলো জ্বলে উঠল। মৃদু গুঞ্জনে মমতাজের হঘর ভরে উঠল। বাড়ি ফেরবার তাড়ায় কে আগে হলঘর থেকে বেরিয়ে যেতে পারে তার জন্যে হুড়োহুড়ি পড়ে গেল।
